দারিদ্র বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নে যাকাত

0
24
দারিদ্র বিমোচন , মানব সম্পদ

. ইসলামে যাকাতের গুরুত্ব

যাকাত ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি। আল-কুরআনে বারংবার নামায কায়েমের পরেই যাকাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বারংবার বলা হয়েছে- “সালাত কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো।” (দ্রষ্টব্য: সূরা আল-বাকারাহ: ৪৩, ৮৩, ১১০ ও ২৭৭ আয়াত; সূরা আন-নিসা ৭৭ ও ১৬২ আয়াত; সূরা আন নুর: ৫৬ আয়াত; সূরা আল-আহযাব ৩৩ আয়াত, সূরা মুয্‌যামম্মিল: ২০ আয়াত)

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আরও বলেন- “তাদের অর্থসম্পদ থেকে যাকাত উসুল করো যা তাদের পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা আত্‌-তাওবা: ১০৩ আয়াত)

“মুশরিকদের জন্যে রযেছে ধ্বংস, তারা যাকাত দেয় না।” (সূরা হামীম: ৬-৭ আয়াত)

“আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে তোমরা যে যাকাত দাও মূলতঃ তা যাকাত দানকারীরই সম্পদ বৃদ্ধি করে।” (সূরা আররুম: ৩৯ আয়াত)

রাসূলে করীম (স) নির্দেশ দিয়েছেন- “তোমাদের সম্পদে যাকাত পরিশোধ করো।” (তিরমিযী, হিদায়া)

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, যাকাদের বিধি-নির্দেশ শুধু উম্মাতে মুহাম্মাদীর উপরই নাযিল হয় নি, অতীত কালে অন্যান্য নবীদের উম্মতের উপরেও এই হুকুম ছিল আল্লাহর পক্ষ হতেই। হযরত ইসমাঈল (আঃ) ও হযরত ঈসার (আঃ) সময়েও যাকাতের বিধান প্রচলিত ছিল। (সূরা মরিয়ম: ৩১ ও ৫ আয়াত এবং সূরা আল আম্বিয়া: ৭৩ আয়াত)।

কেন যাকাতের এই গুরুত্ব? ইসলামী সমাজ ব্যবস্থায় যাকাত সম্পদ বন্টনের তথা সামাজিক সাম্য অর্জনের অন্যতম মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হয়ে থাকে। সমাজে আয় ও সম্পদ বন্টনের ক্ষেত্রে বিরাজমান ব্যাপক পার্থক্য হ্রাসের জন্যে যাকাত অত্যন্ত উপযোগী হাতিয়ার। কিন্তু যাকাত কোন স্বেচ্ছাসেবক দান নয় বরং দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের জন্যে আল্লাহ নির্ধারিত বাধ্যতামূলক প্রদেয় অল্থ-সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ। যাকাতের সংগে প্রচলিত অন্যান্য সকল ধ রনের করের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কারণ, ইসলামের এই মৌলিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একাধারে নৈতিক, ধর্মীয ও সামাজিক মূল্যবোধ অন্তর্নিহিত রয়েছে। কিন্তু করের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোন নৈতিক, ধর্মীয় ও সামাজিক তাগিদ নেই।

যাকাত ও প্রচলিত করের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। প্রথমতঃ কর হচ্ছে বাধ্যতামূলকভাবে সরকারকে প্রদত্ত নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ যার করদাতা কোন প্রত্যক্ষ উপকার প্রত্যাশা করতে পারে না। সরকারও করের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দরিদ্র ও অবাবী জনসাধারণের মধ্যে ব্যয়ের জন্যে বাধ্য থাকে না। পক্ষান্তরে যাকাতের অর্থ অবশ্যই আল-কুরআনে নির্দেশিত নির্ধারিত লোকদের মধ্যেই মাত্র বিলি-বন্টন করতে হবে।

দ্বিতীয়তঃ যাকাতের অর্থ রাষ্ট্রীয় সাধারণ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে ব্যয় করা যাবে না। কিন্তু করের অর্থ যেকোন কাজে ব্যয়ের ক্ষমতা ও পূর্ণ স্বাধীনতা সরকারের রয়েছে।

তৃতীয়তঃ যাকাত শুধুমাত্র সাহেবে নিসাব মুসলিমদের জন্যেই বাধ্যতামূরক। কিন্তু কর, বিশেষতঃ পরোক্ষ কর, সর্বসাধারণের উপর আরোপিত হয়ে থাকে। অধিকন্তু প্রত্যক্ষ করেরও বিরাট অংশ জনসাধারণের উপর কৌশলে চাপিয়ে দেওয়া হয়।

চতুর্থতঃ যাকাতের হার পূর্ব নির্ধারিত ও স্থির। কিন্তু করের হার কোনক্রমেই স্থির নয়। যেকোন সময়ে সরকারের ইচ্ছানুযায়ী করের হার ও করযোগ্য বস্তু সামগ্রীর পরিবর্তন হয়ে থাকে। সুতরাং, যাকাতকে প্রচলিত অর্থে সাধারণ কর হিসেবে যেমন কোক্রমেই গণ্য করা যায় না। তেমনি তার সঙ্গে তুলনীয়ও হতে পারে না।

যাকাত ইসলামী অর্থনীতির কত বড় গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ তা বুঝতে হলে ইসলামের প্রথম খলীফা হযরত আবু বকরের (রা) সময়ের ঘটনা জানতে হবে। তিনি খলিফা হওয়ার পর পরই কিছু ভণ্ড নবীর প্ররোচনায় কয়েকটি গোত্র যাকাত দিতে অস্বীকার করে। খলীফার নিকট তারা যাকাত প্রদান হতে অব্যাহতি চাইল। হযরত আবু বকর (রা) তাদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেণ- “যদি কারো কাছে ‍উট বাধার রশি পরিমানও যাকাত প্রাপ্য হয় আর সে তা দিতে অস্বীকার করে তবে তার বিরুদ্ধেই আমি জিহাদ ঘোষণা করব।” ইতিহাস সাক্ষী, তিনি তা করেছিলেনও। এরই ফলশ্রুতিতে খলীফা উমর ইবন আব্দুল আযীযের সময়ে জাযিরাতুল আরবে যাকাত গ্রহণের সন্ধান পাওয়া ছিল দুর্ভল। সেই যাকাত মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ দেশে আজ শুধু প্রথা হিসেবে চালু রয়েছে। সেজন্যেই মুসলিম বিশ্বের দুঃস্থ অভাবী ও নিঃস্ব লোকের সংখ্যা ক্রমশঃই বৃদ্ধি পাচ্ছে। যাকাতরে অর্থ ব্যয়ের বিদ্যমান প্রথায না সমাজের প্রকৃত কল্যাণ হচ্ছে, না অভাবী ও দরিদ্র জনগণের সমস্যার স্থায়ী সুরাহা হচ্ছে।

. যাকাতের খাত হকদার

ইসলাম শরীয়হা অনুসারে যে সমস্ত সামগ্রীর যাকাত দিতে হবে সেগুলো হলো-

ক) সঞ্চিত বা জমাকৃত অর্থ,

খ) সোনা, রূপা সোনা-রূপা দ্বারা তৈরী অলংকার,

গ) ব্যবসায়ের পণ্য সামগ্রী,

ঘ) কৃষি উৎপন্ন,

ঙ) খনিজ উৎপাদন, এবং

চ) সব ধরনের গবাদি পশু

উপরোক্ত দ্রব্য সামগ্রীর একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ যখন কোন মুসলমান অর্জন করে তখন তাকে যাকাত দিতে হয়। এই পরিমাণকে ‘নিসাব’ বলে। নিসাবের সীমা বা পরিমাণ দ্রব্য হতে দ্রব্যের ভিন্নতর। একইভাবে যাকাতের হারও দ্রব্য হতে দ্রব্যে ভিন্নতর। যাকাতের সর্বনিম্ন হার শতকরা ২.৫% হতে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০.০%।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাকাত কাদের প্রাপ্য অর্থাৎ কাদের মধ্যে যাকাতের অর্থ বন্টন করে দিতে হবে সে সম্পর্কে আল-কুরআনে সুস্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

“দান খয়রাত তো পাওনা হলো দরিদ্র ও অভাবীগণের, যে সকল কর্মচারীর উপর আদায়ের ভার আছে তাদের, যাদের মন সত্যের প্রতি সম্প্রতি অনুরাগী হয়েছে, গোলামদের মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্যে, আল্লাতর পথে (মুজাহিদদের জন্যে) এবং মুসাফিরদের জন্যে। এটি আল্লাহর তরফ হতে ফরয এবং আল্লাহ সব জানেন ও সব বুঝেন।” (সূরা আত্‌-তাওবা: ৬০ আয়াত)

উপরের আয়াত হতে সুস্পষ্টভাবে আট শ্রেণীর লোকের জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যবহারের জন্যে নির্দেশ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে:

(ক) দরিদ্র জনসাধারণ (ফকীর),

(খ) অভাবী ব্যক্তি (মিসকীন),

(গ) যাকাত আদায়ে নিযুক্ত ব্যক্তি,

(ঘ) মন জয় করার জন্যে,

(ঙ) ক্রীতদাস বা গোলাম মুক্তি,

(চ) ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি,

(ছ) আল্লাহর পথে, এবং

(জ) মুসাফির।

এই আটটি খাতের মধ্যে ছয়টিই দারিদ্রের সংগে সম্পৃক্ত। অন্য দুটি খাতও (গ ও ছ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাকাত আদায় ও এর বিলিবন্টন এবং আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিদের এটাই সার্বক্ষণিক দায়িত্ব। সুতরাং, তাদের বেতনও এই উৎস হতেই দেওয়া বাঞ্ছনীয়।

