ইসলামে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের স্থান নেই

0
7
ইসলামে জঙ্গিবাদ

ড. এমরান হোসেন: 

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। জঙ্গিবাদ নামক ভাইরাস দ্বারা বাংলাদেশও আক্রান্ত।এক শ্রেণির ভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট মুসলমান ইসলামের নাম ব্যবহার করে এ অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে যুগ যুগ ধরে শান্তির ধর্ম হিসেবে পরিচিত ইসলাম এবং ইসলামের অনুসারী মুসলমানরা আজ কলঙ্কিত। বিশ্ব নন্দিত মসলমান জাতি আজ নিন্দিত। বিশেষত পাঞ্জাবী, টুপি ও দাড়িওয়ালারা বর্তমানে অস্বস্তিতে দিনাপাত করছে।

জঙ্গিরা অপরকে হত্যাকারী এবং আত্মহত্যাকারী। আত্মঘাতী বোম বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মানুষকে মারছে এবং নিজেও মরছে। এ দুুটিই মহা অপরাধ। অপর মানুষকে হত্যা করা মহাপাপ বলে আল কুরআনে ঘোষিত হয়েছে। কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল বলে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরাতুল মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলেন-“এ কারণেই আমি বানী ইসরাইলের নিকট ঘোষণা করেছি যে, যে ব্যক্তি হত্যাকারী বা অনর্থ বিপর্যয় সৃষ্টিকারী ব্যতীত অপর কোন ব্যক্তিকে হত্যা করল সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করল”। অনুরূপভাবে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সূরাতুন নেসার ৯৩ নম্বর আয়াতে বলেন-“যে ব্যক্তি অপর কোন মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে তার স্থান হবে জাহান্নাম এবং তথায় সে চিরস্থায়ী হবে”। ১০ম হিজরীর ১০ যুলহাজ্জ বিদায় হজ্জের চুড়ান্ত ভাষণে নাবী (স.) বলেন উক্ত দিন, উক্ত মাস এবং মক্কার পবিত্র এলাকা হেরেম শরীফের কথা উল্লেখ করে বলেন-“এ দিন, এ মাস এবং এ এলাকার ন্যায় তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের ইজ্জত একে অপরের নিকট পবিত্র”। অর্থাৎ অপরকে হত্যা করা, অপরের মাল অন্যায়ভাবে ভোগ করা এবং অপরের ইজ্জত নষ্ট করা হারাম। (সাহীহুল বুখারী, কিতাবুল হাজ্জ, হাদীছ নম্বর-৯০৮)।

আত্ম হত্যাও মহাপাপ। কোন ব্যক্তি যদি বার্ধক্যে পৌছে মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে দুঃসহ যন্ত্রণায় কাতরায়, যার কোন চিচিৎসা নেই এবং আরোগ্য হওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই এমন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণ করতে চাইলে তার অনুতি পৃথিবীর কয়েকটি দেশে থাকলেও ইসলামে তা স্বীকৃত নয়। আত্মহত্যা তো দুরের কথা, পার্থিব বিপদ-আপদে নিপতিত হয়ে মৃত্যু কামনা করাও ইসলামে বৈধ নয়। সাহীহুল বুখারীর একটি হাদীছে উল্লেখিত হয়েছে-“কোন বিপদে পতিত হওয়ার কারণে কেউ যেন মৃত্যু কামনা না করে। কিছু যদি বলতেই হয় তবে সে যেন বলে-হে আল্লাহ! যতদিন পর্যন্ত জীবন আমার জন্য কল্যাণকর হয় ততদিন আমাকে বাঁচিয়ে রাখ। আর যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর হবে তখন আমার মৃত্যু দান কর”। (সাহীহুল বুখারী, কিতাবুল মারদা, বাবু তামান্নিল মারীদিল মাওতা, হাদীছ নং ৫২৬৯)। এক ব্যক্তি যতই ভাল কাজ কুরুক না কেন, সে যদি আত্মহত্যা করে তবে তাকে জাহান্নামে যেতে হবে। সাহীহুল বুখারীর একটি হাদীছে আছে, কোন যুদ্ধে এক সাহাবী প্রচ- শৌর্য বীর্য প্রদর্শন করে যুদ্ধ করে চলেছেন। তিনি অনেক কাফিরকে ধরাশায়ী করেছেন। তিনি নিজেও ক্ষত-বিক্ষত হয়েছেন। নাবী (স.) এর আশে পাশের সাহাবীরা তার প্রশংসায় মুখর। কিন্তু নাবী (স.) বললেন-সে জাহান্নামী। এতে সাহাবীরা বিস্মিত হলেন। কিছুক্ষণ পরে দেখা গেল, তিনি বিক্ষত শরীরের ব্যাথা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করলেন। নাবী (স.) এর কথা সত্য হল। তিনি জাহান্নামী হিসেবে সাব্যস্ত হলেন। (সাহীহুল বুখারী, কিতাবুল মাগাযী)।

আরও পড়ুনঃ   রমজানের পর ভাল কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার দশটি মাধ্যম

