আর্থ সামাজিক সমস্যার সমাধানে ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব

0
35
ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব
মুহাম্মদ আবদুল হাই নদভী:

ইসলামে যাকাতের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অপরিসীম। ধনীদের জন্য বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে যাকাত প্রদান করা ফরযে আইন। যাকাত প্রদানে বিরত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে ইসলামি সরকারের জিহাদ পরিচালনা করে যাকাত প্রদানে বাধ্য করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা’আলা পবিত্র কুরআনের ১৯টি সূরার ৩২টি স্থানে সরাসরি যাকাত শব্দ উল্লেখ করেছেন এবং আরো বহুস্থানে পরোক্ষভাবে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। ইসলামে যাকাত এতই গুরুত্ব রাখে যে, তা পরিত্যাগকারীর বিরুদ্ধে কুরআন ও হাদিসে আখিরাতের ভয়াবহ শাস্তির বাণী উল্লিখিত হয়েছে। যেমন

যারা স্বর্ণ রৌপ্য জমা করে এবং তা আল্লাহর পথে খরচ করে না, হে নবী! তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তদ্বারা তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ এবং পিঠকে সেক দেওয়া হবে। (এবং বলা হবে) এটা তার প্রতিফল যা তোমরা নিজেদের জন্য জমা করেছিলে। সুতরাং তোমাদের ধনভাণ্ডারের শাস্তি আস্বাদন কর।’ [সূরা আততাওবা ৯ ঃ ৩৪]

হাদিসে এসেছে, রাসূল বলেন, হযরত আবু হুরায়রা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেন, যাকে আল্লাহতা’আলা সম্পদ দিয়েছেন কিন্তু সে তার যাকাত আদায় করে না, উক্ত মালকে কিয়ামতের দিন তার জন্য বিষধর সাপে পরিণত করা হবে। যার চোখের ওপর কালো দাগ পড়ে গেছে। অতঃপর তা স্বীয় চোয়ালদ্বয় দ্বারা তাকে কামড় মারবে এবং বলবে আমি তোমার ধনভাণ্ডার, আমি তোমার মাল’। আসসহীহ আলবুখারী, /১০৬, হাদিস; ১৪০৩ ও ৬/৩৯, হাদিস; ৪৫৬৫। এহেন গুরুত্বের কারণে যাকাতকে ইসলামে পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ স্থির করা হয়েছে। যেমনহাদিস শরিফে আছে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনু ওমর থেকে বর্ণিত,তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল বলেন, ইসলাম ৫টি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত। যথা এ সাক্ষ্য দেওয়া যে ১. আল্লাহ তা’আলা ছাড়া কোনো মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল, . সালাত কায়েম করা, . যাকাত প্রদান করা, . রামাযানে রোযা রাখা এবং ৫. হজ করা। ’ [আসসহীহ আলবুখারী, /১১, হাদিস:]

. যাকাত ফরয ইবাদত: ইসলামের অন্যান্য ফরয হুকুমের ন্যায় যাকাতও একটি ফরয হুকুম। যাকাত ফরয হওয়া সম্পর্কে আল্লাহর বাণী:

তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা করো যাকাত প্রদান করো রুকুকারীগণের সাথে রুকু করো। [সূরা আলবাকারা ২:৪৩]

. ইসলামের রুকন: ইসলামের পাঁচটি রুকনের অন্যতম রুকন হলো যাকাত।

. আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন: কর্মের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই ঈমানি জীবনে একান্ত কামনা। সঠিকভাবে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা যায়। আল্লাহর বাণী:

তারা বলে, কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যে আমরা তোমাদেরকে আহার্য দান করি এবং তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না’। [সূরা আলইনসান ৭৬ ঃ ৯]

. আর্থিক ইবাদত: যাকাত হলো ইসলামের আর্থিক ইবাদত। কারণ অর্থ সম্পদের নির্দিষ্ট একটা অংশ আল্লাহর রাস্তায় নিঃশর্তভাবে দান করার নামই যাকাত।