প্রসঙ্গতঃ যাদেরকে যাকাতের অর্থ-সম্পদ দেওয়া যাবে না তাদের কথাও জেনে রাখা ভাল। এদের মধ্যে রয়েছে (১) নিসাবের অধিবারী ব্যক্তি, (২) স্বামী-স্ত্রী, (৩) পুত্র-কন্যা ও তাদের সন্তান-সন্ততি, (৪) মাতা-পিতা ও তাদের উর্দ্ধতন পুরুষ, (৫)বনি হাশেমের লোকজন, (৬) উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, (৭) যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব রয়েছে (৮) অমুসলিম।

. যাকাতের নিসাব

যাকাতের নিসাব সম্পর্কেও অনেকেরই সম্যক ধারণা নেই। সেজন্যে সংক্ষেপে যেসব পণ্য ও সম্পদের যাকাত আদায় করার শরয়ী হুকুম রয়েছে সেসব নিসাব যাকাতের হারসহ এখানে উল্লেখ করা হলো।

১. সাড়ে সাত ভরি পরিমাণ সোনা বা এর তৈরী অলংকার অথবা সাড়ে বায়ান্ন ভরি পরিমাণ রূপা. বা তার তৈরী অলংকার অথবা সোনা-রূপা উভয়ই থাকলে উভয়ের মোট মূল্য ৫২.৫ ভরি রূপার সমান হলে তার বাজার মূল্যের উপর ১/৪০ অংশ বা ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।

২. হাতে নগদ ও ব্যাংকে সঞ্চিত অর্থের পরিমান ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যেল সমান হলে তার উপর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে।

৩. ব্যবসায়ের মজুদ পণ্যের মূল্য ৫২.৫ ভরি রূপার মূল্যের বেশী হলে তার উপর ২.৫% হারে যাকাত প্রদেয়।

৪. গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে প্রথম ৩০টির জন্যে ১ বছর বয়সী ১টা বাছুর দিতে হবে এবং উর্দ্ধের হার ভিন্ন।

৫. ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে প্রথম ৪০টির জন্যে ১টা এবং পরবর্তী ১২০টির জন্যে ২টা ছাগল/ভেড়ার যাকাত দিতে হবে। [দ্রষ্টব্য: বুখারী শরীফ, যাকাত অধ্যায়]

যাকাত প্রদানের জন্যে ফল-ফসলাদি, খনিজ সম্পদ, গুপ্তধন, মধু এবং বাণিজ্যিক খামারের মাছের ক্ষেত্রে বছর পূর্ণ হওয়ার শর্ত প্রযোজ্য নয়। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য উট ও ঘোড়া পালন করলে তার যাকাত আদায় করতে হবে। খনিজ সম্পদেরও যাকাত প্রদেয। তবে বর্তমান সকল দেশেই খনিজ সম্পদ রাষ্ট্রীয় মালিকানায় থাকার কারণে তার বিধান উল্লেখ নিষ্প্রয়োজন।

যেসব সামগ্রী বা সম্পদের যাকাত দিতে হবে না সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। এসবের মধ্যে রয়েছে: (১) নিসাব অপেক্ষা কম পরিমণ অর্থ-সম্পদ, (২) নিসাব বছরের মধ্যেই অর্জিত ও ব্যয়িত সম্পদ (৩) ঘর-বাড়ী, দালান-কোঠা যা বসবাস, দোকান-পাট ও কল-কারখানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, (৪) ব্যবহার্য সামগ্রী (কাপড়-চোপড়, আসবাপত্র, গৃহস্থালীর তৈজসপত্র, বই-পত্র, (৫) যন্ত্রপাতি ও সাজ-সরঞ্জাম, (৬) শিক্ষার সমুদয় উপকরণ, (৭) ব্যবহার্য যানবাহন (৮) পোষা পাখী ও হাঁস-মুরগী, (৯) ব্যবহারের পশু (ঘোড়া, গাধা, খচ্চর, উট) ও যানবাহন এবং (১০) ওয়াক্‌ফকৃত সম্পত্তি।

. উশরের বিধান

ধনসম্পদ গবাদিপশু, স্বর্ণ ও রৌপ্যের অলংকার, ব্যবসায়িক পণ্য ও খনিজ সামগ্রীর উপর যেমন যাকাত আদায় ফরয তেমনি ফসলের উপর উশর আদায়ও ফরয। আল্‌-কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-

“তোমরা এগুলোর ফল ও ফসল খাও যখন ফল ধরে এবং আল্লাহর হক আদায় করো ফসল কাটার (বা আহরণ) করার দিন।” (সূরা আল-আনআম: ১৪১ আয়াত)

“তোমাদের জন্যে জমি থেকে যা কিভু বের করেছি তা থেকে খরচ করো (আল্লাহর পথে)”। (সূরা আল-বাকারাহ: ১৬৭ আয়াত)

তাফ্‌সীরকারীদের মতে আল্লাহর এই নির্দেশ অলংঘনীয়। তাফসীরে তাবারী অনুযায়ী এটা আল্লাহর নির্দেশ… ফল বা শস্রের ফরয যাকাত আদায় কতেই হবে। তাফসীরে কাশশাফ অনুসারে এই আয়াতে উল্লেখিত ‘হক’ শব্দ দ্বারা কৃষিজাত ফসলের উপর ফরয যাকাতকেই বোঝানো হয়েছে।

উশরের বিধান সম্পর্কে রাসূলে করীম (স) বলেন-

“যে সব জমি বৃষ্টির পানিতে সিক্ত হয় তাতে উশর (বা দশ ভাগের একভাগ) আর যেসব জমি সেচের সাহায্যে সিক্ত হয় তাতে নিসফ উশর (বা বিশ ভাগের একভাগ) আদায় করতে হবে।” (বুখারী, আবু দাউদ)।

সুতরাং, জমিতে ফল-ফসল উৎপন্ন হলে সেচ বা অসেচ জমিভিত্তিতে উৎপন্ন ফসলের ১০% বা ৫% যাকাত আদায় করা মুমিন মুসলমান নর-নারীর শরয়ী দায়িত্ব। যাকাতের অর্থ সম্পদ ব্যয়ের জন্যে যে আটটি খাত নির্ধারিত, উশরের ক্ষেত্রেও সেই খাতগুরো নির্ধারিত। অবশ্য যাকাতের সঙ্গে উশরের বেশ কিছু পার্থক্য বা বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে। িএসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে:

১. উশর আদায়ের জন্যে ফসলের িএক বছর অতিক্রান্ত হওয়া শর্ত নয়। বরং প্রতি বছর প্রতিবার উৎপন্ন ফসলেরই উশর আদায় করতে হবে।

২. উশর আদায়ের জন্যে ঋণমুক্ত হওয়া শর্ত নয়।

৩. নাবালক ও পাগলের জমির ফসলেও উশর আদায় করতে হবে।

৪. উশর আদায়ের জন্যে জমির মালিক হওয়াও শর্ত নয়।

ফল ও ফসলের ক্ষেত্রে নিসাবের পরিমাণ হলো পাঁচ ওয়াসাক। অর্থাৎ, পাঁচ ওয়াসাক পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হলে উশর (বা উশরের অর্ধেক) আদায় করতে হবে। ওয়াসাকের দুটি মাপ রয়েছে- একটি ইরাকী, অপরটি হিজাযী। ইরাকী মাপ অনুসারে পাঁও ওয়াসাকের পরিমাণ ৯৮৮.৮ কেজি এবং হিজাযী মাপ অনুসারে পরিমাণ ৬৫৩.০ কেজি। এই উপমহাদেশের ওলামা-মাশায়েখগণ ইরাকী মাপটি গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ এই পরিমাণ ফসল উৎপন্ন হলেই উশর দিতে হবে। তবে ইমাম আবু হানিফার মতে কৃষি ফসল ও ফলে কোন নিসাব নেই। যা উৎপন্ন হবে তার উপরই উশর বা অর্ধেক উশর ধার্য হবে। (মুহাম্মাদ রুহুল আমীন-ইসলামের দৃষ্টিতে উশর: বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে: ১৯৯৯, পৃ:৩৩)

. যাকাত উসুল রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব

যাকাত উসুল ও তার বিলি-বন্টন ব্যক্তির খেয়াল খুশীর উপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে এর আদায় ও বন্টনের হুকুম দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর রাসূলকে (স) নির্দেশ দিচ্ছেন-

“তাদের অর্থ-সম্পদ থেকে যাকাত উসুল করো যা তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে।” (সূরা আত্‌-তাওবা: ১০৩)

আল-কুরআনে আল্লাহ আরও বলেছেন-

“আমরা তাদেরকে মানুষের নেতা বানিয়েছি, তারা আমাদের বিধান অনুযায়ী পরিচালিত করে।… আমরা ওহীর সাহায্যে তাদেরকে ভাল কাজ করার, নামাজ কায়েম করার ও যাকাত আদায় করার আদেশ দিয়েছি।” (সূরা আল-আম্বিয়া: ৭৩)

“তারা এমন লোক যদি তাদেরকে আমি পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করি তাহলে তারা নামায কায়েম করে ও যাকাত আদায় করে এবং সৎ কাজে আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করে।” (সূরা হজ্ব: ৪১)

