তাড়াহুড়ো বিচার : ইসলাম ও মানবাধিকার সম্মত নয়

0
15
ইসলাম ও মানবাধিকার

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান : ইসলাম এমন একটি জীবন দর্শন যে, এর সকল কর্মকান্ডে মানবিক মূল্যবোধ প্রাধান্য পায়। ইসলামে সকল কিছুর উপর মানবিক মূল্যবোধের স্থান। ইসলামী আইন এবং বিচারের ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। মানবতা ও মনুষ্যত্ব ভূলুষ্ঠিত হয় এমন কোন আইন ইসলামে নেই। বরং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণ বিবেচনা করে মহান আল্লাহ আইনগুলো প্রণয়ন করেছেন। ইসলামে এমন কোন আইন নেই যার মধ্যে মানবিকতার দিকটি উপেক্ষিত। এমনিভাবে ইসলামে বিচারব্যবস্থায়ও মানবতাকে সবার উপর স্থান দেয়া হয়েছে। ইসলামে বিচার-ফয়সালার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। সমাজে সুবিচার না থাকলে বিভিন্ন ধরনের অনাচার, দুরাচার, বাড়াবাড়ি, অসন্তোষ, আইন অমান্যের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে। সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম মানুষকে নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করে। বর্তমানে বিচারের ক্ষেত্রে যেসব দুরাচার ও অনাচার সংঘটিত হচ্ছে এর প্রত্যেকটির ব্যাপারে পূর্বেই ইসলাম মানুষকে হুশিয়ার করে দিয়েছে। বিচারে ভাল ব্যক্তিকেই ইসলাম সত্যিকারের ভাল লোক বলে আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশে আইন এবং বিচার কার্যকর করার ক্ষেত্রে অনেক সময় অনেক অনাকাক্মিখত ঘটনার জন্ম দেয়া হয়। এতে বিচারের মাধ্যমে মানুষের প্রতি তথা মানবতার প্রতি চরম অবিচার করা হয়। বাংলাদেশে প্রচার মাধ্যমের বদৌলতে জনগণ মাঝে মাঝে এসব জানতে পারে। যেমন- মিথ্যা মামলা, সাজানো মামলা, সংশ্লিষ্ট লোককে অভিযুক্ত না করে নিরপরাধ ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা, মিথ্যা সাক্ষী বানানো, আইন ও বিচারকে রাজনীতি দিয়ে প্রভাবিত করা, দলীয় বিবেচনায় বিচারপতি নিয়োগ, বিচারপতিদের অবমাননা করা, জামিন প্রদানে নিরপেক্ষতা বিসর্জন, ঘুষ গ্রহণ, লঘু দন্ডে বড় শাস্তি এবং গুরু দন্ডে ছোট শাস্তি, রিমান্ডের নামে অমানবিক নির্যাতন ইত্যাদি। অত্র প্রবন্ধে ইসলামী আইন ও বিচারের মানবিক দিক এবং বিচারকের জন্য পালনীয় দিকসমূহ সবিস্তার আলোচনা করে ইসলামী আইন ও বিচার ব্যবস্থার মানবিক দিকটি তুলে ধরা হয়েছে।

ইসলামের কিছু মৌলিক বিশ্বাস ও দর্শন রয়েছে যেগুলোর মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, মানব কল্যাণ ছাড়া অন্য কোন প্রসংগ এখানে প্রাধান্য পেতে পারে না। ইসলামের লক্ষ্যই হচ্ছে মানুষের কল্যাণ সাধন। যেমন- মানুষ অপরাপর মানুষের কল্যাণ করবে, মহান আল্লাহ এ জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। শুধু সিজদার জন্য সৃষ্টি করার দরকার হলে ফেরেশতাগণই যথেষ্ট ছিল। মহান আল্লাহ্ এ প্রসংগে বলেন, ‘‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে।” ‘‘আল কুরআন, ৩:১১০’’

ইসলাম মানুষের জন্য, মানবতার জন্য এবং মনুষ্যত্বের জন্য। আল্লাহ্ তাআলা পৃথিবীর সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের কল্যাণের জন্য। ইসলামী আইন ও বিচারের কথা ভিন্নভাবে বলার দরকার নেই। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘‘তিনি পৃথিবীর সব কিছু তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন।” ‘‘আল কুরআন, ২:২৯’’ এখানেও মানবতারই জয়গান করা হয়েছে। ইসলামে মানুষই সব, মানুষের জন্যই সব। এ জন্য মানুষের প্রতি কোন রকমের অবিচার মহান আল্লাহ্ সহ্য করেন না। এসব চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই মহান আল্লাহ আইন-কানুন ও বিচার ব্যবস্থা দিয়েছেন, যাতে মানবতা সর্বোচ্চ উপকৃত হয় এবং কোন অবস্থায় অনাকাক্মিখত অবস্থার শিকার না হয়।