. জাহান্নাম থেকে মুক্তির উপায়: যাকাত জাহান্নাম থেকে পরিত্রাণের অন্যতম উপায়। কেননা যাকাত প্রদান না করলে পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে।

. তাকওয়ার গুণ অর্জন: যাকাত আদায়ের মাধ্যমে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়। কেননা মুসলমানগণ একমাত্র আল্লাহর ভয় এবং নির্দেশের প্রতি সম্মান দেখিয়েই নিজের কষ্টার্জিত সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ আল্লাহর রাস্তায় দান করে। আর আল্লাহকে ভয় করে কোনো কাজ করার নামই তাকওয়া।

. আত্মিক শান্তি লাভ: ভোগে সুখ নেই, ত্যাগেই প্রকৃত সুখ। আল্লাহর হুকুম ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে আর্থিক ত্যাগের মধ্যেই রয়েছে আত্মিক প্রশান্তি।

. সফলতার চাবিকাঠি: যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ব্যক্তি ইহকাল ও পরকালে সফলতা লাভ করতে পারে। মহান আল্লাহর বাণী:

মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয় নম্ন; যারা অনর্থক কথাবার্তায় নির্লিপ্ত, যারা যাকাত দান করে থাকে এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। [সূরা আলমুমিনুন ২৩:]

. ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ: মহান আল্লাহ মুমিনদেরকে বিভিন্ন পরীক্ষায় নিপতিত করেন। যাকাত প্রথা সম্পদশালীদের জন্য একটি ঈমানী পরীক্ষা। সঠিকভাবে যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মুসলমান ব্যক্তি ঈমানী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে।

. যাকাত সম্পদ ও ব্যক্তিকে পবিত্র করে: যাকাত আদায়ের মাধ্যমে দাতা ব্যক্তির চরিত্র যেমন পবিত্র হয়, তেমনি সম্পদও পবিত্র হয় এবং বৃদ্ধি পায়। আল্লাহর বাণী:

তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে। [সূরা আততাওবা ৯:১০৩]

১০. আল্লাহর নিয়ামতের শুকর: ধন সম্পদ আল্লাহর এক বড় নিয়ামত। আর নিয়ামতের শুকর করাই ঈমানদারদের একান্ত কর্তব্য। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে নিয়ামতের শুকর আদায় হয়।

॥ ২ ॥

আর্থ সামাজিক সমস্যার সমাধানে

আর্থ সামাজিক সমস্যার সমাধানে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা পেশ করা হলো :

. ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূরীকরণ: যাকাত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে ধনী দরিদ্রের মধ্যে বিরাজমান গগনচুম্বী বৈষম্য ধীরে ধীরে কমে আসে এবং সমাজে অর্থনৈতিক সাম্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।

. অভাব মোচন: সমাজের বিত্তবান ব্যক্তিরা যদি সততা ও আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর নির্দেশমত নির্দিষ্ট খাতে যাকাত আদায় করে তাহলে সমাজে কোনো মানুষ অন্ন বস্ত্র এবং গৃহহীন থাকতে পারে না। তাই সমাজের সামগ্রিক আর্থিক অভাব মোচনে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।

. ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি : যাকাত আদায়ের মাধ্যমে সমাজে পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব সহৃদয়তা ও সহনশীলতার উন্মেষ ঘটে।

. সহানুভূতি সৃষ্টি: সমাজে অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাৎপদ জনসমষ্টির প্রতি বিত্তবানদের সহানুভূতি প্রকাশের উত্তম মাধ্যম হলো যাকাত। এ ব্যবস্থায় গরিব জনগোষ্ঠী ধনীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। ফলে শ্রেণীবিভেদ দ্রুত কমে আসে।

. সমাজে শান্তি স্থাপন: যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে সমাজে বেকার সমস্যার সৃষ্টি হয় না। অসহায় লোকদের চাহিদা পূরণের ফলে সমাজে প্রশান্তি বিরাজ করে।