উপরের আয়াতগুলো হতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় যে আল্লাহর অভিপ্রায়ই হলো রাষ্ট্রই যাকাত আদায় করবে এবং তা যাকাতের হকদারদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছেও দেবে। আল্লাহ যাদেরকে রাষ্ট্রক্ষমতা প্রদান করেছেন, মানুষের নেতা বানিয়েছেন অন্যান্য কাজের মধ্যে তাদের অন্যতম অপরিহার্য দায়িত্ব হলো যাকাত আদায় করা ও আদায়কৃত যাকাত তার হকদারদের মধ্যে পৌঁছে দেওয়া। এজন্যেই রাসূলে করীম (স) ও খুলাফায়ে রাশিদূনের (রা) সময়ে যাকাতের অর্থ, সামগ্রী ও গবাদি পশু সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্যে আট শ্রেণীর লোক নিযুক্ত ছিল এরা হলো:

ক) সায়ী= গবাদি পশুর যাকাত সংগ্রাহক

খ) কাতিব= যাকাতের খাতাপত্র লেখার করণিক,

গ) ক্বাসাম- যাকাত বন্টনকারী,

ঘ) আশির- যাকাত প্রদানকারী ও যাকাত প্রাপকদের মধ্যে সম্বন্ধ স্থাপনকারী;

ঙ) আরিফ- যাকাত প্রাপকদের অনুসন্ধানকারী,

চ) হাসিব- যাকাতের হিসাব রক্ষক,

ছ) হাফিজ- যাকাতের অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী সংরক্ষক,

জ) ক্বায়াল- যাকাতের পরিমাণ নির্ণয়কারী ও ওজনকারী।

[দ্রষ্টব্যঃ এস. এ. সিদ্দকী (১৯৬২) পাবলিক ফিন্যান্স ইন ইসলাম, পৃ. ১৬০]

আমাদের বিস্ময়ে হতবাক হতে হয় যে আজকের যুগেও কর আদায়ের জন্যে এত বিভিন্ন পদের লোক নিযুক্ত হয় না, অথচ প্রায় চৌদ্দশত বছর পূর্বে যাকাত আদায় ও তার বিলি-বন্টনের জন্যে কত নিখুঁত ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়েছিল।

এভাবেই তখন ধনীদের সম্পদের একাংশ গরীব ও অভাবীদের হাতে পৌঁছতো, দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজে খরচ হতো, মুসাফিরে কষ্ট লাঘব হতো। উপরন্তু ব্যক্তির খেয়াল খুশীর উপর উসুল নির্ভরশীল না থাকায় আদায়কৃত যাকাতরে পরিমাণ হবে যেমন বিপুল তেমনি তার দারদ্র্য বিমোচন ও মানব কল্যাণের ক্ষমতাও ছিল বিপুল। কিন্তু এই দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথ পালিত না হওয়ায় অধিকাংশ মুসলিম দেশের জনসাধারণ আজ দারিদ্র্যপীড়িত এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ভয়াবহ দুরবস্থার শিকার।

. সামাজিক কল্যাণে যাকাত উশর

যাকাতের নানাবিধ ইতিবাচক উদ্দেশ্য ও তাৎপর্য রয়েছে। সেসবের মধ্যে ধর্মীয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ থাকলেও যাকাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্য বিশেষ গুরুত্ববহ। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রধান িএবং মুখ্য হচ্ছে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হতে না দেওয়া। ইসলাম সামাজিক শ্রেণী বৈষম্যকে শুধু অপছন্দই করে না, বরং তা দূরীভূত করার কথাও বলে। তাই একটি সুখী সুন্দর এবং উন্নত সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির জন্যে বিত্তশালী মুসলিমদের অবশ্যই তাদের সম্পদের একটা অংশ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্তদের দুর্দশা মোচনের জন্যে ব্যয় করতে হবে। এর ফলে যে শুধু অসহায় ও দুঃস্থ মানবতারই কল্যাণ হবে তাই নয়, সমাজে আয় বন্টনের ক্ষেত্রেও বৈষম্য অনেকখানি হ্রাস পাবে।

দ্বিতীযতঃ যাকাত মজুতদারী বন্ধ করারও এক বলিষ্ঠ উপায়। মজুতকৃত অর্থ-সম্পদের উপরেই যাকাত হিসাব করা হয়ে থাকে। অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ এবং মজুত সম্পদ যে কোন অর্থনৈতিক কার্যক্রম গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। এই ধরনের অর্থের জন্যেই সরকার ফটকাবাজারী বন্ধ, মূল্যবৃদ্ধি রোধ প্রভৃতি কার্যক্রম গ্রহণে ব্যর্থ হয়ে থাকেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সৃষ্ট নিদারুণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশৃংখলা তার প্রকৃষ্ট নজীর। মুষ্টিমেয় লোকের হাতে অবৈধ ও কালো টাকা জমছে প্রভুত পরিমাণে। উৎপাদনমুখী কোন কাজেই তা বিনিয়োগ হচ্ছে না। সরকারের নিকট এমন কোন কৌশল বা পদ্ধতি নেই যার দ্বারা এই অবৈধ অর্থের সঠিক পরিমাণ জানা সম্ভব। এ সবের উপর কোন প্রকার কর বসানো যাচ্ছে না। উৎপাদন ও কর্মসংস্থানমুখী উদ্যোগ গ্রহণেও তাদের প্ররোচিত বা বাধ্য করা সম্ভব হচ্ছে না। এজন্যে কোন কার্যকর আইনও নেই। পরিণামে নিরুপায় দর্শক হিসেবে সরকারকে ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি ও অর্থনৈতিক ধ্বস দেখতে হচ্ছে।

মানুষের মনগড়া কোন পদ্ধতিই সার্থকভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করতে সক্ষম নয়। একমাত্র ইসলামেই এর সমাধান রয়েছে। কারণ, বিত্তবানদের জন্যে তাদের মজুতকৃত অর্থ বা সম্পদের একটা অংশ নিছক বিলিয়ে দেবার মতো কোন পার্থিব কারণ নেই। কিন্তু ইসলামে একজন মুসলমানের আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় রয়েছে। ফলে বিত্তবানদের সামনে দুটি পথই খোলা রয়েছে- হয় মজুতদকৃত অর্থ শিল্প বা ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করা অথবা ইসরামী অনুশাসন অনুযায়ী তা ব্যয় করা। যার ফলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে, সমাজে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের বিস্তৃতি ঘটবে।

যাকাতের তৃতীয অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্দেশ্র হচ্ছে দারিদ্র বিমোচন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এতে শুধু সমাজই নয়, রাষ্ট্রও উপকৃত হয় সমানভাবে। দারিদ্র্য মানবতার পয়লা নম্বরের দুশমন। ক্ষেত্র বিশেষে তা কুফরী পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে। যেকোন সমাজ ও দেশের জন্যে এটা সবচেয়ে জটিল ও তীব্র সমস্যা। সমাজে হতাশা ও বঞ্চনার অনুভূতির সৃষ্টি হয় দারিদ্রের ফলে। পরিণঅমে দেখা দেয় মারাত্মক সামাজিক সংঘাত। অধিকাংশ সামাজিক অপরাধও ঘটে দারিদ্রের জন্য। এর প্রতিবিধানের জন্যে যাকাত ইসলামের অন্যতম মুখ্য হাতিয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে ইসলামের সেই সোনালী যুগ হতেই। যাকাতের অর্থ-সম্পদ প্রাপ্তির ফলে দরিদ্রদের জবিন যেমন আনন্দ ও নিরাপত্তা হয় তেমনি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়।

যাকাতের অর্থ-সামগ্রী যখন সমাজের দরিদ্র ও অভাবী শ্রেণীর লোকদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হয় তখন শুধু যে অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয় তা নয়, বরং অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও গতিবেগ সঞ্চারিত হয়। দরিদ্র ও দুর্গত লোকদের ক্রয় ক্ষমতা থাকে না। বেকারত্ব তাদের নিত্য সঙ্গী। যাকাতের অর্থ প্রাপ্তির ফলে তাদের হাতে অর্থাগম হয়। ফলশ্রুতিতে বাজারে কার্যকর চাহিদার পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। দরিদ্র জনসাধারণের প্রান্তিক ভোগ প্রবণতা (Marginal Propensity to Consume) সচারচর একের অধিক। অধিকাংশ মুসলিম দেশে এরাই জনসংখ্যার বৃহত্তম অংশ। তাদের হাতে যা আসে তার সবটুকুই খরচ করে ফেলে ভোগ্যপণ্য ক্রয়ের জন্যে। এর ফলে দীর্ঘ মেয়াদী সময়ে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রকৃতপক্ষে সমাজের বিপুল সংখ্যক লোকের যদি ক্রয় ক্ষমতা ঠিক মতো চালু থাকে তাহলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন প্রেরণার সৃষ্টি হয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ ও সেবার ক্ষেত্রেও সৃষ্টি হয় অনুকূল পরিবেশের। পরিণামে সামাজিক শ্রেণীসমূহের মধ্যেই আয় বা ধনবন্টনগত পার্থক্য হ্রাস পেতে থাকে। তাই যাকাত শুধু অর্থনৈতিক সুবিচারই প্রতিষ্ঠা করে না, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতিশীলতাও এনে দেয়। এটি যাকাতের চতুর্থ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য।