ইসলামী আইনের উৎস অহীর জ্ঞান, যা রিসালাত ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের কাছে এসেছে। নবী-রসুল এবং আসমানী কিতাবসমূহ সবকিছু মানুষের জন্য। আসমানী কিতাবসমূহে এমন একটি আইনও নেই যা মানুষের জন্য বেমানান, অসামঞ্জস্যপূর্ণ। অর্থাৎ ইসলামী আইনের মধ্যেও মানবীয় দিকটি সবার ঊর্ধ্বে তুলে ধরা হয়েছে। এ জন্য দেখা যায়, ইসলামের প্রত্যেক নবী নবুওয়্যাত প্রাপ্তির পূর্বে মানবিক মূল্যবোধে শানিত একজন ব্যক্তি ছিলেন। আর তাদের এ মানবিক দিকটি নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তি, দল, গোত্র বা গোষ্ঠীর জন্য ছিল না। তারা মানুষের মধ্যে কোন রকম বিভেদ সৃষ্টি হতে দিতেন না। রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) বলেন, ‘‘আমাকে সকল শ্রেণীর মানুষের প্রতি পাঠানো হয়েছে।” ‘‘বুখারী, ইমাম, আসসহীহ, অধ্যায়: তায়াম্মুম, অনুচ্ছেদ: ১, রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০০’’

আরও পড়ুনঃ   ইসলাম ও মৌলিক মানবাধিকার -(পর্ব-২)

এখানে শাস্তির জন্য শাস্তি দেয়া হয় না বরং মানুষের সুখ-শান্তি নিশ্চিত করার জন্য প্রতীকী বিচার করা হয়। মানুষের শিক্ষা যেহেতু অন্যতম একটি উদ্দেশ্য তাই বিচারের সময় মানুষের একটি দল যাতে এ শাস্তির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন প্রত্যক্ষ করে ইসলাম সেই বিধান রেখেছে। মহান আল্লাহ্ বলেন, ‘‘মুমিনদের একটি দল যেন ওদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” ‘‘আল কুরআন, ২৪:২’’ ইসলামের প্রাথমিক যুগে যেহেতু আইন ও বিচার ছিল প্রতীকী ও দৃষ্টান্তমূলক তাই সেখানে শাস্তির ঘটনা খুব কমই ঘটেছে।

সত্যিকারের নিরপেক্ষতা বলতে যা বুঝায় ইসলামী আইন তা-ই। মহান আল্লাহ্ রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-কে দিয়ে ইসলামী আইন ও বিচার কার্যকর করেছেন। তিনি এ ব্যাপারে পূর্ণ নিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠা করে নযীর স্থাপন করেছেন। বিশেষত তিনি ইসলামী আইন ও বিচার কার্যকর করার মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, আইনের চোখে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে হয়। এখানে সাদা-কালো, আরব-অনারব, মুসলিম-অমুসলিম, ধনী-গরীব, সরকারী-বেসরকারী ইত্যাদি বিবেচ্য বিষয় নয়। রসুলুল্লাহ্ (সাঃ) তাঁর বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, ‘‘জেনে রেখো! অনারবের উপর ‘আরবের কিংবা ‘আরবের উপর অনারবের, কাল মানুষের উপর লাল মানুষের কিংবা লাল মানুষের উপর কাল মানুষের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। যার মধ্যে আল্লাহভীতি আছে, সে-ই শ্রেষ্ঠ। ‘‘নু’মানী, শিবলী, সীরাতুন্নবী, আযমগড় : মাতবা’আ মা’আরিফ, ১৯৫২, পৃ. ১৫৪’’ রসূলুল্লাহ্ (সাঃ) একবার জমি সংক্রান্ত একটি মামলায় একজন মুসলিমের মোকাবিলায় একজন ইয়াহূদীর পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। মোট কথা আল্লাহর রসূল (সাঃ) আইন ও বিচারের মাধ্যমে মানবতাকে শীর্ষে তুলে ধরেছেন। ইসলাম যে মানুষ আর মানবতার জন্য তা তিনি শতভাগ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, একবার একজন কুরায়েশ বংশীয় সম্ভ্রান্ত মহিলা চুরির অপরাধে ধরা পড়লে, তার হাত কাটার নির্দেশ দেন। আভিজাত্য ও বংশ মর্যাদার কথা উল্লেখ করে সে মহিলার শাস্তি লাঘব করার জন্য নবী (সাঃ)-এর কাছে সুপারিশ করা হলে তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহ এ কারণেই ধ্বংস হয়ে গেছে যে, তাদের কোন সাধারণ লোক অন্যায় করলে তার শাস্তি হতো অথচ কোন মর্যাদাবান লোক অন্যায় করলে তার শাস্তি হতো না। আল্লাহ্র শপথ! মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করতো, তবুও আমি তার হাত কাটার নির্দেশ দিতাম।” ‘‘বুখারী, ইমাম, আসসহীহ্, রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০০, অধ্যায়: হুদূদ, অনুচ্ছেদ: ১১-১২’’ সর্বোপরি এ কথা বলা যায় যে, ইসলামী আইন ও বিচারে কোন ধরনের বৈষম্য নেই। বৈষম্য যেহেতু একটি অমানবিক শব্দ, কাজেই ইসলামের মত জীবনাদর্শে তা একান্ত ভাবেই বেমানান।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সম্মান-মর্যাদা রক্ষার গুরুত্ব