. ভালোবাসার উদ্ভাবক: যাকাত প্রদানে ধনী ব্যক্তির সাথে তার সমাজ সমষ্টির ঘনিষ্ঠতা ও ভালোবাসা সৃষ্টি হয়, যা কখনো ম্লান হয় না।

. সহনশীলতার সৃষ্টি: ধনীরা গরিবের দুঃখ কষ্ট অনুধাবন করত যাকাতের মাধ্যমে তা মোচনের জন্য নিজেকে নিয়োজিত করার মধ্যে দিয়ে গরিবদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়।

. ধনীর ব্যক্তিত্ব বিকাশ: যাকাত প্রদানের মাধ্যমে সমাজে ধনীর ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটে। ফলে সমাজে তার মর্যাদাপূর্ণ স্থান অর্জিত হয়।

. পুঁজিবাদের অভিশাপ থেকে মুক্তি: যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে পুঁজিবাদীদের ধন সম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা হ্রাস পায়। এতে ধীরে ধীরে জাতি পুঁজিবাদের অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে পারে।

১০. জনকল্যাণমূলক কার্যাবলি সম্পাদন: যাকাতের অর্থ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করার মাধ্যমে বহু সমাজকল্যাণ ও জনকল্যাণমূলক কাজ সম্পাদন সম্ভব হয়।

১১. অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধকরণ: যাকাতের অর্থে মিলকারখানা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান তৈরি করে গরিব বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করলে সমাজে চুরি ডাকাতি ছিনতাই রাহাজানি ইত্যাদি হ্রাস পাবে।

১২. সাম্য ও মানবতাবোধ সৃষ্টিকারী: যাকাত ব্যবস্থা মানুষের মধ্যে উঁচু নিচু ভেদাভেদ দূর করে সকলের মধ্যে সমতা আণয়ন করে। এটা পারস্পরিক ঘৃণা বিদ্বেষ দূর করে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধের বিকাশ ঘটায়।

১৩. মানব চরিত্রের অনুপম পরীক্ষা: যাকাত মানব চরিত্রে অর্থলোলুপতা দূর করে তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করতে উৎপাদিত করে যাকাত প্রদান করে মানুষ এ অনুপম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।

॥ ৩ ॥

দারিদ্র বিমোচনে যাকাতের গুরুত্ব

যাকাত দারিদ্র বিমোচনে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। দারিদ্র দূরীকরণে যাকাতের অবদান বিস্ময়কর। যাকাতের দ্বারা গরিব, অক্ষম, অভাবগ্রস্ত লোকদের পূর্ণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তাদানের ব্যবস্থা করা যায়। নিম্নে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

. জাতীয় আয়: যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের একটি অন্যতম প্রধান উৎস। বিত্তবান ব্যক্তিরা তাদের সম্পদের শতকরা আড়াই ভাগ জাতীয় তহবিলে প্রদান করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দান করে।

. অর্থনৈতিক ভারসাম্য: যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদরিদ্রের মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য দূর হয়। ব্যক্তিরা তাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত অর্থ সম্পদ থেকে কিছু দরিদ্র জনগণের মাঝে বিতরণ করায় উভয় শ্রেণীর মাঝে অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা হয়।

. সর্বজনীন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা: যাকাত মানুষের সর্বজনীন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান করে। অক্ষম ও অসামর্থ্য ব্যক্তিদের জাতি ধর্ম বর্ণ যাকাতের অর্থ দিয়ে পুনর্বাসন কার্যক্রম দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সুতরাং যাকাত সর্বজনীন অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধানে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

. অর্থনৈতিক অভাব বিমোচন: যাকাত সমাজের অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অভাবঅনটন বিমোচনের এবং জীবন জীবিকার যোগদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

. কর্মসংস্থান: যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। যাকাতের অর্থ ব্যয়ে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে দরিদ্র বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।