যাকাতের অপর হিতকর ও কল্যাণধর্মী দিক হলো ঋণগ্রস্তদের ঋণমুক্তি ও প্রবাবে বিপদকালে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা লাভ। প্রাকৃতিক দুর্বিপাক, দুর্ঘটনা বা অন্য কোন প্রয়োজন মুকাবিলার কারণে যদি কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং সেই ঋন পরিশোধের সামর্থ হারিয়ে ফেলে তাহলে যাকাতের অর্থ দিয়েই সংকট মোচন করা যায়। দেউলিয়া হয়ে সমাজে অসম্মানিত জীবন যাপনের গ্লানি মোচনে যাকাত এক মোক্ষম হাতিয়ার।

উপরন্তু যারা দিবেশ-বিভুঁইয়ে সহায়-সম্বল হারিয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে তারা যাকাতের অর্থ হতেই সেই সংকট হতে পরিত্রাণ লাভ করতে পারে। শরীয়াহর বিধান অনুসারেই তারা সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার হকদার। স্বদেশে বিত্তশালী হ লেও নিঃস্ব মুসাফির বিদেশে যাকাতের দাবীদার আল-কুরআনের বিধান অনুসারেই। মুসলমাননা যে দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে এক উম্মাহরই অংশ এই ঐশী নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা তারই বাস্তব প্রতিফলন।

. মুসলিম দেশসমূহের অভিজ্ঞতা

প্রসঙ্গতঃ মুসলিম দেশসমূহে বিরাজমান অবস্থার একটা চিত্র তুলে ধরা যেতে পারে। বর্তমানে মাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকটি দেশে সরকারী আেইন বা নির্দেশে ও প্রশাসনিকভাবে যাকাত আদায় হয়। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে সউদী আরব, পাকিস্তান, ইরান, মালয়েশিয়া, লিবিয়া, জর্দান, বাহরাইন, সুদান ও কুয়েত ও ইয়েমেন। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই বাধ্যতামূরকভাবে যাকাত আদায়ের জন্যে সৌদী আরবে ১৯৫১ সালে, লিবিয়ায় ১৯৭১ সালে, জর্দান ১৯৭৮ সালে, বাহরাইনে ১৯৭৯ সালে, কুয়েতে ১৯৮২ সালে এবং লেবাননে ১৯৮৪ সালেই যাকাত আইন প্রণীত হয়। গবেষকদের মতে রাসূলে করীম (স) কর্তৃক রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় শুরু হওয়ার পর থেকে আজও ইয়েমেনে সেই বিধানই চালু রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামী অর্থনীতির রূপরখা

ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, বাংলাদেশ, ওমান, কাতার প্রভৃতি দেশে যাকাত সংগ্রহের জন্যে সরকারের কিছু উদ্যোগ পরিলক্ষিত হলেও এসব দেশে এজন্যে বাধ্যতামূলকভাবে পালনীয় কোন আইন আজ অবধি প্রণীত হয়নি। সরকারী উদ্যোগে গঠিত যাকাত বোর্ডের তহবিলে লোকেরা স্বেচ্ছাধীনভখাবে তাদের যাকাতের অর্থ জমা দিতে পারে। এই অর্থ ব্যবহারের জন্যে একটা উপদেষ্টা কমিটি রয়েছে। বাংলাদেশে যাকাত বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮২ সালে। এই বোর্ডের তহবিলে যাকাতের অর্থ জমা দেওয়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাধীন। তাই এ পর্যন্ত এর গড় বার্ষিক আদায় কুড়ি লক্ষ টাকার বেশী নয়। সেই তুলনায় চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ কমপ্রেক্সের গড় বার্ষিক যাকাত সংগ্রহের পরিমাণ ছয় লক্ষ টাকার উপর এবং হাটহাজারী মুইনুল ইসলাম মাদরাসার বার্ষিক যাকাত প্রাপ্তির পরিমাণ পঞ্চাশ লক্ষ টাকার বেশী।

প্রতিবেশী দেশ ভারতে মুসলিমপ্রধান বহু এলাকায় রাজনৈতিক দল ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসমূহ পরিকল্পিতভাবে যাকাত আদায ও বন্টন করে থাকে। দাঙ্গা উপদ্রুত এলাকার মুসলমানদের জন্যে এই অর্থের সিংহভাগ ব্যয় হয়। সউদী আরবে যাকাত প্রদানে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নির্বিশেষে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও অন্যান্য নিবর্তনমুরক পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে। সউদী আরব ও কুয়েতে যাকাত আদায়ের রশিদ গেঁথে না দিলে কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স মঞ্জুর করা বা নবায়নের আবেদন গৃহীত হয় না।

মালয়েশিয়াতে রাজ্যসমূহে State Council of Releigion-এর নির্দেশে প্রশাসনিকভাবে যাকাত আদায়ের বিধি রয়েছে। এটি চালু হয় ১৯৮০ হতে। তবে এ ব্যাপারে ফেডারেল সরকারের কোন আইন নেই। বিধি অনুসারে ব্যক্তির মোট যাকাতরে দুই-তৃতীয়াংশ নিজ ইচ্ছা অনুসারে দান করা হয়। সরকারী হিসাব অনুসারে মালয়েশিয়ার ১৯৮৮ সালে যাকাতের প্রাক্কলিত পরিমাণ ছিল ৪৭৫.১৫ কোটি টাকা। পক্ষান্তরে রাজ্যসমূহের তহবিল এ বাবদে মোট জমা দেওয়া অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৯.৩০ কোটি টাকা। তাই সম্প্রতি সেদেশে যাকাতবিধি লংঘনকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।

সুদানে যাকাত তহবিলের আইন পাশ হয় আগস্ট, ১৯৮০তে। তখন যাকাত প্রদান বাধ্যতামুলক করা হয়নি। পরবর্তীকালে সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪ সালে প্রণীত আইনে সাহেবে নিসাব সকল মুসলমানের জন্যে যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়। ইরানে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনীর সফল ইসলামী বিপ্লবের (১৯৭৯) অব্যবহিত পরে যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং এর বন্টন ও ব্যবহারের জন্যে সরকারী দপ্তরের সৃষ্টি হয়েছে।

পাকিস্তানে সার্বক যাকাত আদায়ের অধ্যাদেশ কার্যকর হয় ২০জুন, ১৯৮০ হতে। উল্লেখ্য, ইরান ও পাকিস্তানে ব্যাংকসমূহ হতে উৎসমূলেই যাকাত আদায় করে নেওয়া হচ্ছে। হিজরী ১৪০৯-১০ সালে যাকাত তহবিলে পাকিস্তান সরকারের আয় ছিল ২৬৮.৬০ কোটি টাকা। এই আইনের বিধানে স্থানীয় যাকাত কমিটি প্রশাসনিক কাজে মোট আদায়কৃত অর্থের ১০%-এর বেশী ব্যয় করতে পারবে না। পক্ষান্তরে পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচীর জন্যে কমপক্ষে ৪৫% ব্যয় করার ও জীবন ধারণের প্রয়োজন পূরণের জন্যে ৪৫%-এর বেশী ব্যয় না করার বিধি রয়েছে। পাকিস্তানে উশর আদায়ের অধ্যাদেশ কার্যকর হয় ১৫ মার্চ, ১৯৮৩ হতে।

এসব তথ্য হতে কয়েকটি বিষয় সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যাবে:

১. বাংলাদেশসহ সকল মুসলিম দেশে সরকারীভাবে যাকাত আদায়ের আইন থাকলে এবং তা যথাযথ প্রতিপালিত হলে দেশীয় উৎস হতেই বিপুল পরিমাণ অর্থ আদায় হতে পারে এবং দারিদ্র্য বিমোচনসহ দুঃস্থ জনগণের ন্যূনতম মৌলিক মানবিক প্রয়োজন পূরণের জন্যেই তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। ফলে বিদেশী এনজিও নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে।

২. বিশ্বব্যাপী ইসলামী পুনর্জাগরণের প্রেক্ষিতেই কয়েকটি মুসলিম দেশে যাকাতের আইন গৃহীত হয়েছে। প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব লাভ করেছে ১৯৮০ এর দশক হতে। তা সত্ত্বেও মাত্র পাঁচ-ছয়টি দেশ ছাড়া অন্য কোথাও যাকাত আদায় বাধ্যতামূলক নয়।

৩. প্রাক্কলিত ও প্রকৃত আদায়কৃত যাকাতরে মধ্রে রয়েছে দুস্তর ব্যবধান। যাকাত আদায়ে ফঅঁকি দেওয়াই এর প্রধান কারণ। এর প্রতিবিধানের জন্যে সরকারের পূর্ণ হস্তক্ষেপ ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।

এজন্যেই খুলাফায়ে রাশিদূন (রা) এ ব্যাপারে এত সতর্ক ও কঠোর ছিলেন। পরবর্তীকালেও ইবনে তাইমিয়া, ইবনে হাযম, আবু ইসহাক আল-শাতিবী, আল-গাজ্জালী প্রমুখ প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও চিন্তাবিদগণ এ প্রসঙ্গে সরকারের ভূমিকার উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছেন।

. বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচন

. বিদ্যমান অবস্থা

আমাদের দেশে প্রবাদ রয়েছে, অভাবে স্বভাব নষ্ট। তাই সমাজ থেকে দরিদ্র্য দূর করা জরুরী। কিন্তু এজন্যে যেসব বাধা প্রধান সেসবের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগের অভাব, প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব। এছাড়া রয়েছে প্রাকৃতিক দূর্বিপাকের ফলে ফসলহানি, বন্যা, অগ্নিকান্ড ও ভূমিকম্পে গৃহহানি, পরিবারর একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে গোটা পরিবারের ভিক্ষুক হওয়ার অবস্থা। রয়েছে রোগ-ব্যাধি। দুর্ঘটনায় বিকলাঙ্গ হওয়া বা অসুস্থতায় শারীরিকভাবে পঙ্গু ও অক্ষম হওয়া তো রয়েছেই। ফলে আমাদের বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের পরিমাণ দুটোই বিশ্বের শীর্ষস্থানীয়। অথচ বাংলাদেশের অবস্থা এমন হবার কথা নয়। এদেশের ৮৬৳ লোক মুসলমান। ব্যক্তি জীবনে নিষ্ঠাবান এবং খোদাভীরু মুসলমানদের উপর আল্লাহর তরফ হতেই কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্দিষ্ট রয়েছে যা যথারীতি অনুশীলন করলে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে দারিদ্র্য থাকার কথা নয়। ইসলামের সোনালী যুগে তা ছিলও না। বরং ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, জাযিরাতুল আরবে যাকাতের অর্থ নেবার লোক না থাকায় সেই অর্থ নতুন বিজিত দেশসমূহের জনগণের কল্যাণেই ব্যয় হতো।

অনেকেই মনে করেন দরিদ্র জনগণের অবস্থার পরিবর্তন করতে হলে চাই সরকারী সাহায্য নয়তো বিদেশী অনুদান। বস্তুতঃপক্ষে এদেশে এখন বহু এনজিও বিদেশী অনুদান নিয়েই দরিদ্র জনগণ, বিশেষতঃ গ্রামাঞ্চলের গরীব জনসাধারণের মধ্যে কাজ করে চলেছে। তারা প্রধানতঃ সুদের ভিত্তিতে অর্থ ঋণ দিয়ে কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচী গ্রহণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। বাস্তবে এরা দারিদ্র্য বিমোচনের নামে দারিদ্র্যের চাষ করছে। এদের সৃষ্ট গোলক ধাঁধাঁ হতে বেরিয়ে আসতে পারছে না ঋণ গ্রহীতারা। এ কাজে খৃষ্টান মিশনারী এনজিওগুলো কম তৎপর নয়। অনেক বুদ্ধিজীবী ও সমাজহিতৈষী ব্যক্তি হতাশা প্রকাশ করে থাকেন, তাদের হাতে নগদ অর্থ নেই বলেই দরিদ্র জনসাধারণের ভাগ্যের চাকা ঘোরানো যাচ্ছে না। একটু তলিয়ে বিচার করলে দেখা যেত এদেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ যাকাত হিসেবে বিতরণ করা হয় তার সুষ্ঠু, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবহার হলে এসব দরিদ্র লোকদের অবস্থা হয় তার সুষ্ঠু, সংগঠিত ও পরিকল্পিত ব্যবহার হলে এসব দরিদ্র লোকদের অবস্থার পরিবর্তন করা খুবই সম্ভব ছিল।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বহু ধনী ব্যক্তি লক্ষাধিক টাকার উপর যাকাত দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা সাধারণতঃ এই অর্থের বড় অংশ দশ-বিশ টাকার নোটে পবিত্র রমযান মাসের মেষ দশ দিনে বাড়ির গেটে উপস্থিত গরীব নারী-পুরুষের মধ্যে বিলিয়ে দেন অথবা শাড়ী-লুঙ্গি আকারে বিতরণ করে থাকেন। কখনও কখনও এরা এলাকার মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিং বা ইয়াতিমখানাতে এই অর্থের কিছুটা দান করে থাকেন। এরা মুসাফির ঋণগ্রস্ত অসুস্থ লোকদের কথা আদৌ বিবেচনায় আনেন না। বিবেচনায় আনেন না আল্লাহর পথের মুজাহিদদের কথা্ অথচ এরাই যদি পরিকল্পিতভাবে এলাকার দুঃস্থ, বিধবা, সহায়-সম্বলহীন পরিবারের মধ্যে থেকে বাছাই করে প্রতি বছর অন্তরঃ তিন-চারটি পরিবারকে নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্যে রিক্সা নৌকা সেলাই মেশিন অথবা কয়েকটা ছাগল কিনে দিতেন তাহলে দেখা যেত তার একার প্রচেষ্টাতেই পাঁচ বছরে অন্তত এলাকায় অন্ততঃ কুড়িটি পরিবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে। ভিক্ষুক ও অভাবী পরিবারের সংখ্যাও কমে আসছে।

সমাজে বিদ্যমান অসহনীয় দারিদ্র্য ও বেকরাত্ব নিসরনকল্পে বর্তমান সময়ে যাকাতের অর্থ দিয়ে একটি তহবিল গঠন এবং সেই তহবিল হতেই দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ইসলামী ব্রাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। ব্যাংকটি তার নিজস্ব তহবিলের যাকাত দিয়ে গড়ে তুলেছে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন। মূলতঃ তিনটি উদ্দেশ্রে এই তহবিলের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে: (ত) নগদ সাহায্য, (খ) শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এবং (গ) কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসন। অভাবী ও অসহায় লোকদের আশু প্রয়োজন পূরণের জন্যে (যেমন- বন্যা, খরা, জলোচ্ছাস, অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত) নগদ সাহায্য প্রদান ছাড়াও চিকিৎসা সুবিধা দরিদ্র ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান, কর্মসংস্থানের জন্যে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন পেশার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম (বিশেষতঃ মিশুক, সেলাই মেশিন, ওয়েল্ডিং সরঞ্জাম, রিক্সা ভ্যান, রিক্সা, হাঁস-মুরগী, নৌকা ইত্যাগি) সরবরাহ করাই এই কর্মসূচীর উদ্দেশ্য।

. বাংলাদেশের দারিদ্রে্যর চিত্র

বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫০% লোক দারিদ্র্য সীমার নীচে বাসকরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে যারা দৈনিক ১,৮০৫ কিলো ক্যালোরী বা তার কম গ্রহণ করতে বাধ্য হয় তারাই চরম দারিদ্র্য সীমায় রয়েছে। পক্ষান্তরে যারা দৈনিক ২,১১২ কিলো ক্যালোরী বা তার কম গ্রহণ করতে পারে তারা রয়েছে দারিদ্র্য সীমায়। ক্রয় ক্ষমতার অভাবই এর মূল কারণ। তাই হয় এদেরকে খাদ্য সাহায্য দিতে হবে অথবা ক্রয় ক্ষমতা বাড়াবার উপযুক্ত কৌশল উদ্ভাবন করতে হবে। নইলে এরা সম্পদের পরিবর্তে দেশের বোঝা বা দায় হয়ে রইবে। বাংলাদেশে দারিদ্র্যের পরিমাণ প্রকৃতপক্ষে কত? বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রথমবারের মতো ২০০ সালে মৌলিক চাহিদার ব্যয় পদ্ধতি [Cost of Basic Needs (CBN) Method] ব্যবহার করে Household Income and Expenditure Survey (HIES) পরিচালনা করে। এই পরিমাপ পদ্ধতিতে উচ্চ দারিদ্র্য রেখা ব্যবহার করে জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৯.৮ শতাংশ। শহর অঞ্চলে এর পরিমাণ ৩৬.৬ শতাংশ হলেও পল্লী এলাকায় এর পরিমাণ ৫৩.১ শতাংশ (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০০৪; পৃ. ১৫৬)।

এই ভয়াবহ দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যে সরকারের গৃহীত সাধারণ কর্মসূচী যেমন কোনক্রমেই স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না, তেমনি একাজ বিদেশী সাহায্যপুষ্ট এনজিওদের উপরও ফেলে রাখা যায় না। সমকালীন সুদী ব্যাংক ব্যবস্থা বেকার দুঃস্থ ও গরীব জনগণকে কর্মসংস্থানের জন্যে সত্যিকার কোন সাহায্য করতে অপারগ। কোলেট্যারোল বা জামানত ছাড়া তারা ঋণ দেয় না। যেসব বেকার যুবক, দুঃস্থ মহিলা, বিকলাঙ্গ মানুষ সমাজের জন্যে দায়, যারা নিজেদেরকে অন্যের গলগ্রহ মনে করে সদা সর্বদা মানসিকভাবে সংকুচিত থাকে তাদের অবস্থার উন্নতিকল্পে সুদী ব্যাংক ব্যবস্থার কোন অবদান নেই।

সমাজকে গভীরভাবে নিরীক্ষণ করলে দেখা যাবে যখনই ব্যক্তি নিজ উদ্যোগে কাজে নিয়োজিত হতে পেরেছে, নিজের চেষ্টায় রুটি-রুজীর ব্যবস্থা করতে পেরেছে তখন শুধু তারই পারিবারিক উন্নতি হয়নি, গোটা সমাজের চেহারাও বদলাতে শুরু করেছে। কিন্তু এদের সহায়তা করার জন্যে সুদী এনজিওর কোন উদ্যোগ নেওয়া সঙ্গত কারণেই সম্ভব নয়। উপরন্তু সুদের ভিত্তিতে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে যেসব এনজিও তারা এই দারিদ্র্য দূর করতে তো পারেই নি বরং এর পরিধি আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