ইসলামের আইন ও বিচারসহ সকল কিছুতে ভারসাম্য পরিলক্ষিত হয়। এখানে এক আইনের সাথে অন্য আইনের চমৎকার সমন্বয় রয়েছে। এক আইন অন্য আইনের পরিপূরক। শুধু তাই নয় বরং যে পরিমাণের অপরাধ শাস্তিও সে ধরনেরই হয়ে থাকে। ইসলামী আইন ও বিচার মানুষকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করে। ইসলামী আইন ও বিচার পরোক্ষভাবে মানুষকে সাবধান বাণী শুনিয়ে যায়। মহান আল্লাহ্ এ প্রসংগে বলেন, ‘‘হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে। যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।” ‘‘আল কুরআন, ২:১৭৯’’

মানবিক মর্যাদার (১-এর কঃ দেখুন)

মানবাধিকার সম্মত নয়

(৮-এর কঃ পর)

প্রতি স্বীকৃতি ও মুল্য প্রদান ইসলামের একটি বিশেষ দিক। ইসলাম প্রত্যেক ব্যক্তির অন্তর্নিহিত মূল্য ও মর্যাদায় বিশ্বাস করে। ব্যক্তির প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদার যথার্থ স্বীকৃতির মাধ্যমে সমাজে সত্যিকারের ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। এতে মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটে, আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠে ও সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষের মূল্য ও মর্যাদার স্বীকৃতি ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষা। আল্লাহ্ তাআলা বলেছেন, ‘‘আমি তো আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি।” ‘‘আল কুরআন, ১৭:৭০’’ অতএব আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও ব্যবহারের মাধ্যমেই মানব মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। এভাবে ইসলাম জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী নির্বিশেষে মানবতার শ্রেষ্ঠত্ব ও পূর্ণ মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছে। এ প্রসংগে বলা হয়েছে, Human being was given superiority over the angels and every human being however low his position and status may be in his society is very much respectable before Allah, his creator, at whose biddings even the angels had to salute him. Such acknowledgment is the source of all position, repression and exploitation.’’ ”Bhuiyan, Mahbubur Rahman, The Appeal of Islam, Chittagong: Islamic Cultural Centre, 1980, p. 33”

আমরা জানি ‘ইসলাম’ শব্দটি ‘সিলমুন’ ধাতু হতে উদ্ভুত। যার অর্থ শান্তি, সন্ধি, নিরাপত্তা, আনুগত্য, মান্য, গ্রহণ ইত্যাদি। আইনের মাধ্যমে সত্যিকারের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য যে ধরনের আইন প্রয়োজন মহান আল্লাহ্ সে ধরনের আইনই ইসলামের মাধ্যমে আমাদের দিয়েছেন।

বিচারের মাধ্যমে যদি পরকালিন কল্যাণ ও মুক্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয় তাহলে ইসলামী আইন ও বিচারের মাধ্যমেই তা সম্ভব। ইসলামী পরিভাষায় সুবিচারের জন্য যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে তার কোন বিকল্প শব্দ হতে পারে না। ‘আদল’ শব্দটিকে বাছাই করে মহান আল্লাহ যে, সবচেয়ে বড় বিচারক তা আবারও প্রমাণ করেছেন। মানবিক মুল্যবোধের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল, ন্যায়বিচার, সাম্য ও ইনসাফ। মানবিক মূল্যবোধের অভাবের ফলশ্রুতিতে এখন সর্বত্র অবিচার আর যুলম চলছে। কিন্তু ইসলামে মানবিক মূল্যবোধের ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য। একথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, যেসব মূলনীতির ওপর ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল, তার মধ্যে প্রধান একটি হলো এ ‘আদল’। প্রাক-ইসলামী যুগে ‘আদলের অভাবে মানুষ পশুবৎ হয়ে পড়েছিল। বাংলাদেশের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অবিচার অনুপ্রবেশ করেছে। কতিপয় ব্যতিক্রম ছাড়া সর্বত্র একই চিত্র। অন্য দিকে অনেকেই অবিচার ও অত্যাচারের শিকার হয়ে আর্তচিৎকার করছে। ন্যায়-বিচারের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে সর্বত্র। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কোথাও সর্বতোভাবে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত নেই।

