আল্লাহর কাছে কোরবানি কবুল হওয়ার শর্ত

0
25
কোরবানি কবুল হওয়ার শর্ত
কোরবানি’ শব্দটি আরবি ‘কুরব’ ধাতু থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ নৈকট্য বা সান্নিধ্য। আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে আত্মোৎসর্গ করাই কোরবানি। শরিয়তের পরিভাষায়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় তাঁর নামে পশু জবেহ করাকে কোরবানি বলে।ঈদুল আজহা উপলক্ষে জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট কিছু হালাল পশু জবাই বা কোরবানি করা হয়। এ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে ঘোষিত হয়েছে, ‘আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদের জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত ৩৪)

হজরত আদম (আ.) থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সব নবী-রাসুল ও তাঁদের অনুসারীরা কোরবানি করেছেন। ইতিহাসে হজরত আদম (আ.)-এর দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে প্রথম কোরবানির সূত্রপাত হয়।

ইরশাদ হয়েছে, ‘আদমের পুত্রদ্বয়ের (হাবিল-কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদের যথাযথভাবে শোনাও। যখন তারা উভয়ে কোরবানি করেছিল তখন একজনের (হাবিলের) কোরবানি কবুল হলো এবং অন্যজনের কবুল হলো না।’ তাঁদের একজন বললেন, ‘আমি তোমাকে হত্যা করবই।’ অপরজন বললেন, ‘আল্লাহ মুত্তাকিদের কোরবানি কবুল করেন।’ (সূরা আল-মায়িদা, আয়াত ২৭)

তারপর আল্লাহর নবী হজরত নূহ (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.) ও হজরত মুসা (আ.)-এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল। মুসলিম জাতির পিতা হজরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহ-প্রেমে স্বীয় পুত্রকে কোরবানি করার মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এক অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে হজরত ইব্রাহিম (আ.) স্বপ্নযোগে সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ত্যাগের জন্য আদিষ্ট হন। তিনি পর পর তিন দিন দৈনিক ১০০ করে মোট ৩০০ উট কোরবানি করেন। কিন্তু তা কবুল হলো না, বারবার আদেশ হলো, ‘তোমার প্রিয় বস্তু কোরবানি করো।’ শেষ পর্যন্ত তিনি বুঝতে পারলেন, প্রাণপ্রিয় শিশুপুত্র হজরত ইসমাইল (আ.)-কে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য উৎসর্গ করতে হবে।

হজরত ইসমাইল (আ.) নিজের জানকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে নির্দ্বিধায় সম্মত হয়ে আত্মত্যাগের বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর প্রতি এটা ছিল আল্লাহর পরীক্ষা। তাই পিতার ধারালো ছুরি শিশুপুত্রের একটি পশমও কাটতে পারেনি; পরিবর্তে আল্লাহর হুকুমে দুম্বা জবাই হয়। পৃথিবীর বুকে এটাই ছিল স্রষ্টাপ্রেমে সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কোরবানি।

আত্মত্যাগের সুমহান ও অনুপম দৃষ্টান্তকে চিরস্মরণীয় করে রাখার জন্য আল্লাহ তাআলা উম্মতে মুহাম্মদির জন্য পশু কোরবানি করাকে ওয়াজিব করে দিয়েছেন। তাঁদের স্মরণে এ বিধান অনাদিকাল তথা রোজ কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের (কোরবানির) গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া। এভাবে তিনি এদেরকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর।’ (সূরা আল-হজ, আয়াত ৩৭)

আরও পড়ুনঃ   আল্লাহর সাহায্য কখন আসবে?

কাল পরিক্রমায় প্রতিবছর পবিত্র হজের পরে ঈদুল আজহা ফিরে আসে, যার প্রধান আকর্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত কোরবানি। ঈদের দিন কোরবানিকে কেন্দ্র করে ধুমধামের সঙ্গে চলে মনের পশুপ্রবৃত্তি ত্যাগের মহোৎসব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় কোনো আমল আল্লাহর কাছে নেই। কোরবানিকারী কিয়ামতের দিন জবেহকৃত পশুর লোম, শিং, ক্ষুর, পশম ইত্যাদি নিয়ে আল্লাহর কাছে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত জমিনে পতিত হওয়ার আগেই তা আল্লাহর কাছে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে যায়। অতএব, তোমরা কোরবানির সঙ্গে নিঃসংকোচ ও প্রফুল্লমন হও।’ (ইবনে মাজা, তিরমিজি)