মনে রাখা দরকার, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্যে প্রদত্ত মাইক্রো ফাইন্যান্স ও মাইক্রো ক্রেডিট সমার্থক নয়। ফাইন্যান্সের সাথে মুনাফার সম্ভাব্যতা যুক্ত থাকলে তা হয়ে দাঁড়ায় ইনভেষ্টমেন্ট বিনিয়োগ। পক্ষান্তরে ফাইন্যান্সের সাথে সুদ যুক্ত হলে তা ক্রেডিট বা ঋণের রূপ লাভ করে। এই ক্রেডিট বা ঋণ নিয়ে কোন বেকার নারী-পুরুষ কর্মসংস্থানের সুযোগ করে নিতে পারে ঠিকই কিন্তু তার আয়ের সিংহভাগই চলে যায় কিস্তিতে সুদসহ ঋণ শুধতে। পরিণঅমে স্বামলম্বী হতে পারা তার জন্যে দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। এজন্যেই বিশ্ব জুড়ে মাইক্রো ক্রেডিটের এত বন্দনা চললেও এর দ্বারা স্বাবলম্বী মানুষের সংখ্যা বাড়েনি, দারিদ্র্য দূর হয়নি। বরং অনেকেরই মতে এত দ্বারা প্রকৃতপক্ষে দারিদ্র্যকে জিইয়ে রাখা হচ্ছে। কারো কারো অভিমত মাইক্রো ক্রেডিটের মাধ্যমে এনজিওগুলো আসলে দারিদ্র্যেরই চাষ করছে।

সমাজের যে বিপুলসংখ্যক লোক কর্মজীবী হলে দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতিধারা সচল হয়, কীন্‌সের ভাষায় পূর্ণকর্মসংস্থানস মাত্রা অর্জিত হয়, সেই স্তরে পৌঁছুতে হলে দারকার একটা Big Push বা প্রবল ধাক্কা। সুদী এনজিওগুলো এই ধাক্কা দিতে কখনই সমর্থ নয়। বরং তারা যদি কখনও উদ্যোগ নেয়ও পরিণামে শুরু হয়ে যায় ব্যবসায় চক্র বা Buisiness cycle যা অর্থনীতির জন্যে খুবই অশুভ। তাই যদি বিনা সুদে বা কোনও রকম মুনাফার অংশ দাবী না করে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া যায়, কাজের বা উৎপাদনের উপকরণ সরবরাহ করাযায় তাহলে সমাযে যে ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হয় তার চেইন রিঅ্যাকশন চলে দীর্ঘদিন ধরে। এক্ষেত্রে লাভের গুড় পিঁপড়েয় খায় না বলে উদ্যোক্তারা প্রকৃত অর্থেই স্বাবলম্বী হতে পারে।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, উদ্যোক্তা উন্নয়ন তথা ভিখারীর হাতকে কর্মীর হাতিয়ারে রূপান্তরের মধ্যে দিয়েই দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচী তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পেওঁছাতে সক্ষম। এজন্যেই ভিখারী তথা অভাবগ্রস্তকে কর্মীতে রূপান্তরের যথাযথ কৌশল উদ্ভাবন ও ত ার ব্যবহারই হবে যথোচিত পদক্ষেপ। এই কর্ম কৌশলই হলো মানব সম্পদ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড। দারিদ্র্য বিমোচনের পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়নমূলক দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী গৃহীত না হলে সমাজে স্থায়ী কল্যাণ ও মঙ্গল সাধন অসম্ভব। জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর তথা মানব সম্পদে উন্নীত করার জন্যে যেসব মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করতে হবে সেসবের মধ্যে রয়েছে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যরক্ষা ও চিকিৎসা এবং গৃহায়ন। অন্নবস্ত্রের প্রয়োজন পূরণের পাশাপাশি এগুলো পূরণ না হলে জাতি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে যাবে। এজন্যে উপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে ভবিষ্যতের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা, যুবক-যুবতীদের স্বউদ্যোগে কর্মসংস্থানের জন্যে প্রয়োজনীয় পুঁজি সরবরাহ এবং একটি সুস্থ, সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনের জন্যে যে মননশীলতার প্রযোজন তার উপযুক্ত পরিচর্যাই হলো মানব সম্পদ উন্নয়ন কৌশল।

. বাংলাদেশে আদায়যোগ্য যাকাতের পরিমাণ

প্রশ্ন উঠতে পারে, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে যাকাত ও উশরের মাধ্যমে কত টাকাই বা আদায় হতে পারে? এ প্রসঙ্গে সঠিকধারণার জন্যে নিচে উল্লেখিত বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়।

(ক) বেসরকারী এক হিসাব মতে এদেশে এখন রাজধানী শহর হতে ‍শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ গঞ্জ/বাণিজ্যিক এলাকাতে যেসব কোটিপতি বাস করে তাদের সংখ্যা ১০,০০০ ছড়িয়ে যাবে। এদের মধ্যে অন্ততঃ ১০০ জন ১০০ কোটি টাকা বা তারও বেশী অর্থের মালিক। এরা সকলেই তাদের সঞ্চিত সম্পদ, মজুত অর্থ ও বিভিন্ন ধরনের কারবারের সঠিকভঅবে যাকাত হিসেব করলে এবং প্রতিজন গড়ে ন্যূনতম টাকা ২.৫০ লক্ষ হিসেবে যাকাত আদায় করলে বার্ষিক ২৫০ কোটি টাকা যাকাত আদায় হতে পারে।

(খ) এদেশের ব্যাংকিং সেক্টর হতে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ যাকাত হিসেবে আদায় হতে পারে তা কখনও খতিয়ে দেখা হয়নি। উদাহরণতঃ ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড ২০০৩ সালে যাকাত আদায় করেছে টা. ৪.৯৬ কোটিরও বেশী। দেশে চালু অর্থ হতে সমগ্র ব্যাংক ব্যবস্থায় যে নগদ টাকা জমা হয় এবং ব্যাংকগুলো তা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে ব্যবহার করে তার মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ –এর অংশ মাত্র ০.৪% (অর্থাৎ প্রতি টাঃ ১,০০০-তে টাঃ ৪/- মাত্র)। এই ০.৪% অর্থ কাজে লাগিয়েই যদি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিঃ টাঃ ৪.৯৬ কোটি টাকা যাকাত দিতে পারে তাহলে সমগ্র ব্যাংকিং সেক্টটর হতে হিসেব মতো ১,২৪০ কোটি টাকা যাকাত আদায় হওয়ার কথা। উল্লেখ্য, বীমা কোম্পানীগুলোকে এই হিসেবের আওতায় ধরা হয়নি।

(গ) যেসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা সরকারকে আয়কর দিয়ে থাকে শরীয়াহ মুতাবিক তাদের সকলেরও যাকাত আদায় করা প্রয়োজন। এরা সঠিকভাবে যাকাত আদায় করলে এর পরিমাণ ১,০০০ কোটি টাকা ছড়িয়ে যাবে।

(ঘ) যারা আয়কর দিয়ে থাকে তারা সকলেই সাহেবে নিসাব। এদের একটা অংশ ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করে থাকে। কিন্তু সকলেই সঠিক হিসাব মুতাবিক যাকাত আদায় করলে তার পরিমাণও শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

(ঙ) যেসব কোম্পানী (ঔষধ রসায়ন জ্বালানি প্রকৌশল খাদ্য বস্ত্র গার্মেন্টস সিরামিক সিমেন্ট নির্মাণ ইত্যাদি) সরকারকে আয়করদেয় তাদেরও যাকাত দেওয়া উচিত। দেশের বিদ্যমান আইনে এই বাধ্যবাধকতা নেই। এরা যাকাত আদায় করলে তার পরিমাণ ১০০ কোটি টাকা ছড়িয়ে যাবে বলে অভিজ্ঞ মহলের হিসাব।

(চ) যেসব মহিলা ব্যাংকের লকারে স্বর্ণ অলংকার রাখেন তারাও শরীয়াহ অণুসারে যাকাত আদায়ে বাধ্য। কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া এদের অধিকাংশই যাকাত আদায় করেন না।

(ছ) শহরতলী ও মফঃস্বল এলাকার ছোট ব্যবসায়ী আড়ৎদার হোটেল মালিক ঠিকাদারদের অনেকর মধ্যে যাকাত দেবার কোন উদ্যোগ দেখা যায় না। অথচ এসব ব্যক্তির অধিকাংশই সাহেবে নিসাব। এছাড়া পরিবহন ব্যবসা িইটের ভাটা হিমাগার কনসালটিং ফার্ম ক্লিনিক বিভিন্ন সেবাধর্মী প্রতিষ্ঠানও যাকাতের আওতাভুক্ত। এদের যাকাতের পরিমাণ বার্ষিক শত কোটি টাকা হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।

(জ) যারা সরকারের বিভিন্ন ধরনের মেয়াদী সঞ্চয়পত্র কিনে রেখেছেন, যারা ব্যাংকে ফিক্সড ডিপোজিট টাকা জমা রেখেছেন ও বিভিন্ন কোম্পানীর শেয়ার কিনেছেন, যারা পোস্টাল সেভিংস িএকাউন্টে মেয়াদী আমানত রেখেছেন অথবা যারা আইসিবির ইউনিট ফান্ড ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের সার্টিফিকেট কিনেছেন তারাও শরীয়াহ অনুসারে যাকাত আদায়ে বাধ্য। এ খাত হতে বছরে ৩,০০০ কোটি টাকা যাকাত আদায় হতে পারে।