আরও পড়ুনঃ   ইসলাম ও কোরআনে বিশ্বাসের ভিত্তি

আরবি ‘আদল’ শব্দটির অর্থ-সমান করা, ন্যায়বিচার, সুবিচার, ইনসাফ, কোন কিছুকে দাবিদারদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেয়া, যাতে কেউ কম-বেশি না পায়। ‘আদল মানে মানুষকে সমানভাবে দেখা, সবাইকে সমান সুযোগ দেয়া। যে যেখানে যতটুকু পাবে তাকে ততটুকু দেয়াই ‘আদল। ইসলামের আদল শুধু কাঠগড়ায়ই সীমিত নয়, বরং জীবনের সর্বত্র আদল প্রতিষ্ঠা করতে হয়। জীবন-যাত্রায়ও আদল প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু নামায পড়লে যেমনি ‘আদল হবে না, আবার নামায বাদ দিয়ে অন্যসব কিছু করলেও জীবনে ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হবে না। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যে ‘আদল এর সমন্বয় সাধন করতে হবে। কুরআন-সুন্নাহর দেয়া আইন সকলের জন্য সমান। সামান্যতম ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সকলের উপর তা সমভাবে প্রয়োগ করা উচিৎ। আল-কুরআনে মহান আল্লাহ্ তাঁর নবীকে নিম্নোক্ত ঘোষণা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘‘আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে।” ‘‘আল কুরআন, ৪২:১৫’’ অর্থাৎ পক্ষপাতমুক্ত সুবিচার-নীতি অবলম্বন করার জন্য আমি আদিষ্ট ও নিয়োজিত। পক্ষ পাতিত্বের নীতি অবলম্বন করে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া আমার কাজ নয়। সকল মানুষের সাথে আমার সমান সম্পর্ক- আর তা হচ্ছে ‘আদল ও সুবিচারের সম্পর্ক। অসত্য যার বিপক্ষে, আমি তার সাথী; সত্য যার বিরুদ্ধে, আমি তার ঘোর বিরোধী। আমার দীনে কারও জন্য কোন পক্ষপাতদুষ্ট ব্যবহারের অবকাশ নেই। আপন-পর, ছোট-বড়, ভদ্র-অভদ্রদের জন্য পৃথক পৃথক অধিকার সংরক্ষিত নেই। যা সত্য তা সকলের জন্যই সত্য; যা গুণাহ, তা সকলের জন্যই গুণাহ; যা হারাম তা সবার জন্যই হারাম, যা হালাল তা সবার জন্যই হালাল; যা ফরয, তা সকলের জন্যই ফরয। ইসলামের এ মানবিক মূল্যবোধের এ সর্বব্যাপী প্রভাব থেকে আমার নিজের সত্ত্বাও মুক্ত নয়, নয় ব্যতিক্রম। মহানবী (সাঃ) নিজে এ মূলনীতি বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘‘তোমাদের পূর্বে যেসব উম্মত অতিক্রান্ত হয়েছে, তারা এজন্য ধ্বংস হয়েছে যে, নিচু শ্রেণীর অপরাধীদেরকে আইন অনুযায়ী শাস্তি দান করতো, আর উঁচু পর্যায়ের অপরাধীদেরকে ছেড়ে দিতো। সেই সত্তার শপথ! যাঁর হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, মুহাম্মদের কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করতো, তবে আমি অবশ্যই তার হাত কেটে ফেলতাম।” ‘‘বুখারী, ইমাম, আসসহীহ, প্রাগুক্ত, অধ্যায়: হুদূদ, অনুচ্ছেদ: ১১, ১২’’

আল্লাহর নির্দেশমালার মধ্যে ‘আদলের স্থান সবার উপরে। আল-কুরআনে বলা হয়েছে, ‘‘আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি নিষেধ করেন অশ্লীলতা, অসৎকার্য ও সীমালংঘন।’’ ‘‘আল কুরআন, ১৬:৯০’’ সর্বত্র ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ঐচ্ছিক ধরনের কর্মসূচি নয়। এটি অপরিহার্য একটি বিধান। বিভিন্ন কারণে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তার মধ্যে একটি হলো স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতমূলক নীতি দর্শন। এমতাবস্থায় অনেকেই নিরপে থাকতে পারে না। মহান আল্লাহ্ বলেছেন, ‘‘হে মু’মিনগণ! আল্লাহর উদ্দেশ্যে ন্যায় সাক্ষ্যদানে তোমরা অবিচল থাকবে; কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনও সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে, সুবিচার কর, এটি তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় কর।’’ ‘‘আল কুরআন, ৫:৮’’

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × 4 =