দাওয়াত প্রচারে প্রযুক্তির ব্যবহার: কেন ও কিভাবে?

0
12
দাওয়াত প্রচারে প্রযুক্তি

আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ যুবায়ের : মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতি সৃষ্টি করে তাদের হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবি-রাসুলদের প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসুলগণ পৃথিবীতে এসে স্ব যুগের প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে দাওয়াত প্রচার করেছেন। মহান আল্লাহর দেওয়া বাণী মানুষের কাছে পৌঁছিয়েছেন।

মুসা আ. এর সময় জাদুর প্রভাব ছিল বেশি। মুসা আ. যুগের প্রেক্ষাপট বুঝে আল্লাহর প্রদত্ত যাদুর বিকল্প পদ্ধতি ব্যবহার করে ফেরাউন ও তাঁর সম্প্রদায়কে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করেছেন। যুগের প্রেক্ষাপট বুঝে দাওয়াত প্রদানের কারণে অসংখ্য জাদুকর আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল।

ঈসা আ. এর সময়ে চিকিৎসা বিদ্যার প্রচলন ছিল বেশি। তিনি তাই আল্লাহ প্রদত্ত চিকিৎসা বিদ্যার ব্যবহারের মাধ্যমে দাওয়াত দিয়েছেন। মৃতকে আল্লাহর হুকুমে জীবিত করে দেখানোর মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ করেছেন।

সর্বশেষ মুহাম্মাদ সা. কে আল্লাহ সারা জাহানের জন্য রহমত স্বরূপ এ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছিলেন। তিনি এ ধরণীতে এসে মুশরিক, ইহুদি সহ সবাইকে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। দাওয়াত দানে তিনি তৎকালীন প্রযুক্তি ব্যবহার করেছেন। সাফা পাহাড়ে উঠে এবং ওকায মেলায় গিয়ে গিয়ে তিনি মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। সে যুগে সাহিত্যের প্রভাব ছিল বেশি। তিনি উচ্চাঙ্গের আরবী সাহিত্যের ব্যবহার করেও মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন।

নবী সা. জীবদ্দশাতেই দাওয়াতের জিম্মাদারি তাঁর উম্মতের উপর অর্পিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে এই উম্মতকে শ্রেষ্ঠ উম্মত বলা হয়েছে তাঁদের উপর দাওয়াতের কাজ অর্পনের কারণেই।  কেয়ামত পর্যন্ত তাই এই উম্মতের উপর দাওয়াতি কাজ করা ফরয। এই উম্মতকে তাই সব রকমের উপায়ে দাওয়াতি কাজ কেয়ামত পর্যন্ত চালিয়ে যেতে হবে।

বিজ্ঞানের উন্নতির এই যুগে দাওয়াত প্রচারের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অল্প সময়ে, অল্প কষ্টে অসংখ্য মানুষের কাছে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার করা যায়। তবে আধুনিক মাধ্যমগুলোতে ইসলামের ছহিহ আকিদার মানুষ কম আসায় এ ক্ষেত্রে সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন ভ্রান্ত দল ও গোষ্ঠী। তাদের থেকে তরুণ প্রজন্মকে বাঁচাতে আধুনিক মাধ্যমগুলোতে সঠিক আকিদার ইসলামকে মানুষের চরিত্র গঠনের নিয়তে ব্যবহার করতে হবে। নিচে কিছু আধুনিক প্রযুক্তির উল্লেখ করা হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ   মাতৃভাষায় ইসলাম প্রচারের গুরুত্ব

ফেসবুকঃ ফেসবুক বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও একটি জনপ্রিয় সাইট। বর্তমানে প্রায় সব বয়সের মানুষ এ দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে থাকেন। ফেসবুক এখন ইসলামি দায়ীদের দাওয়াত প্রদানের জন্য একটি সহজ পথ উন্মোচন করে দিয়েছে। বিভিন্ন পদ্ধতিতে ফেসবুকের মাধ্যমে দাওয়াতের কাজ করা যায়। ইসলামিক লেখা পোস্ট করে, পেজ খুলে এবং গ্রুপ খুলে সে গ্রুপে ইসলামি লেখা পোস্ট করার মাধ্যমে অনেক মানুষের মাঝে দাওয়াত প্রচার করা যায়।

টুইটারঃ ইউরোপের মানুষসহ বহির্বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ টুইটার ব্যবহার করে থাকে। ইংরেজিতে ইসলামি ছোট ছোট লেখা এখানে পোস্ট করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত সহজেই প্রচার করা সম্ভব।

ইমেইলঃ ইমেইলের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের কাছে ইসলামের বাণী মুহূর্তেই পৌঁছানো যায়। যত বড় লেখাই হোক না কেন তা লেখে মানুষকে দ্বীনের দাওয়াত দেওয়া যায়।dawat

ইউটিউবঃ সারা বিশ্বে বহুল ব্যবহৃত একটি সাইট হচ্ছে ইউটিউব। বিশ্বের এমন কোন দেশ নেই যে দেশে ইউটিউবের ব্যবহার নেই। তাই ইউটিউবে বিভিন্ন ওয়াজ, তাফসিরুল কুরআনের ও হাদিসের আলোচনা আপলোড করা। বিভিন্ন মাসায়ালা মাসায়েলের প্রশ্ন উত্তরের ভিডিও আপলোড করা। ইসলামি হামদ ও নাত এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ভিডিও আপলোড করে সারা বিশ্বে ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরা।

