ইসলামে দান-সাদাকাহর গুরুত্ব

0
30
ইসলামে দান-সাদাকাহর গুরুত্ব

আরও পড়ুন  দান খয়রাত উত্তম : প্রকাশ্যে না গোপনে!

একজন মানুষ যখন তার জীবনকে সব ধরনের উত্তম স্বভাব দ্বারা সুসজ্জিত করবে, তখন সে হবে একজন শ্রেষ্ঠ মানব। আবার যখন কেউ এমনটি না করে তার জীবনে সমাবেশ ঘটাবে সব ধরনের খারাপ স্বভাবের, তখনই সে একজন দুশ্চরিত্রবান। চরিত্রহীন মানুষ আল্লাহপাকের রহমত থেকে সব সময়ই বঞ্চিত। আর এমনই একটি বিধ্বংসী স্বভাব হলো কৃপণতা। কার্পণ্যের ইসলাম-নির্ধারিত অর্থ হলো কারো ওপর যা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা ওয়াজিব, তা না করা। এ ধরনের কার্পণ্যই হারাম। আর এজন্য কৃপণ ব্যক্তিকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। পবিত্র কোরানে ইরশাদ হয়েছে, আর আল্লাহপাক নিজের অনুগ্রহে তাদের যা দান করেছেন, তাতে যারা কৃপণতা করে। এ কার্পণ্য তাদের জন্য মঙ্গলময় হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে; বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সেসব ধন-সম্পদ কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। [সুরা আল-ইমরান] পবিত্র কোরানে আল্লাহ তায়ালা মানুষের নিজ নিজ কর্মপ্রচেষ্টা ও পদ্ধতির ভিত্তিতে মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন এবং প্রত্যেকের তিনটি করে বিশেষণ বর্ণনা করেছেন। প্রথমত যারা সৎকর্ম করার মাধ্যমে জীবনে সফলতা বয়ে আনতে চায়, তাদের শ্রেণী বর্ণনা করতে গিয়ে তিনটি বিশেষণ বর্ণনা করেছেন। ইরাশদ হচ্ছে, অতএব যে দান করে এবং খোদাভীরু হয় এবং উত্তম বিষয়কে সত্য মনে করে। আমি তাকে সুখের বিষয়ের জন্য পথ সহজ করে দেব। [সুরা লাইল]। কোরান গবেষকরা বলেছেন, এই আয়াতের ব্যাখ্যা হলো- আল্লাহ তাদের জান্নাত লাভের জন্য প্রয়োজনীয় আমল সহজ করে দেবেন। ফরজ দান সাদাকাহ হলো ফারিজাতুম মিনাল্লাহ ফরজ সাদাকাহ হচ্ছে ইসলামের বিধিবদ্ধ আইনের অন্তর্গত একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। কুরআন হাদিসের বিধান অনুসারে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তার বিতরণ ব্যবস্থা করতে হবে। জাকাত প্রদানকারী এতে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। অপর দিকে নফল সাদাকার দান ও বিতরণের কর্তব্য সম্পূর্ণভাবে দাতার হাতেই ন্যস্ত রাখা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রেও দাতাকে ইসলামের নৈতিক বিধিব্যবস্থাগুলোর প্রতি অনুসরণ করে চলতে হবে। প্রত্যেক সাহেবে নিসাব মুসলমানের ওপর জাকাত দেয়া ফরজ। পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে এ সম্পর্কে নির্দেশ রয়েছে। যেমন ‘হে মুসলমানগণ! তোমরা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে এবং জাকাত প্রদান করবে।’ এ ধরনের বহু আয়াত কুরআনের বিভিন্ন সূরায় বিভিন্নভাবে একই মর্মার্থ নিয়ে বর্ণিত হয়েছে সালাত ও জাকাত যে পরস্পরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট এবং সালাত ত্যাগ ও জাকাত না দেয়ার অপরাধের মধ্যে আল্লাহর কাছে কোনো পার্থক্য নেই। বরং জাকাত সম্পর্কে হজরত আবুবকর [রা.] জাকাত প্রদানে অস্বীকৃত আরবদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন। সূরা তাওবার ৬০ নম্বর আয়াতে জাকাত প্রাপকদের বিবরণ দেয়ার পর বলা হয়েছে, ‘ফরিদাতুম মিনাল্লাহি’ অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত ফরিদা বা অলঙ্ঘনীয় নির্দেশ। আরো বলা হয়েছে, ‘যারা স্বর্ণ ও রৌপ্যকে গুপ্তধন রূপে সঞ্চিত রাখে এবং তাকে আল্লাহর পথে ব্যয় না করে হে রাসূল! তুমি তাদিগকে একটা যন্ত্রণাদায়ক আজাবের সংবাদ দিয়ে দাও।’ এই আয়াত নাজিল হওয়ার পর রাসূল [সা.]-এর সাহাবিদের মধ্যে বিশেষ চাঞ্চল্য ও উৎকণ্ঠা বেড়ে যায়। ফলে হজরত ওমর ফারুক [রা] রাসূল [সা.]-এর খিদমতে উপস্থিত হয়ে বিষয়টি তার কাছে পেশ করলে রাসূল [সা.] ওমর ফারুক [রা]কে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, ‘যে সম্পদের জাকাত পরিশোধ করে দেয়া হয় তা আয়াতে উল্লিখিত গুপ্তধনের পর্যায়ভুক্ত নহে।’ সম্পদের জাকাত না দেয়া কত বড় মহাপাপ কুরআনের এই আয়াত থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। সূরা মাউনে বলা হয়েছে, ‘তুমি কি দেখেছ সেই ব্যক্তিকে, যে আখিরাতকে [পরকাল] অস্বীকার করে থাকে। সে তো সেই ব্যক্তি যে পিতৃহীনকে [এতিম] গলা ধাক্কা দেয় এবং মিসকিনকে অন্ন দিতে উৎসাহিত করে না। অতএব বিনাশ সেসব নামাজির জন্য যারা নিজেদের নামাজের স্বরূপ সম্পর্কে ভ্রান্ত। যারা লোক দেখানো ভাবে এবাদত করে থাকে এবং জাকাত বন্ধ করে দেয়।’ কুরআনের অন্য জায়গায় সূরা ফুচ্ছিলাতে বর্ণিত হয়েছে, ‘অতএব বিনাশ সেই মুশরিকদের জন্য যারা জাকাত পরিশোধ করে না, বস্তুত তারা হচ্ছে আখিরাতের [কাফির] অমান্যকারী।’ জাকাত ফরজ করা হয়েছে কেবল মুসলমানের ওপর। সুতরাং আয়াতে মুসলমান নামে পরিচিত ব্যক্তিদের মধ্যকার যারা জাকাত প্রদানে বিরত তাদের মুশরিক ও আখিরাতে মুনকির বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সূরা তাওবার ১৪৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যারা [শিরক থেকে] তাওবা করবে এবং যারা নামাজ কায়েম রাখবে ও জাকাত প্রদান করতে থাকবে তারাই হবে তোমাদের দ্বীনি ভাই।’ ইরশাদ হচ্ছে, আর যে কৃপণতা করে ও বেপরোওয়া হয় এবং উত্তম বিষয়কে মিথ্যা মনে করে, আমি তাকে কষ্টের বিষয়ের জন্য পথ সহজ করে দেব। যখন সে অধঃপতিত হবে তখন সম্পদ তার কোনো কাজে আসবে না। [সুরা লাইল]। এই আয়াতের ব্যাখ্যায় কোরান গবেষকরা বলেছেন, কৃপণতাসহ উপরোক্ত তিনটি গুণ যাদের মধ্যে রয়েছে, তাদের শেষ ঠিকানা জাহান্নাম। রাসুল [সা.] বলেছেন, একজন মুমিনের মধ্যে কৃপণতা এবং দুশ্চরিত্র-এ দুটি অভ্যাস একত্রিত হতে পারে না। [তিরমিযি শরিফ]। রাসুল [সা.] আরো বলেছেন, কৃপণ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না। [তিরমিযি শরিফ]। আল্লাহ আমাদের সবাইকে কৃপণতার এই খারাপ গুণ থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