জিহাদ একটি অতি পরিচিত শব্দ। জিহাদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হল প্রানান্তকর প্রচেষ্টা চালানো, তথা অন্যায় ও অপকর্মের বিরুদ্ধে যথাসাধ্য ভূমিকা রাখা। এটি মুখের মাধ্যমেও হতে পারে, আবার কলমের মাধমেও হতে পারে। সভা-সেমিনা, ওয়ায-মাহফিল, মসজিদের খুতবাহ, টিভি-টকশো, টেবিল-আলোচনা, বিতর্ক অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে সকল অপকর্মের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ ও যৌক্তিকভাবে ইসলামের সুমহান বাণী তুলে ধরাই হল মুখের জিহাদ। পুস্তক, পত্রিকা, লিফলেট, দেওয়াল লিখন ইত্যাদির মাধ্যমেও অনৈসলামিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ইসলামের স্বাশত বাণী তুলে ধরে প্রতিবাদ করা যেতে পারে। এটি হবে কলমের জিহাদ।

জিহাদের চুড়ান্ত রূপ হল কিতাল তথা সশস্ত্র সংগ্রাম। এটি কোন ব্যক্তি গোষ্ঠি বা সংগঠনের কাজ নয়। এটি হল ইসলামী রাষ্ট্রের কাজ। ইসলামী রাষ্ট্র বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হলে রাষ্ট্র প্রধান সশস্ত্র সংগ্রামের ডাক দিতে পারেন। মক্কী জীবনে নাবী কিতালের ঘোষণা দেননি। মদীনায় গিয়ে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার পর বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্মুখীন হলে তিনি কিতালের ডাক দেন। কাজেই অস্ত্রের সাথে সম্পর্ক ব্যক্তির নয়, অস্ত্রের সাথে সম্পর্ক রাষ্ট্রের। এ নীতির বাইরে গিয়ে কোন মুসলমান দ্বারা অপর কোন মুসলমান বা অমুসলমানকে হত্যা করা কোনভাবেই ইসলামী নীতি হতে পারে না। যারা ঐ সমস্ত হত্যাকা- বা সন্ত্রাসের সাথে জড়িত তারা পথভ্রষ্ট, ভ্রান্ত ও বিপদগামী। তারা ইসলামের শত্রু ও মুসলমানদের শত্রু, তথা বিশ্বমানবতার শত্রু। এদেরকে দমন করার জন্য সকলকেই আপন আপন স্থান থেকে ভূমিকা রাখতে হবে। এ দায়িত্ব এককভাবে সরকার বা আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপর ছেড়ে দিলে হবে না। এটি দেশের ষোল কোটি মানুষের সমস্যা। কাজেই দেশের সকল নাগরিককে এগিয়ে আসতে হবে।

স্কুল, কলেজ ও মাদরাসার শিক্ষকদের উচিত শ্রেণিতে পাঠদানের সময় এমন বক্তব্য পরিহার করা, যাতে জঙ্গিবাদ বা সন্ত্রাস উৎসাহিত হয়। মসজিদের খুতবায় ও ওয়ায মাহফিলে উক্তরূপ বক্তব্য থেকে আলিম সমাজেরও বিরত থাকা উচিৎ এবং এমন বক্তব্য দেওয়া উচিৎ যাতে জঙ্গিবাদ নিরুৎসাহিত হয় এবং বিপদগামীরা সঠিক পথে ফিরে আসে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ বিশ্বের নেতৃবৃন্দের নিকট আমার একটি পরামর্শ হল-যে সমস্ত ধর্মভিত্তিক দল গণতন্ত্রকে বিশ্বাস করে বা গণতান্ত্রিকভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায় রাজনৈতিক অঙ্গনে তাদেরকে একটু জায়গা দিতে হবে, যাতে তারা সেখানে স্বাধীনভাবে তাদের মতামত গণতান্ত্রিকভাবে প্রকাশের সুযোগ পায়। ধর্মভিত্তিক কোন দলের নেতা জঙ্গিবাদকে বা সন্ত্রাসকে প্রশয় দেয় বা উক্তরুপ অপকর্মে তাদের কর্মবাহিনীকে উৎসাহিত করে তা আমরা বিশ্বাস করি না। তবে তাদের দলে এমন কিছু কর্মী আছে ধর্মীয় বিষয়ে যাদের অনুভূতি অত্যান্ত সংবেদনশীল। রাজনৈতিক অঙ্গনে তারা কথা বলার সুযোগ না পেলে জঙ্গি গোষ্ঠির সাথে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি থাকে। কাজেই সমীচীন হবে তাদেরকে সুস্থ রাজনীতি করার সুযোগ প্রদান করা। আমাদের দেশে জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত শান্তিপূর্ণ সোনালী সমাজ কায়েম হোক মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট এটাই আমাদের প্রার্থনা।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে চরমপন্থার স্থান নেই

লেখক: অধ্যক্ষ, শংকরবাটী হেফজুল উলুম এফ. কে. কামিল মাদরাসা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

Comments

comments