জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচিতি এবং নামসমূহের আলোচনা

0
32
জান্নাত ও জাহান্নামের পরিচিতি

সংকলনে : সৈয়দা সুফিয়া খাতুন :
জান্নাতের পরিচিতি :
জান্নাত আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ বাগান। এ শব্দ থেকেই জিনেই বলা হয়ে থাকে। আর আরবরা খেজুর গাছকেও জান্নাত বলে আখ্যায়িত করত। [মুহাম্মদ বিন আবু বকর আর রাযি, মুখতারুস সিহাহ পৃ: ৪৮। দেখুন: আল্লামা ইবন মানজুর, লিসানুল আরব, পৃ: ১৩/৯৯ এবং আল্লামা আছফাহানী, মুফরাদাতুল কুরআন, পৃ: ২০৪]
মুখতার আল-কামুসে জান্নাত শব্দের অর্থ খেজুর গাছ, বিভিন্ন ধরনের গাছ বিশিষ্ট বাগান। এর বহুবচন জিনেইুন। [আহমদ তাহের আযযাবী, মুখতারুল কামুস, পৃ: ১১৭]
পরিভাষায় জান্নাতের সংজ্ঞা: এটি সেই ঘরের একটি ব্যাপক নাম [যে ঘরকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার অনুসারীদের জন্য তৈরি করে রেখেছেন] যাতে রয়েছে অফুরন্ত ও অসংখ্য নেয়ামত, অনাবিল আনন্দ ও প্রশান্তি, অন্তহীন খুশি, আনন্দ ও চিরস্থায়ী শান্তি। [দেখুন: আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. এর ‘হাদিয়ুল আরওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ’ পৃ: ১১১]
জান্নাতের নামসমূহ
জান্নাতের নাম, অর্থ ও শব্দের উৎপত্তি সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কাইয়েম রহ. বলেন, জান্নাতের সিফাতসমূহের বিবেচনায় জান্নাতের নাম একাধিক, কিন্তু জান্নাত একাধিক নয় জান্নাত একটিই। সুতরাং, এ দিকটির বিবেচনায় একাধিক নামের অর্থ অভিন্ন আর জান্নাতের সিফাতসমূহের দিক বিবেচনায় প্রতিটি নামের অর্থ ভিন্ন। অনুরূপভাবে আল্লাহর নাম, আল্লাহর কিতাবের নাম, আল্লাহর রাসূলদের নাম, আখিরাতের নাম ও জাহান্নামের নাম ইত্যাদি। (এগুলো সবই এক, কিন্তু সিফাত একাধিক হওয়ার কারণে এগুলোর নাম একাধিক)। [আল্লামা ইবনুল কাইয়েম, হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১১]।
পবিত্র কুরআনের আলোকে জান্নাতের নামসমূহ
১. জান্নাত: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘জান্নাতে প্রবেশ কর, যে আমল তোমরা করতে তার কারণে।’ [সূরা নাহল : ৩২]
২. দারুস-সালাম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘আর আল্লাহ দারুস-সালামের (শান্তির আবাস) দিকে আহ্বান করেন এবং যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দেন সরল পথের দিকে।’ [সূরা ইউনুস : ২৫]
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও ইরশাদ করেন- ‘তাদের জন্য তাদের রবের নিকট রয়েছে দারুস-সালাম (শান্তির আবাস) এবং তারা যে আমল করত, তার কারণে তিনি তাদের অভিভাবক।’ [সূরা আনআম : ১২৭]
যেহেতু এটি যাবতীয় বিপদাপদ হতে একটি  শান্তি ও নিরাপত্তার ঘর, তাই একে দারুস-সালাম বলা হয়। [হাদিয়ুল আরহওয়াহ ইলা বিলাদিল আফরাহ পৃ: ১১৩]
৩. দারুল খুলুদ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- ‘তোমরা তাতে শান্তির সাথে প্রবেশ কর। এটাই (ইয়াওমুল খুলুদ) স্থায়িত্বের দিন।’ [সূরা ক্বাফ, আয়াত: ৩৪]
