ইসলামে চরমপন্থার স্থান নেই

0
16
ইসলামে চরমপন্থা

চরমপন্থা শব্দটির আবরী হলো التطرف, আর التطرف অর্থ হলো কোন বস্তুর অংশবিশেষ ছিনিয়ে নেওয়া। এই শব্দটি ইসলামী শরিয়ার পরিভাষা ব্যবহৃত হয়নি। এবং পবিত্র কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত হয়নি। এই শব্দটি ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শের লোকেরা বেশি ব্যবহার করে। তারাও এর কোন বিশেষ সংজ্ঞা ব্যক্ত করেনি যে, চরমপন্থা বলতে কি বুঝায়! বরং তারা তাদের সুবিধা মত কখনো, রাজনৈতিক ফায়দা উঠানোর জন্য, আবার কখনো মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে, আবার কখনো ইসলামের বিরুদ্ধে এই শব্দটি ব্যবহার করেছে।

আজকে যাদেরকে চরমপন্থী বলছে, কাল আবার তাদেরকেই ন্যায়ের পথিক বলে অভিহিত করছে।

হে সম্মানিত পাঠকগণ! ইসলামী পরিভাষায় আমরা  تطرف বা চরমপন্থা বলতে এতটুকু বলতে পারি, কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি করা। এই বাড়াবাড়ি শব্দটি পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে: তা হলো, الغلو এই বিষয়ে মহান আল্লাহ এরশাদ করছেন:

قُلْ يَا أَهْلَ الكِتَابِ لا تَغْلُوا فِي دِينِكُمْ غَيْرَ الحَقِّ ولا تَتَّبِعُوا أَهْوَاءَ قَوْمٍ قَدْ ضَلُّوا مِن قَبْلُ وأَضَلُّوا كَثِيراً وضَلُّوا عَن سَوَاءِ السَّبِيلِ 

বলুনঃ হে আহলে কিতাবগণ!তোমরা স্বীয় ধর্মে অন্যায়ভাবে বাড়াবাড়ি করো না এবং এতে ঐ সম্প্রদায়ের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে। তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে। (সূরা মায়েদা: ৭৭)

সুতরাং বুঝাগেল ইসলামে চরমপন্থা বা বাড়াবাড়ি করার সুযোগ নাই। এই বিষয়ে আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন:

إِيَّاكُمْ وَالْغُلُوَّ فِي الدِّينِ ، فَإِنَّمَا أَهْلَكَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمُ الْغُلُوُّ فِي الدِّينِ رواه أحمد والنسائي وابن ماجه

 তোমরা দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি বা চরমপন্থা হতে বেঁচে থেকো, কেননা পূর্ববর্তীদের এই বাড়াবাড়ি ধ্বংস করে দিয়েছে। ইসলাম চরমপন্থাকে নিরুৎসাহিত করেছে।

ইসলামে চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদ এবং সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নেই

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ হলো জঙ্গিবাদ পাশাপাশি চরমপন্থা। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া,ওয়েব মিডিয়া,তথা ফেসবুক,টুইটার ব্লগসহ যত মাধ্যম রয়েছে সর্বত্র সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ ও চরমপন্থা শব্দটি শোনা ও দেখা যায়। ইসলামের সাথে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস এবং চরমপন্থার কোন সম্পর্ক যে নাই, বিষয়টি সর্বজন স্বীকৃত হওয়ার পরও এই দুইটি ঘৃণিত শব্দকে ইসলাম ও মুসলমানদের দিকে সম্বোধন করা হচ্ছে। আর জিহাদের মত পবিত্র ও ফরয শব্দকে দূষিত করা হচ্ছে। আজকের খুতবায় আমরা এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো ইনশা আল্লাহ।

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস

জঙ্গ শব্দটি ফার্সী, এর অর্থ যুদ্ধ, আক্রমণ। উগ্রপন্থায় ও চরমপন্থায় সংঘবদ্ধভাবে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করার নাম জঙ্গিবাদ। যারা এ সকল অপকর্ম ও হারাম কাজে লিপ্ত তাদেরকে বলা হয় জঙ্গিবাদী ও চরমপন্থী।