. ঋণমুক্তি: যাকাতের অর্থ দ্বারা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঋণমুক্ত করা যায়। ঋণের শৃঙ্খল থেকে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার বিধান আল্লাহ যাকাতের মাধ্যমে দান করেছেন।

. অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আণয়ন: যাকাত সমাজ ও রাষ্ট্রে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং স্থিতিশীলতা আণয়নে ও মুনাফাখোরী নিয়ন্ত্রিত হলে সম্পদ কোথাও পুঞ্জিভূত হতে পারে না। ফলে সমাজে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও স্থিতিশীলতা আছে।

. মজুতদারী দূরীকরণ: যাকাত অলসভাবে অর্থ মজুদ রাখার প্রবণতা নাশ করে এবং সঞ্চিত সম্পদ বিনিয়োগে উৎসাহ যোগায়। এতে অর্থনৈতিক মজুদদারী দূরীভূত হয়।

. অপচয় রোধ: সরকারের বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রচুর আর্থিক অপচয় হয়, কিন্তু যাকাতের উদ্দেশ্য এবং ব্যয়ের খাতসমূহ সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। এজন্য এ খাতে অপচয়ের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

১০. ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা রোধ: আধুনিক কর ব্যবস্থায় কর ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, কিন্তু যাকাতে ফাঁকি দেওয়া প্রবণতা বিরল। মহান আল্লাহর ভয়ে ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে স্বেচ্ছা প্রণোদিতভাবে মানুষ যাকাত দেয়। সুতরাং এ অনুভূতি সর্বক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়া প্রবণতা রোধ করে।

১১. বেকারত্ব দূরীকরণ: সরকার যাকাত আদায়ের জন্য পৃথক একটি মন্ত্রণালয় খুলে অনেক লোকের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করে বেকারত্ব দূর করতে পারে।

১২. জাতীয় উন্নতি: যাকাত সরকারের জন্য জাতীয় উন্নতি বিধানে একটি অনন্য ব্যবস্থা। যাকাতের নির্দিষ্ট ব্যয়খাতে যাকাতের অর্থ বিনিয়োগ করে জাতীয় জীবনের বিভিন্ন দিকের উন্নয়ন করা সম্ভব।

১৩. সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ রহিত: যাকাত প্রদান করলে সম্পদ পুঞ্জীভূত থাকে না, বরং তা গরিবদের মাঝে পৌঁছে যায়। ফলে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ে, সাথে সাথে বাজার চাহিদা উৎপাদন ইত্যাদিও বৃদ্ধি পায়।

১৪. অর্থ অহমিকার বিলোপ সাধন: যাকাত প্রদান করলে ব্যক্তির মন থেকে অর্থের অহমিকা বিলুপ্ত হয়।

১৫. পুঁজিবাদের অবসান: ইসলামি রাষ্ট্রে যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে সমাজে পুঁজিবাদীদের ধনসম্পদ কুক্ষিগত করে রাখার প্রবণতা হ্রাস পেয়ে পুঁজিবাদের অবসান ঘটে।

১৬. জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা: শতকরা আড়াই টাকা গরিব জনসাধারণকে দেওয়ার ফলে বিত্তশালীদের মনমানসিকতার সুস্থ বিকাশ ঘটে। নির্দিষ্ট ব্যয় খাতে যাকাতের অর্থের প্রয়োজন শেষ হয়ে গেলে রাস্তাঘাট হাসপাতালসহ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যায়।

১৭. যাকাত অর্থনৈতিক ভিত্তি: ইসলামের অর্থনৈতিক বুনিয়াদ গড়ে ওঠেছে যাকাতের ওপর ভিত্তি করে। আর যাকাতই ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস।

১৮. অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ: যাকাত প্রদানের ফলে সম্পদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে সম্পদের অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীভূত হয়।

