ত্যাগ ও কোরবানী: ঈমানের অপরিহার্য দাবী

0
53
ত্যাগ ও কোরবানী

সবর ও ত্যাগ-কোরবানীর মাধ্যমে আল্লাহ’র দ্বীনের পথে অটল থাকা হচ্ছে ঈমানের অপরিহার্য দাবী। আমরা যখন ঈমানের ঘোষণা প্রদান করি তখন আমাদের উপর অপরিহার্য হয়ে পড়ে এ ঘোষণার সত্যতা প্রমাণ করা। আর তখনই আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় অসংখ্য বাঁধার পাহাড়। প্রতিষ্ঠিত কায়েমী স্বার্থবাদী তথা তাগুতি গোষ্ঠী র্মা র্মা কাট্ কাট্ করে তখন আমাদের দিকে তেড়ে আসে। আর তখনই প্রমাণ হয়ে যায় কার কতটুকু ঈমান আছে কিংবা ঈমানদারী আর পরহেজগারীর দাবীতে আসলে কে কতটুকু সৎ। কারণ তখন আমাদের অনেক প্রিয় জিনিস স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে হতে পারে কিংবা ঝাঁপিয়ে পড়তে হতে পারে কঠিন বিপদের মধ্যে। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :
‘মানুষেরা কি মনে করেছে যে, আমরা ঈমান এনেছি একথা বললেই তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে? আর তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না? অথচ আমি তাদের পূর্ববর্তীদেরকে পরীক্ষা করেছি। ঈমানের দাবীতে কারা সত্যবাদী আর কারা মিথ্যাবাদী আল্লাহ অবশ্যই তা জেনে নিবেন। Ñ[আনকাবুত : ২-৩]
“মুমিনদের বৈশিষ্ট্য এই যে, যখন তাদের মাঝে ফায়সালার জন্য আল্লাহ ও রাসূলের (বিধানের) প্রতি ডাকা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম। আর এ ধরনের লোকেরাই প্রকৃত সফলকাম।” Ñ[আন-নূর : ৫১]
‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কল্যাণ লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ তোমাদের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আল্লাহর জন্য ত্যাগ না করতে পারবে। তোমরা যা কিছুই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে অবগত।’ Ñ[আলে ইমরান : ৯২]
জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ বা আল্লাহর পথে জিহাদ আর স্বার্থভিত্তিক রাজনীতি যেমন এক নয়, তেমনি জিহাদকে রাজনীতি-নিরপেক্ষ মনে করারও কোন সুযোগ নেই। আল্লাহর রাসূল যেমন, তেমনি পূর্ববতী কোন নবী-রাসূলও সমকালীন রাজনীতি থেকে বিমুখ ছিলেন না।
বরং তাঁদের সংগ্রাম-সাধনার প্রধান প্রতিপক্ষই ছিল সমকালীন কায়েমী স্বার্থবাদী খোদাদ্রোহী রাজনৈতিক নেতৃত্ব। বস্তুত মানুষের জীবনের এমন কোন অংশ বা ক্ষেত্র নেই যা আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে অবস্থান করতে পারে। সুতরাং রাজনীতিও আল্লাহর আনুগতের বাইরে থাকতে পারে না। বরং রাজনীতিই যেহেতু মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে, মানুষের সমাজ-সংগঠনকে পরিচালনা করাই যেহেতু রাজনীতি, সেহেতু নবী-রাসূলদের অন্যতম প্রধান কাজই ছিল রাজনীতিকে খোদাদ্রোহী শক্তির কব্জা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর হুকুমের অধীন করা।
সুতরাং দ্বীনদারী ও পরহেজগারীর নামে যারা সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন তথা সত্যের সংগ্রাম থেকে দূরে থাকতে চান তারা আসলে স্বার্থপরতা, প্রবৃত্তিপূজা আর দুনিয়ার প্রেমে মশগুল হয়ে পিঠ-বাঁচানোর নীতিকেই বেছে নিয়েছেন মাত্র। বরং তাদের এই ভূমিকা বদর যুদ্ধের প্রাক্কালে মুনাফিক সর্দার আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের সাথেই কেবল তুলনা করা যায়, যে মিথ্যা বাহানা দেখিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পৃষ্ট প্রদর্শন করেছিল। যারা রাজনীতি থেকে সযতনে দূরে থাকতে চান এবং মসজিদে মসজিদে চিল্লা দেয়াকেই জিহাদ মনে করেন তাদের চিন্তা করা উচিত আল্লাহর রাসূলও এই পিঠ-বাঁচানো আপোষমূলক জিহাদ করেছিলেন কিনা! যদি করতেনই, তাহলে প্রিয়নবীকে সারা জীবন আবু জাহেল-আবু লাহাবদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে হতো কিনা! আর ফিরাউন,
নমরূদের সাথেই বা মুসা (আ.) ও ইব্রাহিম (আ.)-দের সংঘাতের কী কারণ ছিল! মনে রাখা উচিৎ আল্লাহ কিন্তু আল কোরআনে পরহেজগারী বা আল্লাহ ভীতির উপায় নির্দেশ করতে যেয়েই জিহাদের কথা বলেছেন :
‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং তাঁর নৈকট্য অন্বেষণ কর এবং আল্লাহর পথে জিহাদ কর; যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’Ñ[আল মায়েদা : ৩৫]

আরও পড়ুনঃ   ইহরাম অবস্থায় মুহরিমকে কোন কোন বিষয় থেকে বিরত থাকতে হবে?