কোরবানির গোশত তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজের, এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদের ও এক ভাগ গরিবদের মধ্যে বণ্টন করে দেওয়া মুস্তাহাব। কোরবানির চামড়া বা তার নগদ অর্থ এতিমখানা বা গরিব-মিসকিনদের দান করতে হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত, দীন-দুঃখীরাও যাতে ঈদের আনন্দ করতে পারে সে লক্ষ্যে কেবল ভোগ নয়, ত্যাগ-তিতিক্ষার মনোভাব নিয়ে তাদের মধ্যে কোরবানির গোশত অকাতরে বিলিয়ে দিতে হবে এবং দান-সাদকা করতে হবে।

ইসলামে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টির জন্য প্রিয় পোষা প্রাণীকে কোরবানি করার বিধান রয়েছে। শুধুমাত্র যাদের সামর্থ রয়েছে এমন মুসলমানদের ওপরই কোরবানি ওয়াজিব করা হয়েছে। তবে কিতাব ও সুন্নাহর বিচারে এ কথা প্রমাণিত যে, যতক্ষণ না প্রাথমিকভাবে (যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত) দুটি শর্ত পূরণ করা না হয় ততক্ষণ কোনো আমল বা ইবাদতই আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না।

এক: কোরবানি যেন শুধুমাত্র মহান আল্লাহরই উদ্দেশ্যেই হয়। তা না হলে ওই আমল বা ইবাদত আল্লাহর নিকট কবুল হবে না। যেমন: কাবিলের নিকট থেকে কোরবানি কবুল করা হয়নি। তার কারণ হিসেবে হাবিল বলেছিলেন, আল্লাহ তো মুত্তাক্বীদের (পরহেজগার ও সংযমী) কোরবানিই কবুল করে থাকেন। (সুরা মায়িদা, ৫:২৭)

যে কোরবানি হালাল উপার্জন ও আত্মিকভাবে দেওয়া হয় না, সে সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, “আমার কাছে ওগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত বা রক্ত কোনোটাই পৌঁছে না। আমার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবে আমি ওগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করতে পার এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে সঠিক পথ দেখিয়েছেন। কাজেই সৎ কর্মশীলদেরকে তুমি সুসংবাদ দাও। (সুরা হজ, ২২:৩৭)

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকার

দুই. তা যেন আল্লাহ ও তার রাসুল (সা.)’র নির্দেশিত বিধি-বিধান অনুযায়ী হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরিক না করে। (সুরা কাহফ, ১১০)

সুতরাং যারা কেবল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে অথবা লোক সমাজে নিজের নাম ফলাও করে প্রচারের উদ্দেশ্যে মোটা-তাজা ও অতিরিক্ত মূল্যের পশু কোরবানি দেয়। এবং যারা তা প্রদর্শন ও প্রচার করে থাকে তাদের কোরবানি যে ইবাদত হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়- তা বলাই বাহুল্য।

কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার শর্ত:
কোরবানি শুদ্ধ হওয়ার জন্য বেশকিছু শর্ত রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন করার মাধ্যমে শুদ্ধভাবে কোরবানি করা প্রত্যেক কোরবানি দাতার জন্য একান্ত প্রয়োজন।

এক. অবৈধ অর্থ বা টাকা যেমন- সুদ, ঘুষ, প্রবঞ্চনা, প্রতারণা, আত্মসাৎ প্রভৃতি উপায়ে উপার্জিত টাকা দিয়ে কেনা পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। কোরবানিদাতা যেন বৈধভাবে ওই পশুর মালিক হয়। সুতরাং চুরিকৃত, আত্মসাৎকৃত, বন্ধকী পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া, অবৈধ ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে কেনা পশু, কেনার সময় ফাঁকি দিয়ে টাকা কম দেওয়া (খাজনা না দেওয়া) বা ঠকানোর মাধ্যমে কেনা পশুর কোরবানি আদায় হবে না। যেহেতু কোরবানি একটি ইবাদত, যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা হয় সেহেতু অবৈধ উপার্জনের মাধ্যমে কোরবানির ইবাদত আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় নয়। আর যেহেতু অবৈধ উপার্জন হালাল নয় সুতরাং হারাম বা নিষিদ্ধ কাজের মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও সন্তুষ্টি কোনোটিই সম্ভব নয়।

