ইসলামে যৌতুক সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ

0
48
ইসলামে যৌতুক নিষিদ্ধ

মাহমুদ আহমদ: একটি পরিবারে কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়ার পর থেকেই পিতা-মাতা স্বপ্ন দেখতে থাকে তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যারা নিম্নআয়ের তারা সন্তানের বিয়ের জন্য শুরু থেকেই কিছু না কিছু অর্থকড়ি জমাতে থাকে বয়েতে খরচাদি করার জন্য। অনেক কষ্ট করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে সন্তানকে পড়ালেখা শিখিয়ে বড় করে। সবাই আশা করে একজন আদর্শবান ছেলের হাতে মেয়েটিকে তুলে দিতে যেন মেয়েটির সংসার সুখের হয়। কিন্তু এত কষ্টে তিলে তিলে গড়ে তোলা আদরের কন্যাকে যখন আরেকজনের হাতে তুলে দেয়, এর কয়েক দিনের মধ্যেই দেখা যায় যৌতুকের দায়ে আদরের সন্তানের ওপর চালানো হচ্ছে নির্যাতন। হাজারো নারী নির্যাতিত হচ্ছে কেবল যৌতুকের দায়ে, এমনকি গাছে বেঁধে পর্যন্ত নির্যাতন চালাতেও দেখা যাচ্ছে। যৌতুকের দায়ে নারী নির্যাতনের মাত্রা যেন বেড়েই চলেছে। বিয়ের পর যৌতুকের কারণে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কতই না অবলা নারী। অথচ ইসলামে বর-পণ বা যৌতুক দেয়া-নেয়া বলতে কিছু নেই। এটি সম্পূর্ণ বেদাত। কন্যাপক্ষের কাছে পাত্রপক্ষের কোনো দাবি আল্লাহতাআলার পবিত্র কোরআনে এবং হজরত রাসুল করিম (সা.)-এর কোনো হাদিসে উল্লেখ পাওয়া যায় না। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতাআলা কন্যার পক্ষ থেকে তার পিতার ওপর একটি দাবি রাখেন এবং তার স্বামীর কাছ থেকে দুটি দাবি রাখেন। ‘বিবাহের আগ পর্যন্ত পিতার ওপর মেয়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৩)
বিয়ের সময় থেকে আজীবন স্ত্রীর ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বামীর ওপর এবং বিয়ের সময়ে স্ত্রীকে দেনমোহর ও যৌতুক দেওয়ার দায়িত্বও স্বামীর ওপর। যেভাবে আল্লাহতাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘পুরুষগণ স্ত্রীলোকদের ওপর অভিভাবক, কেননা আল্লাহ তাদের কতককে কতকের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন এবং এই কারণেও যে, তারা নিজেদের ধন-সম্পদ থেকে স্ত্রীলোকদের জন্য খরচ করে’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৩৪)। আর হাদিসে উল্লেখ রয়েছে, হজরত হাকিম ইবনে মুয়াবিয়া (রা.) তার পিতা মুয়াবিয়া (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হে আল্লাহর রাসুল! স্বামীর ওপর স্ত্রীর কী কী অধিকার রয়েছে? তিনি (সা.) বললেন, তার অধিকার হলো যখন তুমি খাবে তখন তাকেও খাওয়াবে, তুমি যে মানের কাপড় পরবে তাকেও সে মানের কাপড় পরাবে। তার মুখে আঘাত করবে না। অশ্লীল ভাষায় গালাগাল করবে না’ (আবু দাউদ)। এই হলো ইসলাম ও রাসুলে করিম (সা.)-এর আদর্শ।
বর্তমানে আমরা মুসলমান এবং শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত হওয়ার দাবি করছি ঠিকই তবে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা এবং শ্রেষ্ঠ নবীর আদর্শ সামান্যও আমাদের মাঝে দেখা যায় না। হজরত রাসুল করিম (সা.)-এর আদর্শ দেখুন, হজরত খাদিজা (রা.) তার অঢেল ধন-সম্পদের সবকিছু রাসুলে করিম (সা.)-এর খিদমতে পেশ করলেন, আর তিনি (সা.) এই সম্পদ কী করলেন, মানবতার আদর্শ মহানবী (সা.) এসব সম্পদ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণ করে দিলেন। নিজের জন্য কিছুই রাখলেন না। এই ছিল খাতামান্নাবীঈন হজরত মহানবী (সা.)-এর আদর্শ। হাদিসে পাওয়া যায়, তিনি (সা.) কনের পক্ষ থেকে যৌতুক হিসেবে কোনো কিছু গ্রহণ করাকে নিষেধ করেছেন এবং এ কথাও বলেছেন বর কনের বাড়িতে মুসাফিরের মতো যাবে, কনে পক্ষের যেমন সামর্থ্য রয়েছে তেমন আপ্যায়ন করবে। বরপক্ষের জন্য আলাদা কোনো আয়োজন করা যাবে না। আমরা মুসলমান দাবি করছি ঠিকই কিন্তু করছি সবই উল্টো, যা ইসলামে নেই সেসবই বেশি করে করছি। বর্তমানে দেখা যায়, পাত্রপক্ষ পাত্রীপক্ষের কাছে টাকা, অলঙ্কার, গাড়ি, বাড়ি, তৈজসপত্রাদির বড় বড় দাবি আদায় করে থাকে। আর সে মোতাবেক না দিলে চলে নির্যাতন, এমনকি হত্যা পর্যন্ত করতে দ্বিধাও করে না।