সন্ত্রাস শব্দটির উৎপত্তি “ত্রাস” শব্দ থেকে। ত্রাস হচ্ছে ভয়, ভীতি, আতঙ্ক ও ভীতিকর অবস্থা। সন্ত্রাসের ইংরেজী প্রতিশব্দ হচ্ছে Terror, আর সন্ত্রাসী কার্যক্রম যে পরিচালনা করে তাকে বলা হয় Terrorist,আরবীতে বলা হয় ইরহাব (إرهاب) আর যে কাজটি করে তাকে বলা হয় (إرهابي) ইরহাবী। কুরআনের পরিভাষায় বলা হয় মুফসিদ ফ্যাসাদ-বিপর্যয় সৃষ্টিকারী। আল কুরআনে এ বিপর্যয় সন্ত্রাসকে ফিতনা হিসেবেও আখ্যায়িত করা হয়েছে। এরশাদ হয়েছে :- وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ 

ফিতনা হত্যার চেয়েও জঘন্য। (সূরা বাকারা- ১৯১)

জঙ্গিবাদ আর জিহাদ এক নয়: কুরআনের সবগুলো জিহাদ সংশ্লিষ্ট আয়াতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়েছে। এসব আয়াতের বক্তব্য মতে জোর-যবরদস্তি বা চরমপন্থা, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসের কোন স্থান ইসলামে নেই। দু’পক্ষের সশস্ত্র সংগ্রামকে জিহাদ বলা হয়নি। বরং শত্রু পক্ষের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধকে কিতাল পরিভাষায় ব্যবহার করা হয়েছে। এ কথা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ইসলামের আবির্ভাব থেকে বিগত ১৪শত বছরের ইতিহাসে জিহাদ কুরআন ও হাদীস মোতাবেক আল্লাহকে পাওয়া, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালন, শয়তান থেকে নিজেকে রক্ষা করা, শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা, ভালো কাজের উদ্যোগ নেয়া ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত ইতিবাচক অর্থেই ব্যবহৃত হবে। দুর্ভাগ্যের বিষয় ইসলামের অপব্যাখ্যাকারী, কুরআন ও হাদীসের ভুল ব্যাখ্যাদানকারী তথাকথিত একদল পথভ্রষ্ট, বিপদগামী গোষ্ঠী- ইসলামের, কুরআন ও হাদীসের এই পবিত্র পরিভাষা ও কাজকে ম্লান করার উদ্দেশ্যে, সত্যিকারের আলেম,ওলামা,ও তাদের শান্তিপ্রিয় ধর্মীয় কার্যক্রমকে প্রশ্নের সম্মুখীন করার হীন উদ্দেশ্যে ইসলামের নামে বোমাবাজী, ধর্মের নামে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, বিনা বিচারে মানুষ হত্যা, জনগণের প্রাণ ও সম্পদ বিনষ্ট করার অপচেষ্টা চালিয়েছে এবং বর্তমানেও চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের এই অপকর্মের সাথে পবিত্র কুরআন হাদীস বা গোটা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার কোন সম্পর্ক নেই। তাই এই জঙ্গী তৎপরতা, বোমাবাজী, সন্ত্রাসকে আল কুরআন ফ্যাসাদ বা বিপর্যয় বলে উল্লেখ করেছে। আল কুরআনে ৫০টি আয়াতে ফ্যাসাদকে অত্যন্ত ঘৃণিত, প্রত্যাখ্যাত বিপর্যয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন এরশাদ হয়েছে-

আরও পড়ুনঃ   ইসলামের দৃষ্টিতে জঙ্গিবাদ

وَالَّذِينَ يَنْقُضُونَ عَهْدَ اللهِ مِنْ بَعْدِ مِيثاقِهِ وَيَقْطَعُونَ ما أَمَرَ اللهُ بِهِ أَنْ يُوصَلَ وَيُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ أُولَئِكَ لَهُمُ اللَّعْنَةُ وَلَهُمْ سُوءُ الدَّارِ

যারা আল্লাহর অঙ্গীকারকে দৃঢ় ও পাকাপোক্ত করার পর তা ভঙ্গ করে। আল্লাহ যে সম্পর্ক বজায় রাখতে আদেশ করেছেন তা ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে। ওরা ঐ সমস্ত লোক যাদের জন্য রয়েছে লা’নত বা অভিসম্পাত এবং ওদের জন্যে রয়েছে কঠিন আযাব।” (সূরা রাআদ-২৫)