যাকাতের আর্থসামাজিক গুরুত্ব

যাকাতের সামাজিক গুরুত্ব নিম্নরূপ:

. ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর করে: যাকাত ধনী দরিদ্রের মাঝে বৈষম্য দূর করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ সৃষ্টি করে। যাকাত দরিদ্রের প্রতি ধনীর করুণা নয়, বরং ধনীর সম্পদে দরিদ্রের অধিকার। যেমনআল্লাহর বাণী:

এবং তাদের ধন সম্পদে প্রাথ ও বঞ্চিতের হক আছে।

. সামাজিক নিরাপত্তা বিধান: সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের ক্ষেত্রে যাকাতের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। সমাজের যে সকল লোক অর্থ উপার্জনে অক্ষম এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতায় বাস করে, যাকাত ব্যবস্থা তা দূরীকরণে অনন্য ভূমিকা রাখে।

. অভাবঅনটন বিমোচন: অভাবঅনটন বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের ধনী শ্রেণী যদি সঠিকভাবে যাকাত প্রদান করে তাহলে সমাজে কোনো অভাবী মানুষের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না।

. সামাজিক অনাচার নির্মূল: অর্থের অভাবে মানুষ সামাজিক অনাচার তথা চুরি, ডাকাতি, খুন, রাহাজানি, ছিনতাই ও সন্ত্রাস ইত্যাদি অপরাধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ভেঙে পড়ে সামাজিক অবকাঠামো। যাকাত ব্যবস্থা এসব সামাজিক অনাচার নির্মূলে অনন্য ভূমিকা পালন করে।

. ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণ: যাকাত মানুষের মধ্যে বিশেষ করে ধনীদরিদ্রের মাঝে এক গভীরতম ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে।

. সহানুভূতি সৃষ্টি: যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনীদের অন্তরে দরিদ্রদের প্রতি চরম সহানুভূতি সৃষ্টি হয়। ধনীরা দরিদ্রের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এগিয়ে আসে।

. জনহিতকর কার্যাবলি: যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে সমাজের অসংখ্য জনহিতকর কার্যাবলি সম্পাদন করা যায়।

. ভিক্ষাবৃত্তিক উচ্ছেদ: ভিক্ষাবৃত্তি একটি সামাজিক ব্যাধি। যাকাতের অর্থ দিয়ে দরিদ্র কল্যাণ ও দরিদ্রের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল করা যায়।

যাকাতের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাতের গুরুত্ব অপরিসীম। যা নিম্নে তুলে ধরা হল:

. ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি: যাকাত ইসলামি অর্থনীতির মূল ভিত্তি। পুঁজিবাদী অর্থ ব্যবস্থার মূলভিত্তি। যেমন সুদ, সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার মূল ভিত্তি যেমন জাতীয়করণে তেমনি ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো যাকাত।

. রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস: ইসলামি রাষ্ট্রের আয়ের প্রধান উৎস যাকাত। ইসলামি রাষ্ট্রের সিংহভাগ অর্থই যাকাত থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে।

. জাতীয় আয় বৃদ্ধি: যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের জাতীয় আয়কে বৃদ্ধি করে। রাষ্ট্রের অন্যান্য আয়ের সাথে যাকাতের অর্থ একত্রিত হয়ে জাতীয় আয় বহুলাংশে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়।

. অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে: কোনো রাষ্ট্রকে উন্নতি ও অগ্রগতির মূলে রয়েছে সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তি। যাকাত ইসলামি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে।

. অর্থনৈতিক ভারসাম্য সৃষ্টি: রাষ্ট্রে ধনীদরিদ্রের মাঝে যে বিশাল ব্যবধান রয়েছে। যাকাত ব্যবস্থা যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে তা নিরসন করে ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ অর্থ ব্যবস্থা গড়ে তোলে।

. অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ: যাকাত অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণের মহৌষধ। কেননা যাকাত ব্যবস্থার কারণে বিত্তশালীদের অর্থ এক স্থানে সঞ্চিত থাকতে পারে না। সম্পদ সমাজের দরিদ্রদের মাঝে আবর্তিত হতে থাকে।