এক্ষেত্রে একটি তথ্য বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী দেশের ব্যাংকসমূহে ২০০২-২০০৩ সালে মেয়াদী আমানতের পরিমাণ ছিল ৮৭,২৫১ কোটি টাকা (বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা, ২০০৪; পৃ. ২১৯)। মেয়াদী আমানত যেহেতু এক বছরের বেশী সময়ের জন্যে হয়ে থাকে এবং আমানতকারী স্বেচ্ছায় সঞ্চয়ির উদ্দেশ্যেই জমা রাখে সেহেতু এর যাকাত উসুল করা ফরয। এই অর্থের ২.৫% হারে যাকাতের পরিমাণ দাঁড়াবে ২,১৮১ কোটি টাকার বেশী।

. বাংলাদেশে প্রাপ্ত উশরের পরিমাণ

যেসব কৃষি জমির মালিকের নিসাব পরিমাণ ফসল হয় তাদের মধ্যে কতিপয় উজ্জ্বল ব্যতিক্রম ছাড়া অন্যান্যরা ফসলের উশর আদায় করে না। বাংলাদেশের ভূমি মালিকানার দিকে তাকালে দেখা যাবে সমগ্র উত্তর অঞ্চল তো বটেই, দক্ষিণ ও পূর্ব অঞ্চলেও চাষাধীন জমির বৃহৎ অংশের মালিক মোট কৃষকের ১৭%-২০%। অথব এরা ফসলের উশর আদায় করে না। এদেশের সাহেবে নিসাব পরিমাণ ফসলের অধিকারী জমির মারিক নিজ উদ্যোগেই যদি উশর আদায় করতো তাহলে এর পরিমাণ কম করে হলেও ১,০০০ কোটি টাকার বেশী হতো।

উদাহরণের সহায্যে বিষয়টা স্পষ্ট করা যায়। বাংলাদেশের গত ২০০০-২০০৩ বছরে গড়ে ২ কোটি ৬৬ লক্ষ একর জমিতে যা চাষকৃত জমির ৩৫.৩০%। বিগত ২০০০-২০০৩ সালে এদেশে ধান উৎপাদনের গড় পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৪৯ লক্ষ মেট্রিক টন। এ থেকে সেচকৃত জমির অংশ বাদ দিলে উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ কোটি ২৯ লক্ষ মেট্রিক টন। এর মধ্যে থেকে ক্ষুদে ও প্রান্তিক মালিক চাষী (৪০%) এবং মাঝারী চাষীদের অর্ধেককেও (২০%) যদি বা দেওয়া যায় তাহলে বাকীদের (৪০%) কাছ থেকে উশর আদায়যোগ্য ফসলের পরিমাণ দাঁড়াবে ৫১ লক্ষ ৫৫ হাজার মেট্রিক টন।

প্রতি মেট্রিক টন চাউলের গড় দাম টাঃ ১৫,০০০/- ধরলে এ থেকে উশর আদায় হবে ৭৭২ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা (মূল্যের ১০% হারে)। একইভাবে সেচকৃত জমির উৎপাদন হতে পূর্বে উল্লেখিত শ্রেণরি কৃষকদের অংশ বাদ দেওয়া হলে উশর আদায়যোগ্য ফসলের পমিরণ দাঁড়াবে ৪৭ লক্ষ ৮৮হাজার মেট্রিক টন। পূর্বে উল্লেখিত মূল্যে এক্ষেত্রে উশরের পরিমাণ (মূল্যের ৫% বা নিষপে উশর হারে) দাঁড়াবে ৩৫৮ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। ফলে সেচবিহীন ও সেচকৃত জমির ধানের আদায়যোগ্য উশরের পরিমাণ দাঁড়াবে সর্বমোট ১,১৩১ কোটি টাকা। এছাড়া গম, আলু আখ প্রভৃতি ফসলের উশর আদায় করলে এই পরিমাণ যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে তা বলাই বাহুল্য।

উপরে উপস্থাপিত তথ্য হতে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশ সব ধরনের উৎস মিলিয়ে প্রতি বছর চার হাজার কোটি টাকার মতো যাকাত আদায় হওয়া খুবই সম্ভব। তবে অবশ্য পালনীয় শর্ত হলো রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তা আদায়ের যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্যে শরীয়াহর বিধানসমূহ জনসাধারণকে অবহিত করতে হবে। সেই সঙ্গে অন্যান্য কর আদায়ে সরকার যেমন কঠোর ও আইননানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে এক্ষেত্রেও তা হুবহু অনুসরণ করতে হবে।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য, যাকাত আদায় তা বন্টনের শরীয় হুকুম সম্পর্কে এদেশের ইসলামপ্রিয় জনগণের মধ্যে কিছুটা হলৌ ধারণা রয়েছে। কিন্তু উশর সম্বন্ধে যে একেবারেই নেই তা বেশ জোর দিয়েই বলা যায়। অথচ যথাযথভাবে উশর ও অর্ধ-উশর আদায় ও তা হকদারদের মধ্যে সুচারুভাবে বন্টিত হলে গ্রামাঞ্চলে বিরাজমান নিদারুণ দারিদ্র্য ও চরম ধনবৈষম্য বিদ্যমান থাকার কথা নয়। এক্ষেত্রে নির্মম সত্য হলো এই যে উশর আদায়ের জন্যে উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা আসবে বিত্তশালী জোতদার ও গ্রামীন মহাজনদের কাছ থেকেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, উপমহাদেশের অন্যতম মুজাদ্দিদ ইসলামী আন্দোলনের সিপাহসালার শহীদ সৈয়দ আহমদ বেরেলভীর উদ্দেশ্যে তাঁর হন্তারকের নিষ্ঠুর মন্তব্য ছিল- “এখন তোমার উশর বুঝে পেয়েছো তো মৌলানা?” এথেকেই বোঝা যায় তাঁর উশর আদায়ের আন্দোলনকে সেকালের ধনী জমিদার ও জোতদার মুসলমানরা কিভাবে গ্রহণ করেছিল।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামী ভোক্তার স্বরূপ

বাংলাদেশে যাকাত খাত হতে প্রাপ্তব্য এই বিপুল অর্থ দিয়ে যেসব ত্রাণ ও পুনর্বাসনমূলক এবং প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানমূলক কর্মসূচী গ্রহণ করা সম্ভব সে বিষয়ে নীচে আলোকপাত করা গেল। অবশ্য এটা একেবারেই প্রাথমিক পর্যায়ে Action Plan। প্রয়োজনে এর পরিবর্তন হবে এবং আরও লাগসই ও যথাযথ কর্মসূচী উদ্ভাবিত হবে। ত্রাণ ও কল্যাণধর্মী পদক্ষেপ গ্রহণের মূল লক্ষ্যই হবে দারিদ্র্য বিমোচন বা দারিদ্র্য দূরীকরণ। আশা করা যায়, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করার ফলে আদামী দশ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ হতে দারিদ্র্য সত্যিকার অর্থেই বিদা নেবে।

প্রসঙ্গতঃ মনে রাখা দরকার বাংলাদেশের দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিৎ পল্লী। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কারণেই এটি অপরিহার্য। তাই প্রস্তাবিত কর্মসূচীগুলো অবশ্যই শহরের বস্তির পরিবর্তে পল্লীকেন্দ্রিক হবে েএবং এর উপর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপিত হতে হবে। যাকাতভিত্তিক কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্যই হবে মানব কল্যাণ ও মানব সম্পদ উন্নয়ন।

. বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা

ত্রাণ কল্যাণধর্মী কর্মসূচী:

বৃদ্ধদের জন্যে মাসোহারা: এদেশে সরকারী, আধা-সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হতে যারা অবসর নেয় শুধুমাত্র তারাই পেনশন পেয়ে থাকে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবির বার্ধক্যে কোন আর্থিক সংস্থান নেই। এদের জন্যে কিচু করা খুবই জরুরী। অনেক সময়ে নিজেদের পরিবারের কাছেও এরা গলগ্রহ। এদের এই অসহায় অবস্থা দূর করার জন্যে প্রাথমিকভাবে দেশের সকল ইউনিয়ন (৪,৪৫১) এবং পৌর কর্পোরেশনের অধীনস্থ ওয়ার্ডের (৫৮৪) প্রতিটি হতে প্রতি বছর যদি অন্ততঃ পঞ্চাশ জনকে মাসিক টাঃ ১,০০০/- হিসেবে আর্থিক সহায়তা দেওয়া যায় তাহলে ২,৮১,৭৫০ জন উপকৃত হবে। তাদের ন্যূনতম প্রয়োজনের খানিকটা পূরণ হবে। এজন্যে প্রয়োজন হবে বার্ষিক ৩০২ কোটি ১০ লক্ষ টাকা।

সম্প্রতি সকল ইউনিয়ন ও পৌরসভার ওয়ার্ডপিছু পাঁচ জন সহায়-সম্বলহীন বৃদ্ধ ও বিধবাদের টাঃ ২০০/- হারে সরকারীভাবে মাসোহারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ইতিমধ্যেই খবরের কাগজে প্রকাশিত রিপোর্ট হতে জানা যায় জনকল্যাণের চেয়ে পরিটিক্যাল স্টান্টবাজিই এর পেছন বেশী কাজ করছে। সাহায্যপ্রার্থীরা বিশেষ এক রাজনৈতিক দলের সমর্থখ কিনা তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে সেটাই প্রধান্য পাচ্ছে। যাকাতের অর্থ বন্টনের ক্ষেত্রে এধরনের উদ্দেশ্যে কোনক্রমেই কাঙ্খিত হবে না।