আল্লাহ ফ্যাসাদকারীকে (সন্ত্রাসীকে) পছন্দ করেন না: যেমন এরশাদ হয়েছে-

وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿٧٧﴾

“পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করতে প্রয়াসী হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না।” (সূরা আল-ক্বাসাস-৭৭)

 এ সন্ত্রাসী ও জঙ্গীবাদীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল ও আতঙ্কগ্রস্ত করে রেখে পার্থিব সম্পদ অর্জন, ক্ষমতা দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে দেশ-বিদেশে পণ্যের বাজার সৃষ্টি করা। এ জঙ্গীবাদের সৃষ্টি হয় বিভিন্ন কারণে।

জঙ্গিবাদ সৃষ্টির কারণসমূহ

 (১) দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা:

কুরআন ও হাদীসের সঠিক আকিদা, সঠিক চিন্তা দর্শন ও পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং কুরআন হাদীসের ভুল ব্যাখ্যা-দানকারীরাই চরমপন্থা ও সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদকে ধর্মীয় শ্লোগানে বৈধতা দানের অপপ্রয়াস চালাচ্ছে।

(২) দুর্বল ঈমান ও তাকওয়ার অভাব:

ঈমানের দুর্বলতা, জ্ঞানের দৈন্য ও তাকওয়ার অভাবে সহজ পন্থায় পরকালে নাজাত ও জান্নাত লাভের প্রত্যাশায় বহুলোক সন্ত্রাসে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মনমগজে এ ভ্রান্ত বিশ্বাস ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে যে, সমাজে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করতে হলে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। কাজেই তারা জীবনকে তুচ্ছ মনে করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং প্রয়োজনে আত্মহত্যা করাকে জিহাদ মনে করে, যার সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক নেই।

 (৩) নেতৃত্ব ও ক্ষমতার লোভ:

 নেতৃত্বের অযোগ্যতা,সমাজের মানুষের প্রতি কর্তব্যবোধের জ্ঞান না থাকা সত্ত্বেও নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হওয়ার লোভ, মেজাজের ভারসাম্য হীনতা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে প্ররোচিত করে।

(৪) আর্থিক অসচ্ছলতা:

দরিদ্রতা, বেকারত্বের অভিশাপে জর্জরিত জনগোষ্ঠি অর্থ উপার্জনের নেশায় সন্ত্রাসী, চরমপন্থা ও জঙ্গীবাদী কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত হয়। কুচক্রী মহল মোটা অংকের টাকা দিয়ে দারিদ্র্য ও বেকার যুবক, কিশোরদেরকে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করছে।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে জিহাদের সাথে জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসের কোন সম্পর্ক নেই

(৫) চারিত্রিক ত্রুটি:

 ভোগবিলাসে মত্ত হয়ে চারিত্রিক ত্রুটির কারণে অনেকেই মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়ে এবং মাদকের অর্থ যোগানের জন্য তারা কোন নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে সন্ত্রাসের ক্রীড়নকে পরিণত হয়।

(৬) দেশ ও জাতির ইতিহাস ঐতিহ্য ধ্বংস করার বিজাতীয় ইন্ধন :

সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের অপতৎপরতার একটি ক্ষেত্র হল দেশ ও জাতির ঐতিহ্যের ধারক ঐতিহাসিক স্থাপনাসমূহ বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া। যার পেছনে ইন্ধন যোগায় ভিনদেশীয় কুচক্রী মহল। এ সকল ইতিহাস ঐতিহ্যের মূল্য সম্পর্কে জঙ্গিবাদী ও সন্ত্রাসীদের সম্যক ধারণা না থাকায় তারা নিমিষেই এ সকল স্থাপনা ধ্বংস করতে কুন্ঠা বোধ করে না।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে জিহাদকে,জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস হতে পার্থক্য বুঝার তাওফীক দান করুন। এবং জিহাদের তাৎপর্য অনুধাবন করে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন

 সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! চরমপন্থার অন্যতম লক্ষণ হচ্ছে অন্ধতা। চরমপন্থী বা গোঁড়া ব্যক্তি নিজের মতের প্রতি একগুঁয়ে ও অসহিষ্ণুর মতো এমন অটল থাকে যে, কোনো যুক্তিই তাকে টলাতে পারে না। অন্য মানুষের স্বার্থ, আইনের উদ্দেশ্য ও যুগের অবস্থা সম্পর্কে তার স্বচ্ছ ধারণা থাকে না। তারা অন্যের সঙ্গে আলোচনায়ও রাজি হয় না, যাতে তাদের মতামত অন্যের মতামতের সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনা করা যায়। তাদের বিবেচনায় যা ভালো হয় শুধু তা অনুসরণেই তারা প্রবৃত্ত হয়। আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য তারা যে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতেও দ্বিধাবোধ করে না। এমনকি কোনো হত্যাকাণ্ডের মতো মারাত্মক অপরাধের পথও বেছে নিতে পারে।

অন্যকে ঠকানো, কষ্ট দেওয়া এবং সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা আল্লাহ পছন্দ করেন না।

 আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ ۖ إِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ﴿٧٧

‘পৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করো না; নিশ্চয় আল্লাহ অনর্থ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।'(সূরা কাসাস : ৭৭)।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,

عَنْ أبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ: صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِالله وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلا يُؤْذِ جَارَهُ .

যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেনো তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। (বুখারী ও মুসলিম)

 এখানে প্রতিবেশী বলতে নির্দিষ্ট কাউকে নির্দেশ করা হয়নি। সে মুত্তাকি হতে পারে, নাও হতে পারে; অমুসলিম হতে পারে আবার দুর্বৃত্তও হতে পারে। ইসলামী আদর্শের অনুসারী না হওয়ার কারণে তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা বা চরমপন্থার আচরণ করা যাবে না।

সম্মানিত পাঠকগণ! ইসলামে আহ্বান করার মূল হাতিয়ার হচ্ছে সদাচরণ, যা ছিল মহানবী (সা.) ও তাঁর সাহাবিদের বৈশিষ্ট্য। মহানবী (সা.) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন,

فَإِنَّ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ عَلَيْكُمْ حَرَامٌ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا

তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের সম্মান হারাম ঘোষণা করলাম, আজকের এই দিনে এই মাসে এবং এই শহরে, সুতরাং কোন মুসলমানকে হত্যার করার প্রশ্ন উঠে না। এমনকি কোন অমুসলিমকেও ইসলাম হত্যা করতে নিষেধ করেছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন:

مَنْ قَتَلَ مُعَاهَداً لَمْ يَرَحْ رَائِحَةَ الجَنَّةِ

  যে ব্যক্তি কোন অঙ্গীকারাবদ্ধ অমুসলিমকেও হত্যা করবে সে জান্নাতের সুঘ্রাণ পাবে না।

সব মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ব্যাপারে গুরুত্ব আরোপ করে মহানবী (সা.) বলেন,

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের স্থান নেই

وَلا تَحَسَّسُوا وَلا تَجَسَّسُوا، وَلا تَنَافَسُوا وَلا تَحَاسَدُوا، وَلا تَبَاغَضُوا وَلا تَدَابَرُوا، وَكُونُوا عِبَادَ اللهِ إِخوَانًا

 ‘তোমরা পরস্পরের ত্রুটি অন্বেষণ করবে না, গুপ্তচরবৃত্তি করবে না, হিংসা-বিদ্বেষ করবে না, ঘৃণা করবে না, পরস্পরের ক্ষতির উদ্দেশ্যে কাজ করবে না, বরং তোমরা সবাই আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে পরস্পর ভাই হয়ে যাও।’ (বোখারি-মুসলিম)।

 বিদায় হজের ভাষণে রাসুল (সা.) সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন,’সাবধান! ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করবে না; কেননা ধর্মে জোর-জবরদস্তির ফলে তোমাদের পূর্ববতী বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।’