আরও পড়ুনঃ   মানুষকে কষ্ট দেয়া ইসলামের শিক্ষা নয়

সামর্থ থাকতেও দান না করাটা মুনাফেকি

 মহান আল্লাহ বলেন, তাদের মধ্যে এমনও কিছু লোক আছে যারা আল্লাহর কাছে অংগীকার করেছিল, যদি তিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের ধন্য করেন তাহলে আমরা দান করবো এবং সৎ হয়ে যাবো৷ কিন্তু যখন আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে বিত্তশালী করে দিলেন তখন তারা কার্পণ্য করতে লাগলো এবং নিজেদের অংগীকার থেকে এমনভাবে পিছটান দিল যে, তার কোন পরোয়াই তাদের রইল না ৷ ফলে তারা আল্লাহর সাথে এই যে অংগীকার ভংগ করলো এবং এই যে, মিথ্যা বলতে থাকলো, এ কারণে আল্লাহ তাদের অন্তরে মুনাফিকী বদ্ধমূল করে দিলেন, তার দরাবারে তাদের উপস্থিতির দিন পর্যন্ত তা তাদের পিছু ছাড়বে না ৷ [সুরা তাওবার ৭৫ -৭৭]

একটি ঘটনা, একটি শিক্ষা

 ইবনে জরীর, ইবনে আদী হতেম, ইবনে মারদুবিয়া, তাবারানী, বায়হাকী প্রমুখ হযরত আবু উমামাহ বাহেলী [রা.] এর রেওয়ায়েতক্রমে ঘটনাটি এভাবে উল্লেখ করেছেন যে, জনৈক সা’লাবাহ ইবনে হাতেম আনসারী রাসুলুল্লাহ [সা.] এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে নিবেদন করল ‘হুজুর আমার জন্য দোয়া করুন আমি যাতে মালদার ধনী হয়ে যাই । রাসুলুল্লাহ [সা.] বললেন, তাহলে কি তোমার কাছে আমার তরিকা পছন্দনীয় নয়? সে সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন, আমি যতি ইচ্ছা করতাম তবে মদীনার পাহাড়গুলি সোনা হয়ে আমার সাথে সাথে ঘুরত । কিন্তু এমন ধনী হওয়া পছন্দনীয় নয়। তখন সা’লাবাহ ফিরে গেল কিন্ত পরে আবার ফিরে এসে একই নিবেদন করল এই চুক্তির ভিত্তিতে যে, যদি আমি সম্পদপ্রাপ্ত হয়ে যাই তবে আমি প্রত্যেক হকদারকে তার হক বা প্রাপ্য পৌঁছে দেব । এতে রাসুলুল্লাহ [সা.] দোয়া করলেন, যার ফল এই দাঁড়াল যে, তার ছাগল-ভেড়ায় অসাধারণ প্রবৃদ্ধি হতে লাগল । অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মদীনায় তার বসবাসের স্থানটি তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়ে । তখন সে বসবাসের জন্য মদীনার বাইরে চলে যায় কিন্তু সে যোহর ও আসরের নামায মদীনায় এসে রাসুলুল্লাহ [সা.] এর সাথে আদায় করত এবং অন্যান্য নামায বসবাসের স্থানেই পড়ে নিত । এর পর তার ছাগল-ভেড়ায় আরো প্রবৃদ্ধি ঘটে । ফলে তার বসবাসের ঐ স্থানটিও তার জন্য সংকীর্ণ হয়ে পড়ে । তখন সে মদীনার বাইরে আরো দূরে চলে যায় । ফলে সে শুধু জুমুয়ার নামায মদীনায় এসে রাসুলুল্লাহ [সা.] এর সাথে আদায় করত এবং অন্যান্য নামায নামায বসবাসের স্থানেই পড়ে নিত । এর পর তার ছাগল-ভেড়ায় আরো প্রবৃদ্ধি ঘটে । তখন সে মদীনার বহু দূরে চলে গেল যেখান থেকে সে রাসুলুল্লাহ [সা.] সাথে সকল নামাজ পড়া থেকেই বঞ্চিত হল । কিছুদিন পর রাসুলুল্লাহ [সা.] সা’লাবার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে লোকেরা বলল যে তার মালামাল এতই বেড়ে গিয়েছে যে, মদীনার কাছাকাছি কোথাও স্থান সংকুলান না হওয়ায় সে বহু দূরে চলে গিয়েছে । এখন আর তাকে দেখা যায়না । রাসুলুল্লাহ [সা.] একথা শুনে তিন বার বললেন يا ويح ثعلبة অর্থাৎ সালাবার জন্য আফসোস, সালাবার জন্য আফসোস, সালাবার জন্য আফসোস । ঘটনাক্রমে সে সময়েই সাদাকার আয়াত নাযিল হয় যাতে রাসুলুল্লাহ [সা.]