বিশেষ করে ইংরেজি ভাষায় ইসলামি ভিডিও আপলোড করা হলে বিশ্বে সহজেই ইসলামের সৌন্দর্যকে তুলে ধরা সম্ভব হবে।

ওয়েব সাইটঃ বিভিন্ন ওয়েব সাইট খুলে তাতে ইসলামিক বয়ান, ঐতিহাসিক নিদর্শন, ইসলামিক ফটোগ্রাফি, নবীদের জীবনী, সাহাবাদের জীবনী, বুজুর্গদের ত্যাগ ইত্যাদি তুলে ধরার মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াতের কাজ করা যায়।

ব্লগঃ বর্তমানে অনলাইনে অসংখ্য ব্লগ রয়েছে। এসব ব্লগে ইসলামের লেখা লিখে দাওয়াতি কাজ করতে হবে। বেশি বেশি ইসলামি লেখা পোস্ট করে ব্লগগুলোকে কলুষমুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নিজস্ব ইসলামি ব্লগ প্রতিষ্ঠার চেষ্টাও আমাদের করতে হবে।

আরও পড়ুনঃ   ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের ২০টি বিভ্রান্তিকর প্রশ্নের জবাব

ওয়েব পোর্টালঃ বর্তমানে অনলাইনে ওয়েব পোর্টালের ছড়াছড়ি। এসব পোর্টালগুলোতে অপ্রয়োজনীয় নিউজ বেশি প্রচার করা হয়। তাই এসব পোর্টাল গুলোতে ইসলামি লেখা বেশি বেশি লেখতে হবে। ইসলামি সংবাদ বেশি বেশি প্রচার করতে হবে। যেন এসব পোর্টালের পাঠকরা এ থেকে ইসলামি খোরাক পায়। ইসলাম ও মুসলমানের বর্তমান অবস্থা জানতে পারে।      

ইলেকট্রনিক্স মিডিয়াঃ টিভি, রেডিওসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় কুরআন প্রতিযোগিতা, ইসলামি সাধারণ জ্ঞান কুইজ প্রতিযোগিতা ও প্রশ্ন-উত্তর পর্ব সহ নানান ইসলামি প্রোগ্রামের আয়োজন করা। তাহলে এসব মিডিয়ার দর্শক বা শ্রোতাদের কাছে সহজেই ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানো যাবে।

এখানে উল্লেখ্য, এ লেখার মাধ্যমে কাউকে টিভি বা রেডিও কেনার প্রতি আগ্রহী করা হচ্ছে না। বরং যারা টিভি দেখেই থাকেন, রেডিও শুনেই থাকেন তাঁরা যেন ইসলামের প্রোগ্রাম দেখতে ও শুনতে পান। তাঁদের জন্যই এ উদ্যোগ।

প্রিন্ট মিডিয়াঃ প্রিন্ট মিডিয়াগুলোতে বিভিন্ন বিষয়ে ইসলামি আর্টিকেল লেখা। ইসলামি কুইজের আয়োজন করা। এখানে লেখালেখি করা হলে এর পাঠকরা সহজেই ইসলামের দাওয়াত পেয়ে যাবেন।

মোবাইলঃ মোবাইলে মেমোরি কার্ডের মাধ্যমে ওয়াজ, হামদ নাত, কুরআন তেলাওয়াত ও অন্যান্য ইসলামি আলোচনা লোড করা। বিভিন্ন এ্যাপের সাহায্যে কুরআন শরিফ ডাউনলোড করা, হাদিসের বই ও বিভিন্ন ইসলামি বই ডাউনলোড করা এবং এসব নিকট মানুষদের মোবাইলে শেয়ার করার ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়া।

অনলাইনে ফ্রি বই প্রকাশ করাঃ অনলাইনে ফ্রি বই প্রকাশ করার সুযোগ দিয়ে থাকে অনেক প্রকাশনী। তাঁদের সহযোগিতা নিয়ে নিজের লেখা ইসলামি বইগুলো ফ্রি প্রকাশ করে মানুষ ইসলাম জানার সুযোগ করে দেওয়া।

স্ক্যানিং কপি আপলোড করাঃ নিজস্ব ইসলামি বই বা পত্রিকা স্ক্যানিং করে অনলাইনে আপলোড করে দেওয়া। যেন মানুষ হাতের নাগালেই ইসলামি বই ও পত্রিকা পেয়ে যায়। তবে অন্যের বই বা পত্রিকা অনুমতি ছাড়া স্ক্যানিং না করা।

আরও পড়ুনঃ   ফেসবুক ব্যবহারে কিছু ইসলামী নির্দেশনা

বিজ্ঞাপনঃ বর্তমানে সব কিছুর বিজ্ঞাপনেই নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে। কোন কোন বিজ্ঞাপনে অশ্লীল ছবিও ব্যবহার করা হয়। কিভাবে বিজ্ঞাপনে ইসলামি বা শরীয়ত সম্মত ছবি ব্যবহার করা যায় সে চিন্তা ভাবনা করা। এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইসলামি দাওয়াত প্রচার করার ব্যবস্থা করা।

এ ছাড়াও লিংকডিন, ভিকে, বেশতো ও ফেসবইয়ের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে ইসলামি দাওয়াত দ্রুত প্রচার করা এখন অতি সহজ কাজ।

Comments

comments