আমরা যদি মুসলিম পারিবারিক আইনের দিকে লক্ষ করি সেখানেও যৌতুককে কঠোরভাবে নিষিদ্ব করা হয়েছে। যৌতুক একটি কুসংস্কার এবং জঘন্যতম প্রথা। ইসলামি বিধানে কখনো এই জঘন্যতম প্রথাকে সমর্থন করে না। যেমন ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত মুসলিম পারিবারিক আইন-কানুনে উল্লেখ রয়েছে, ‘ইসলামে পণ প্রথার বিধান নেই। পাত্র বা পাত্রী কোনো পক্ষই বিবাহের পূর্বে পাত্র বা পাত্রী পক্ষের নিকট হইতে টাকা-পয়সা, ঘড়ি, আংটি, রেডিও, টেলিভিশন, মোটরসাইকেল ইত্যাদী গ্রহণ করা বা লইবার চুক্তি করা উচিত নহে।’
ইসলামি শিক্ষা মোতাবেক বিবাহে কোনো পক্ষই অপরের কাছে আল্লাহতাআলা এবং তাঁর রাসূলের দাবিগুলো ছাড়া অন্য কোনোরূপ দাবি-দাওয়া করতে পারবে না। বিয়ে সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, সাধারণত রমণীদের চারটি গুণের অধিকারিণী দেখে বিবাহ করা হয়। যথাÑ তার ধন-সম্পদ, তার বংশমর্যাদা, তার সৌন্দর্য এবং তার ধর্মপরায়ণতার জন্য। তোমরা ধর্মপরায়ণ নারীকে বিবাহ করে ধন্য হও, অন্যথায় তোমাদের উভয় হস্ত অবশ্যই ধুলায় ধূসরিত হবে। (আবু দাউদ) ধার্মিকতাবিহীন নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্য সেই পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের মতো যার বাইরে চাকচিক্য মানুষকে মুগ্ধ করলেও ভেতরে রয়েছে বিষাক্ত জন্তু-জানোয়ারে বসবাস। ধার্মিকতায় পরিপূর্ণ নারীর বাহ্যিক অবস্থা যেমনই হোক না কেন ভেতরে তার মণি-মুক্তা আর হীরা-পান্নায় পরিপূর্ণ, যা মানুষের ইহকাল ও পরকালের অফুরন্ত পাথেয়।
শুধু নারীর ধার্মিকতার দ্বারাই দাম্পত্য জীবন সুখী হবে এমনটা ভাবার অবকাশ নেই। কেননা বিবাহ-উত্তর দাম্পত্য জীবনের সর্বাঙ্গীণ সাফল্যের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ভূমিকাই সমান। হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.) আরও বলেছেন, যখন তোমরা দেখ কোনো ব্যক্তি বিবাহ করেছে, সে ধর্মের অর্ধেক পূর্ণ করেছে, এরপর তারা উভয়ে বাকি অর্ধেকের জন্য আল্লাহকে ভয় করুক। (বায়হাকি)
আমরা যদি নিজেকে মুসলমান এবং শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত বলে দাবি করি তাহলে আমাদের বিয়েশাদিতে হজরত রাসুল করিম (সা.)-এর শিক্ষা এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা উচিত সেই সঙ্গে আমাদের ইসলামি নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। মুখে বলব মুসলমান আর করব অনৈসলামিক কাজ তা হতে পারে না। সমাজে যৌতুকের যে প্রচলন তার বিপক্ষে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তাদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করতে হবে এবং যারা যৌতুক নিয়ে বিয়ে করে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা দরকার আর এমন বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা যদি কেউ যোগদান না করি তাহলে তাদের মাঝে একটা লজ্জা কাজ করবে, ফলে অন্যরাও এ বিষয়ে সতর্ক থাকবে। মহান আল্লাহতাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা ও নিয়ম-নীতি অনুযায়ী চলার তৌফিক দান করুন, আমিন।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে নারীর যৌন অধিকার সম্পর্কে জেনে নিন

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামনিস্ট

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

7 + 7 =