. দারিদ্র্য বিমোচন: দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সঠিকভাবে যাকাতের অর্থ দরিদ্রদের মাঝে বণ্টন করলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হতে বাধ্য।

. ঋণমুক্তি: যাকাতের অর্থ দ্বারা ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঋণমুক্ত করা যায়।

. চাকরির সুযোগ: রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় যাকাত উত্তোলন ও বিতরণের ব্যবস্থা করলে যাকাত বিভাগে অসংখ্য লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

১০. পুঁজিবাদের অবসান: যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে পুঁজিবাদের অভিশাপ থেকে জাতি মুক্তি পাবে। ইসলামি অর্থ ব্যবস্থার এ মূলনীতিকে সামনে রেখেই আল্লাহর ঘোষণা:

যাতে ধনৈশ্বর্য কেবল তোমাদের বিত্তশালীদের মধ্যেই পুঞ্জিভূত না হয়।

১১. বেকারত্ব দূরীকরণ: বেকার জীবন অভিশপ্ত জীবন। ইসলামের যাকাত ব্যবস্থা সমাজ থেকে বেকারত্ব দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যাকাতের অর্থ দিয়ে বেকার লোকদের কোনো না কোনো কাজের ব্যবস্থা করা যায়।

১২. অর্থনৈতিক প্রতারণা বন্ধ : যাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের মাঝে প্রচলিত অর্থনৈতিক প্রতারণা বন্ধ করা যায়। আধুনিক কর ব্যবস্থায় ফাঁকির প্রবণতা থাকলেও যাকাত ব্যবস্থায় ফাঁকি অকল্পনীয়। কেননা বিত্তশালীরা একান্তই ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে আল্লাহর নির্দেশ পালনের লক্ষ্যে স্বেচ্ছায় যাকাত দিয়ে থাকে।

১৩. কর্মসংস্থানের সৃষ্টি: যাকাতের অর্থ একত্রিত করে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অনেক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়।

১৪. সমবায় সমিতি গঠন: যাকাতের অর্থ একত্রিত করে দরিদ্র জনসাধারণের মাঝে যদি সমবায় সমিতি গঠন করা যায়, তাহলে এর মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আর্থসামাজিক উন্নতি সাধন করতে পারে।

১৫. জনকল্যাণমূলক কাজ: যাকাতের অর্থে এতিমখানা, বিদ্যালয় ও দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি জনকল্যাণমূলক কার্যসম্পাদন করা যায়।

ইসলামে যাকাত ব্যবস্থার স্বরূপ

. যাকাত একটি ফরয ইবাদত: যাকাত আল্লাহতা’আলা কর্তৃক নির্ধারিত একটি ফরয ইবাদত এবং সরকারি আয়ের এক বিরাট উৎস। যাকাত ইসলামের ৫টি স্তম্ভের একটি আল কুরআনে বার বার নামায কায়েমের পরই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণী:

তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো, রুকুকারীগণের সাথে রুকু করো’।

. কোন কোন মালে যাকাত ফরয হয়: যাকাত ইসলামের মৌলিক অর্থনৈতিক বিধান। যাকাত শুধু বিত্তশালী মুসলমানদের জন্যই বাধ্যতামূলক। সঞ্চিত টাকা, সঞ্চিত মূল্যবান দ্রব্য সামগ্রী, শস্য, সোনা, রূপা, গবাদি পশু, যেমনগরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, উট, দুম্বা প্রভৃতি নিসাব অনুযায়ী এক বছর যাবত অপরিবর্তনীয় থাকলে তার ২.% যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হয়। নিচে যাকাতের হারসমূহ প্রদত্ত হলো:

. সঞ্চিত টাকার যাকাত: প্রতি ১০০ টাকায় ২.৫০ টাকা হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