দুই. কোরবানির পশু যেন সেই শ্রেণি বা বয়সের হয় যে শ্রেণি ও বয়স শরীয়ত নির্ধারিত করেছে। সেগুলো হলো- উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা। এগুলোকে কুরআনের ভাষায় বলা হয় বাহিমাতুল আনআম। এ বিষয়ে সুরা হজ এর ২২:৩৪ আয়াতে বলা হয়েছে- “আমি প্রত্যেক সম্প্রদাযের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি এবং তাদেরকে জীবনোপকরণ স্বরূপ যে সকল চতুষ্পদ জন্তু দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর উপর যেন তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে।”

হাদিসে আছে- তোমরা অবশ্যই নির্দিষ্ট বয়সের পশু কোরবানি করবে। তবে তা তোমাদের জন্য দুষ্কর হলে ছয় মাসের মেষ-শাবক কোরবানি করতে পার। (মুসলিম, হাদিস নং ১৯৬৩) একটি উট ও গরু-মহিষে সাত ব্যক্তি কোরবানির জন্য শরিক হতে পারে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৩১৮)। অন্য এক বর্ণনামতে, উট কোরবানিতেও ১০ব্যক্তি শরিক হতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে দান-সাদাকাহর গুরুত্ব

তিন. শরীয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের দিকটা খেয়াল রাখা জরুরি। উট পাঁচ বছর, গরু বা মহিষ অন্তত দুবছর, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা হতে হবে এক বছর বয়সের। অবশ্য অসুবিধার ক্ষেত্রে ছয় মাস বয়সী মেষ কোরবানি করা যায়। প্রিয় নবী (সা.) বলেন, দাতালো ছাড়া জবেহ করো না। তবে তা দুর্বল হলে ছয় মাসের মেষ জবেহ কর। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৯৬৩)। কিন্তু উলামাগণ এ বিষয়ে একমত যে, ছমাস বয়সী মেষের কোরবানি সিদ্ধ হবে; তা ছাড়া অন্য পশু পাওয়া যাক অথবা না যাক।

চার. কোরবানির পশু যাবতীয় দোষ-ত্রুটি মুক্ত হতে হবে। যেমন হাদিসে এসেছে, সাহাবি বারা ইবনে আজেব (রা.) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, চার ধরনের পশু, যা দিয়ে কোরবানি জায়েয হবে না। অন্ধ. যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগাক্রান্ত; যার রোগ স্পষ্ট, পঙ্গু; যার পঙ্গুত্ব স্পষ্ট এবং আহত; যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে। নাসাঈর বর্ণনায় আহত শব্দের স্থলে পাগল উল্লেখ আছে। (তিরমিজি-১৫৪৬)

ঈদুল আজহা শিক্ষা দেয় আল্লাহপ্রেমে তাকওয়া ও মনের একাগ্রতা নিয়ে কোরবানি করতে হবে, লোক দেখানোর জন্য নয়। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্বের সর্বত্র ঈদুল আজহা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর প্রকৃত রূপ হলো মনের গভীরে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তাকওয়া নিয়ে প্রিয় বস্তু তাঁর নামে উৎসর্গ করা।

মুসলমানদের শুধু কোরবানির প্রতীক হিসেবে পশু জবাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বিশ্ব মানবতার শান্তি ও কল্যাণের জন্য সবাইকে উৎসর্গিত ও নিবেদিতপ্রাণ হতে হবে। মানুষের অন্তর থেকে পাশবিক শক্তি ও চিন্তা-চেতনাকে কোরবানি করে দিতে হবে। প্রকৃতপক্ষে কোরবানি জীব-জানোয়ার বা পশু হনন করতে আসে না, বরং কোরবানির মাধ্যমে পশুপ্রবৃত্তিকে বিসর্জন দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার এটি যে একটি উত্তম ব্যবস্থা তা স্মরণ করিয়ে দিতে ঈদুল আজহা প্রতিবছর ফিরে আসে।

আসুন, আমরা দলমত-নির্বিশেষে সবাই মিলেমিশে কোরবানির সঠিক দীক্ষা নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমঝোতার মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, পাপমুক্ত পরিবেশ, হিংসামুক্ত রাজনীতি, সন্ত্রাসমুক্ত দেশ, প্রেম ও ভালোবাসা বিজড়িত বিশ্ব গড়ে তুলি!

ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
[email protected]

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one + three =