 সম্মানিত পাঠক! ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাউকে কষ্ট দেয়া ইসলামে কোথাও সমর্থন করা হয়নি। ইসলামের উত্তম আদর্শে মুগ্ধ হয়েই যুগে যুগে মানুষ ইসলামে আকৃষ্ট হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) তায়েফের ময়দানে অমুসলিমদের নির্যাতনে রক্তাক্ত অবস্থায় জ্ঞান হারিয়ে ফেললেও তাদের প্রত্যাঘাত করার কথা ভাবেননি। ইসলাম প্রচারের পদ্ধতি সম্পর্কে আল্লাহর নির্দেশ-

ادْعُ إِلَىٰ سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ ۖ وَجَادِلْهُم بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ ۚ ﴿١٢٥

 ‘আপনি আপনার পালনকর্তার পথের দিকে আহ্বান করুন জ্ঞানগর্ভ কথা ও উত্তম উপদেশগুলোর দ্বারা এবং তাদের সঙ্গে উত্তম পদ্ধতিতে বিতর্ক করুন।’ (সূরা নহল : ১২৫)।

আল্লাহ বলেছেন, لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ ‘দ্বীনের (ধর্মের) ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি বা বাধ্যবাধকতা নেই।’ (সূরা বাকারা : ২৫৬)।

 রাসূল (সা.) কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,

نَّحْنُ أَعْلَمُ بِمَا يَقُولُونَ ۖ وَمَا أَنتَ عَلَيْهِم بِجَبَّارٍ ۖ فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيدِ ﴿٤٥

 ‘আপনি তাদের ওপর জোরজবরদস্তিকারী নন। অতএব যে ব্যক্তি আমার শাস্তিকে ভয় করে তাকে কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দান করুন।’ (সূরা কাফ : ৪৫)।

 বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ইসলামের নামে চরমপন্থা গ্রহণের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এগুলো হয় কিছু বিপথগামী মুসলমানের দ্বারা সংঘটিত হচ্ছে অথবা মুসলমানদের দায়ী করার জন্য অন্য ধর্মাবলম্বীরা এগুলো করছে। কিন্তু সত্যিকার কোনো মুসলমান যার ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা আছে, তার দ্বারা এ ধরনের চরমপন্থা অবলম্বন করা সম্ভব নয়।

লোকদের কাফের প্রতিপন্ন করা, বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে রক্তপাত ঘটানো, স্থাপনা ধ্বংস করা, নিরপরাধ লোকের প্রাণনাশ করা, সুরক্ষিত বৈধ সম্পদ ধ্বংস করা, লোকদের মাঝে ত্রাসের সৃষ্টি করা এবং তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতায় বিঘ্ন ঘটানো কখনোই প্রকৃত মুসলমানের কাজ হতে পারে না। ইসলাম মুসলিমদের জান-মাল, দেহ ও মান-সম্ভ্রমকে হেফাজত করেছে আর ওইসব নষ্ট করাকে কঠোরভাবে হারাম করেছে। আর এটাই ছিল রাসুল (সা.) এর স্বীয় উম্মতকে লক্ষ্য করে শেষ বক্তব্য। ইসলামে অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যার লাইসেন্স যেমন দেয়নি, তেমনি আত্মঘাতী বোমা হামলারও কোনো অনুমতি নেই। তাছাড়া সন্ত্রাসবাদ ইতিবাচক সমাজ প্রতিষ্ঠার কোনো বুনিয়াদ নয় বিধায় সন্ত্রাসী কার্যকলাপ আদর্শ সমাজ গঠনে ইসলামের কোনো ভিত্তি নয়। আল্লাহ তায়ালা নিরপরাধ লোকদের হত্যাকারীকে কঠোর ধমকি দিয়েছেন। তিনি এ ব্যাপারে বলেন,

وَمَن يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُّتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا ﴿٩٣

 ‘আর যে ব্যক্তি কোনো মুমিনকে স্বেচ্ছায় হত্যা করবে তার পরিণতি জাহান্নাম, তাতে সে চিরকাল থাকবে।

আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হন, তাতে অভিশাপ করেন আর তার জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন।’ (সূরা নিসা : ৯৩)।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সকলকে ইসলামের সঠিক জ্ঞান অর্জন করে তদানুযায়ী আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন

সূত্রঃ নিউ মুসলিম ইনফো

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

six − four =