৪. দারুল মুকামাহ: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- ‘যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদেরকে স্থায়ী নিবাসে (দারুল মুকামাহ) স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোন কষ্ট আমাদেরকে স্পর্শ করে না এবং যেখানে কোন ক্লান্তিও আমাদেরকে স্পর্শ করে না।’ [সূরা ফাতের, আয়াত: ৩৫]
৫. জান্নাতুল মাওয়া: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- ‘যার কাছে জান্নাতুল মা’ওয়া  অবস্থিত।’ [সূরা আন-নজম, আয়াত: ১৫]
৬. জান্নাতু আদন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন- ‘তা চিরস্থায়ী জান্নাত (জান্নাতু আদন), যার ওয়াদা পরম করুণাময় তাঁর বান্দাদের দিয়েছেন গায়েবের সাথে। নিশ্চয় তাঁর ওয়াদাকৃত বিষয় অবশ্যম্ভাবী।’ [সূরা মারয়াম, আয়াত: ৬১]
৭. আল ফিরদাউস: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয় যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের মেহমানদারির জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস।’ [সূরা কাহাফ, আয়াত: ১০৭]
ফিরদাউস: এমন বাগান যাতে রয়েছে সব ধরনের গাছ গাছালি এবং বিভিন্ন বাগানে যা থাকে তা সবই এক জায়গায় অর্থাৎ ঐ বাগানে পাওয়া যায়, তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। [দেখুন: আল্লামা ইবনে হাজরের ফতহুল বারী ১৩/৬, কামুসুল মুহিত পৃ: ৭২৫]।
ফিরদাউস: এমন জান্নাত যা সব জান্নাতের বিষয়ে ব্যবহার করা যায় অথবা সর্বত্তোম ও সর্বোৎকৃষ্ট জান্নাতকে জান্নাতুল ফিরদাউস বলা হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে, এ জান্নাতটি অন্যান্য জান্নাতের তুলনায় এ নামে নামকরণ করা বিষয়ে অধিক উপযুক্ত। [হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ১১৬]
আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন, জান্নাত হল, গোলাকার গম্বুজের মত। সর্বোৎকৃষ্ট, প্রশস্ত ও সর্বোত্তম জান্নাত হল, জান্নাতুল ফিরদাউস। আর এ জান্নাতের ছাদ হল, আল্লাহর আরশ। যেমন, সহীহ হাদিসে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- ‘তোমরা যখন আল্লাহর নিকট জান্নাত কামনা করবে তখন জান্নাতুল ফিরদাউস কামনা করবে। কারণ, তা হল, উৎকৃষ্ট ও উন্নত জান্নাত। এ জান্নাতের উপর রয়েছে পরম করুণাময় আল্লাহর আরশ। তা হতে জান্নাতের নহরসমূহ প্রবাহিত হয়।’ [বুখারি ২৭৯০ ও ৭৪২৩, হাদিয়ুল আরওয়াহ পৃ: ৮৪]
৮. জান্নাতুন নাঈম: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয় যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদের জন্য রয়েছে নিআমতপূর্ণ জান্নাত (জান্নাতুন নাঈম)।’ [সূরা লোকমান : ৮]
৯. আল মাকামুল আমীন: আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ইরশাদ করেন- ‘নিশ্চয় মুত্তাকীরা থাকবে (মাকামুল আমীনে) নিরাপদ স্থানে।’ [সূরা দুখান, আয়াত: ৫১]
মাকাম শব্দের অর্থ: অবস্থানের জায়গা। আর আল আমীন অর্থ সব ধরনের খারাবী ও  বিপদ-আপদ হতে নিরাপদ হওয়া। এটি ঐ জান্নাতকে বলা হয়, যে জান্নাত সব ধরনের নিরাপত্তাজনিত বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে। [হাদিয়ুল আরওয়াহ, পৃ: ১১৬]

আরও পড়ুনঃ   প্রথম সতর্কবাণী: কুরআন ও সুন্নাহর উপর আমল করা ওয়াজিব

Comments

comments