আসলে নফসের গোলামীকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই কিছু লোক দ্বীনকে তাদের খেয়াল-খুশীর অধীন করে নিয়েছে। তারা কোরআনের চেয়ে তাদের নিজেদের মনগড়া মতকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। তারা নিজেদের সুবিধা ও মর্জি মতো দ্বীনের একটি কল্পিত রূপ দাঁড় করিয়ে নিয়ে বাতিল ও কায়েমে স্বার্থবাদী শক্তির সাথে আপোষের নীতি গ্রহণ করেছে। তারা দ্বীনকে বিজয়ী না করে তাগুতের অধীন করে রাখতে চায় এবং বাতিলের অনুমোদন সাপেক্ষে ও নিজেদের সুবিধা ও স্বার্থপরতাকে অক্ষুণ রেখে দ্বীনের কিছু ব্যাপার মানে আবার কিছু ব্যাপারে পাশ কাটিয়ে যায় কিংবা বাতিলের সাথে সুর মিলায়। মূলত আল্লাহর পরিবর্তে তারা গাইরুল্লাহকেই প্রভু ও সাহায্যকারী মনে করে। এভাবে ঐশী কালামকে যারা নিজেদের খেয়াল-খুশি ও প্রবৃত্তির অধীন করে, সার্থের বশবর্তী হয়ে যারা সত্যকে গোপণ করে; প্রকৃতপক্ষে মুসলিম নামধারী এ ধরনের লোকদের জন্যই দুনিয়াতে ইজ্জত ও সম্মানের পরিবর্তে রয়েছে
লাঞ্চনা-গঞ্জনা আর অপমান :
‘তাহলে তোমরা কি আল্লাহর কিতাবের একাংশ বিশ্বাস কর আর অপর অংশ কর অবিশ্বাস? জেনে রাখো, তোমাদের যারাই এ ধরনের আচরণ করবে তাদের জন্য পার্থিব জীবনে রয়েছে লাঞ্চনা ও অপমান আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিনতম আযাব। তোমরা যা কিছুই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে বে-খবর নন।’ Ñ[আল-বাকারা : ৮৫]

অপর দিকে যারা নফসের বিপক্ষে ঈমানদারীর উপর অটল থাকে, সমস্ত বাঁধা-বিপত্তিকে পায়ে ঠেলে যারা সুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির ব্যাপারেই থাকে পাগলপারা, সেসব সাচ্চা মুমিনদের জন্যই তাঁদের রবের তরফ থেকে নাযিল হয় রহমতের ফল্গুধারা। তাঁদের জন্যই অপেক্ষা করে সাফল্য ও বিজয় : ‘নিশ্চয়ই যারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ, এরপর তাতে অটল থাকে, তাদের কাছে ফেরেস্তা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, তোমরা ভয় কর না, চিন্তা কর না এবং তোমাদের প্রতিশ্র“ত জান্নাতের সুসংবাদ শোন।’Ñ[হা-মীম-আস সিজদা : ৩০]
যারা প্রকৃত ঈমানদার তারা ভরসা করে আল্লাহর উপর। তারা বিশ্বাস করে আল্লাহই সর্বশক্তিমান।তিনিই আমাদের সত্যিকারের সাহায্যকারী। আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে তারা কখনো নিরাশ হয় না। এ কারণে শয়তানের কোন ওয়াসওয়াসাই তাদেরকে ঈমানের পথ থেকে বিচ্যূত করতে পারে না। আল্লাহ বলেছেন :
‘কারণ আমার রহমত প্রতিটি জিনিসকেই পরিব্যাপ্ত করে রযেছে।’ Ñ[আলআরাফ : ১৫৬]
‘হে নবী, আমার বান্দাহ যদি আমার তোমার কাছে জিজ্ঞেস করে, তাহলে তাদের তুমি বলে দাও যে, আমি তাদের অতি নিকটে। যে আমাকে ডাকে আমি তার ডাক শুনি এবং উত্তর দিয়ে থাকি। কাজেই আমার আহ্বানে সাড়া দেয়া এবং আমার প্রতি ঈমান আনা তাদের কর্তব্য।
এসব কথা তুমি তাদের শুনিয়ে দাও, হয়তো তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।’ -[বাকারা :
১৮৬]
পক্ষান্তরে যারা দুর্বল ঈমানদার তারা শয়তানি শক্তির সামান্য আঘাতেই ভেঙে পড়ে এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে পড়ে। তারা অতি সহজেই শয়তানের খপ্পরে পড়ে বাতিলের সাথে হাত মিলায় এবং বাতিলকেই তাদের  শুভাকাঙ্খি ও সাহায্যকারী মনে করে। ঐসব বিভ্রান্ত লোকেরাই যুগে যুগে স্রষ্টার দেয়া শাশ্বত সনাতন জীবন বিধান ইসলামকে বাদ দিয়ে বাতিল পথের অনুসারী হয়, হেদায়াতের পরিবর্তে গোমরাহিকে খরিদ
করে নেয়। সেসব বিভ্রান্ত লোকদের উদ্দেশ্যেই আল্লাহ বলেছেন :
‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে অবিশ্বাসীগণ ছাড়া আর কেউ নিরাশ হয় না।’Ñ[ইউসুফ :
৮৭]
‘যারা আল্লাহর পরিবর্তে অপরকে সাহায্যকারী রূপে গ্রহণ করে তাদের উদাহরণ মাকড়সা। সে ঘর বানায়। আর ঘর সমূহের মধ্যে মাকড়সার ঘরই তো অধিক দুর্বল। যদি
তারা জানতো।’ -[আনকাবুত : ৪১]
[email protected]

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে হজের গুরুত্ব ও তাৎপর্য

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

three + 3 =