. সোনার যাকাত: যদি ৭.৫০ (সাড়ে সাত) তোলা সোনা বা সোনার অলংকার ১ বছর যাবত কারো মালিকানাধীন থাকে তবে তাকে শতকরা ২.৫০ হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

. রুপার যাকাত: যদি কারো মালিকানাধীনে ৫২.৫০ (সাড়ে বায়ান্ন) তোলা রুপা এক বছর যাবত থাকে তখন তাকে নির্ধারিত পরিমাণ যাকাত দিতে হবে।

. ওশর: জমিতে উৎপাদিত ফসলের ১০% যাকাত হিসেবে প্রদান করাকে ওশর বলে। এভাবে গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি গবাদি পশুর যাকাত দিতে হবে। তবে যে জমিতে সেচ পদ্ধতিতে চাষ করা হয় তার ৫% যাকাত দিতে হবে।

. যাকাতের অর্থ জমা করার নিয়ম: যাকাত হিসেবে আদায়কৃত অর্থ সরকারের সাধারণ তহবিলে নেওয়া যায় না। যাকাত তহবিল নামে একটি বিশেষ তহবিলে এ অর্থ জমা করা হয়। এটি একটি বাধ্যতামূলক তহবিল যা আয়ের উৎস এবং ব্যয়ের খাত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

. যাকাত আদায়ের শরিয়তসম্মত নীতি: যাকাত আদায়ের শরিয়তসম্মত নীতি হলো, যাকাত প্রদানকারী রাষ্ট্রীয় যাকাত তহবিলে যাকাতের অর্থ জমা দেবে আর ইসলামি রাষ্ট্র সে অর্থ আদায় করবে। আলকুরআনে বলা হয়েছে,

তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত প্রদান করো, রুকুকারীগণের সাথে রুকু করো’।

এ আয়াতে ব্যক্তিকে যাকাত প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আবার ইসলামি রাষ্ট্রকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাকাত গ্রহণ করার জন্য। আলকুরআনে বলা হয়েছে, তাদের মালামাল থেকে যাকাত গ্রহণ কর, যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে’।

. যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিলঃ কেউ যদি যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জানায় ইসলামি রাষ্ট্র সেক্ষেত্রে জোরপূর্বক তা আদায় করে নিবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর কয়েকটি গোষ্ঠী যাকাত দিতে অস্বীকার করে। হযরত আবু বকর তাদের কাছে হুঁশিয়ারি বাণী পাঠিয়ে বলেন, যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানানো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের শামিল এবং তিনি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

. যাকাত ব্যয়ের খাত: মহান রাব্বুল আলামিনের বাণী: অবশ্যই যাকাত পাবে তারা যারা, . ফকির, . মিসকিন, . যাকাত আদায় ও বণ্টনের কর্মচারী, . মুয়াল্লাফাতুল কুলুব (ধর্মের জন্য যাদের মন জয় করা প্রয়োজন), . দাসদের দাসত্ব মোচনের জন্য, . ঋণগ্রস্তদের ঋণ পরিশোধের জন্য, . আল্লাহর পথে (জিহাদের জন্য) এবং ৮. মুসাফিরের জন্য, এটা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত ফরয’।

উপরোক্ত আয়াতের আলোকে ৮টি খাতে যাকাতের অর্থ ব্যয় করতে হবে।

দারিদ্র বিমোচনে যাকাত: ইসলামে দারিদ্র্যকে অত্যন্ত খারাপ চোখে দেখা হয়েছে। যাকাত দারিদ্র বিমোচনের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা। দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাতের ভূমিকা অত্যন্ত কার্যকর। যাকাতের মাধ্যমে দারিদ্র্য অক্ষম অভাবগ্রস্ত লোকদের পূর্ণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দানের ব্যবস্থা করা যায়।

আরও পড়ুনঃ   বই – ফতোওয়া আরকানুল ইসলাম (ফ্রি ডাউনলোড)

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

1 × two =