কে সাধারণ মুসলমানদের কাছ থেকে সাদাকা আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয় । বলা হয়-خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً রাসুলুল্লাহ [সা.] পালিত পশুর সাদাকার আইন প্রণয়ন করে দু’জন লোককে সাদাকাহ আদায়কারী বানিয়ে মুসলমানদের কাছ থেকে পালিত পশুর সাদাকা আদায়ের জন্য পাঠালেন এবং তাদের বলে দিলেন তারা যেন সালাবার কাছেও যায় এবং বনী সুলাইম গোত্রের আরো এক ব্যক্তির কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। সাদাকাহ আদায়কারী দু’জন লোক সা’লাবার কাছে উপস্থিত হল এবং তাকে রাসুলুল্লাহ [সা.] এর লিখিত ফরমান দেখাল । তখন সা’লাবা বলতে লাগল ‘এ তো জিজিয়া কর হয়ে গেল, যা অমুসলমানদের কাছ থেকে আদায় করা হয়ে থাকে । আপনারা এখন যান, ফেরার পথে এখান হয়ে যাবেন’ । সাদাকাহ আদায়কারী দু’জন চলে গেলেন এবং বনী সুলাইম গোত্রের সেই ব্যক্তির কাছে গেলেন । তিনি যখন রাসুলুল্লাহ [সা.] এর ফরমান শুনলেন তখন নিজের পালিত পশু- উট ও বকরীসমূহের মধ্য যেগুলি সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ছিল তা থেকে সাদাকার নিসাব অনুযায়ী পশু নিয়ে রাসুলুল্লাহ [সা.] এর দুই কর্মকর্তার কাছে হাজির হলেন । তাঁরা বললেন, আমাদের প্রতি নির্দেশ রয়েছে পশু সমূহের মধ্য থেকে উৎকৃষ্টগুলো যেন না নেই । কাজেই আমরা এগুলো নিতে পারি না । সুলাইম গোত্রের লোকটি বার বার বিনয়ের সাথে বলল আমি নিজের খুশিতে এগুলো দিতে চাই, আপনারা দয়া করে এগুলো কবুল করুন। অতঃপর সাদাকাহ আদায়কারী দু’জন সাহাবী অন্যান্য মুসলমানদের সাদাকাহ আদায় করে পুনরায় সা’লাবার কাছে এসে সাদাকাহ আদায়ের কথা বললেন । সা’লাবাহ বলল দাও দেখি সাদাকার আইনগুলো আমাকে । দেখি কি লেখা আছে । সেগুলো দেখার পর সে সেই কথাই বলল যা সে পূর্বে বলেছিল । ‘এ তো জিজিয়া করের মতই হয়ে গেল, যা মুসলমানদের কাছ থেকে আদায় করা উচিত নয় । যা হোক, আপনারা এখন যান, আমি পরে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিব’। সাদাকাহ আদায়কারীগণ যখন মদীনায় ফিরে রাসুলুল্লাহ [সা.] এর খেদমতে হাজির হলেন, তখন তিনি কুশল জিজ্ঞাসা করার পূর্বেই সেই বাক্যটি পুনারুবৃত্তি করলেন, য তিনি পূর্বে বলেছিলেন । বললেন- يا ويح ثعلبة , يا ويح ثعلبة ,يا ويح ثعلبة সা’লাবার জন্য আফসোস, সা’লাবার জন্য আফসোস, সা’লাবার জন্য আফসোস । তারপর সুলাইমীর লোকটির জন্য দোয়া করলেন । মাওলানা মিরাজ রহমান

আরও পড়ুনঃ   আমার/আপনার সবচেয়ে বড় শত্রু ?

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

17 + eleven =