বিধবা/বিকলাঙ্গদের কল্যাণ: বাংলাদেশে বিধবা এবং নানাভাবে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া পরিবার প্রধানদরে পরিবারের দুর্দশার সীমা-পরিসীমা নেই। ভিক্ষুকের মতোই এদের জীবন যাপন অথবা ভিক্ষাবৃত্তিই এদের একমাত্র সম্বল। এদের এই অসহায় অবস্থা দূর করার জন্যে প্রাথমিকভাবে দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন এবং পৌরৈ কর্পোরেশনের অধীনস্থ ওয়ার্ডের প্রতিটি হতে কমপক্ষে কুড়ি জন করে বিধবা/বিকলাঙ্গ পরিবার বেছে নেওয়া হয় তাহলে মোট সর্বমোট ১,০০,৭০০টি পরিবারকে সহায়তা প্রদান করা যাবে। এদেরকে মাসিক ন্যূনতম টাঃ ১,০০০/- করে সাহায্য করলে বার্ষিক ১৭০ কোটি ৮৪ লক্ষ টাকার প্রয়োজন হবে।

মৌলিক পারিবারিক সাহায্য: এদেশের গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরতলীতেও বহু পরিবার মশার আক্রমণ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্যে যেমন মশারী নেই তেমনি শীতের প্রকোপ হতে বাঁচার জন্যে লেপ বা কম্পল নেই। শিশু ও বৃদ্ধদের কষ্ট শীতকালে অবর্ণনীয় হয়ে দাঁড়ায়। তীব্র শীতের কারণে প্রতি বছর বহু শিশু ও বৃদ্ধদের মৃত্যুবরণ করে। এ ছাড়া নানা অসুখের শিকার তো হয়ই। এর প্রতিবিধানের জন্যে যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড হতে প্রতি বছর কমপক্ষে পঞ্চাশটি পরিবারকে বেছে নিয়ে তাদের একটা করে বড় মশারী (৫×৭) ও একটা বড় লেপ (৬×৭.৫) কিনে দেওয়া যায় তাহলে তারা দীর্ঘদিনের জন্যে মশার আক্রমণ ও শীতের প্রকোপ হতে রক্ষা পাবে। এ জন্যে চাই সত্যিকার উদ্যোগ ও আন্তরিকতা। যদি প্রতিটি মশারীর গড় মূল্য টাঃ ২৫০/- ও লেপের মূল্য ৬০০ টাকা হয় তাহলে এজন্যে প্রয়োজন হবে ২১ কোটি ৩৯.৫ লক্ষ টাকার। এর ফলশ্রুতিতে দশ বছরে ২৫ লক্ষ ১৭ হাজারেরও বেশী পরিবার উপকৃত হবে।

কন্যাদায়গ্রস্তদের সাহায্য: আমাদের দেশে বিদ্যমান সামাজিক সমস্যাসমূহের অন্যতম কঠিন সমস্যা মেয়ের বিয়ে। যৌতুকের কথা বাদ দিলেও মেয়েকে মোটামুটি একটু সাজিয়ে শশুর বাড়ীতে পাঠাবার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই হাজার হাজার পরিবারের। এছাড়া বিয়ের দিনে আপ্যায়ন ও অপরিহার্য কিছু খরচও রয়েছে যা যোগাবার সাধ্য অনেক পরিবারের নেই। এসব কারণে বিয়ের সম্বন্ধ এলেও মেয়ের বিয়ে দেওয়া হয়ে উঠে না। পিতা বেঁচে না থাকলে বিধবা মায়ের পক্ষে এই দায়িত্ব পালন করা আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অভিজ্ঞতা হতে দেখা গেছে ন্যূনতম ৫,০০০/- সহযোগিতা করলে একটা মেয়েকে স্বামীর ঘরে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যদি দেশের সকল ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রতি বছর পাঁচটি করে মেয়ের বিয়ের জন্যে এ ধরনের সহযোগিতা দেওয়া যায় তাহলে বছরে ব্যয় হবে ১২ কোটি ৫৮.৭ লক্ষ টাকা। দশ বছরে বিয়ে হবে ২,৫১,৭৫০টি মেয়ের। ফলে যে বিপুল সামাজিক কল্যাণ অর্জিত হবে অর্থমূল্যে তা পরিমাপ করা সম্ভব নয়।

ঋণগ্রস্ত কৃষকদের জমি অবমুক্তকরণ: বাংলাদেশের পল্লী এলাকায় এমন গ্রামের সংখ্যাই বেশী যেখানে বর্তমান ভূমিহীন কৃষকদের অনেকেই কয়েক বছর পূর্বেও ছিল মোটামুটি স্বচ্ছল এবং কৃষি জমির মালিক। কিন্তু পারিবারিক কোন বড় ধরনের ব্যয় নির্বাহের জন্যে ব্যাংক বা গ্রামীন মহাজনের নিকট হতে টাকা ঋণ নেওয়ার ফলে তার শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু বেহাত হয়ে গেছে। প্রান্তিক ও ক্ষুদে কৃষকরাই এই তালিকায় সংখ্যাগুরু। ছেলে-মেয়ের বিয়ে, চিকিৎসা বা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকের ফলে শস্যহানির ক্ষতিপূরণের জন্যে শেষ সম্বল দুই বা তিন বিঘা চাষের জমি তারা রেহেন বা বন্ধক রাখে। এসব ঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশই এ ঋণ আর শুধতে পারে না। ফলে তাদের জমি চলে যায় মহাজনের হাতে। এর প্রতিবিধানের জন্যে যাকাতের অর্থ হতেই এদের সাহায্য করা যায়। যদি সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা করে প্রতি ইউনিয়নে গড়ে কুড়ি জন কৃষককেও সাহায্য করা যায় তাহলে ৮৯,০২০ জন কৃষককে প্রতি বছর ঋণমুক্ত করা যায়। জমি ফেরত পেয়ে তারা আবার চাষ-আবাদ করতে ও জমির মালিক হিসাবে নিজেদের উপর আস্থা ফিরে পেতে পারে। এতে বার্ষিক ব্যয় হবে ৪৪কোটি ৫১ লক্ষ টাকা এবং দশ বছরের মধ্যে প্রায় সকল ক্ষুদে ও প্রান্তিক কৃষক ‍ঋণমুক্ত হয়ে যাবে।

দরিদ্র শিশুদের পুষ্টি সাহায্য: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে তো বটেই, শহরেও বস্তি এলাকাতে অগণিত শিশু নিদারুণ পুষ্টিহীনতার শিকার। ফলে িএরা যৌবনেই নানা দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। অনেকে সারাজীবনের মতো রাতকানা স্কার্ভি রিকেট ম্যারাসমাস ঘ্যাগ পাইলস প্রভৃতি নানা রোগের শিকার হয়। এর প্রতিবিধানের জন্যে যাদের বয়স দুই থেকে পাঁচ বছরে মধ্যে তাদের ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল, ভিটামিন ‘সি’ ট্যাপলেট, আয়োডিনযুক্ত লবণের প্যাকেট ইত্যাদি সরবরাহ করতে হবে। এজন্যে প্রাথমিক পর্যায়ে যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে দুই হতে চার বছর বয়সের ১০০ জন শিশুকে বাছাই করা হয় তবে প্রতি বছর ৫,০৩,৫০০ শিশু এর আওতায় আসবে। শিশুর বয় পাঁচ বছর পূর্ণ হলে এই সাহায্য বন্ধ হয়ে যাবে। এজন্যে শিশুপ্রতি মাসিক ব্যয় নূন্যতম টাঃ ৬০/- ধরা হয় তাহলে বছরে খরচ হবে ৩৬ কোটি ২৫ লক্ষ টাকা।

প্রসবকালীন সহযোগিতা: প্রসূতি মাতা ও ৬ সপ্তাহ বয়সের মধ্যে শিশুর মৃত্যু উন্নয়নশীল বিশ্বে উঁচু মৃত্যু হারের অন্যতম কারণ। এদেশের গ্রামাঞ্চলে এখনও গর্ভবর্তী ও প্রসূতি মায়েদের যথাযথ পরিচর্যা, সেবা-যত্ন ও পুষ্টিকর খাবার যোগানের ব্যাপারে একদিকে যেমন বিপুল অমনোযোগিতা ও অশিক্ষা বিদ্যমান তেমনি সামর্থ্যের অভাবও স্বীকৃত। ফলে গর্ভবতী মায়েদের শেষের ছয় সপ্হাতে যখন পুষ্টিকর খাবারের বেশী প্রয়োজন তখন তারা তা যেমন পায় না প্রসবের পরেও সেই অবস্থার কোন উন্নতি ঘটে না। ঘটনাক্রমে যদি উপর্যুপরি দ্বিতীয় বা তৃতীয় কন্যা সন্তানের জন্ম হয় তাহলে প্রসূতির অনাদার-অবহেলার সীমা থাকে না। উপরন্তু প্রসবকালে যে পরিচ্ছন্ন ও জীবানুমুক্ত কাপড়-চোপড়, জীবানুনাশক সামগ্রী ও ঔষধপত্র প্রয়োজন দরিদ্র পরিবারে তার খুব অভাব। এর প্রতিবিধান করতে পারলে গর্ভবর্তী ও প্রসূতি মায়ের কল্যাণ হবে, তাদের অকাল মৃত্যুর হার কমে যাবে। একই সাথে নবজাতকের মৃত্যুর হারও কমে আসবে। এজন্যে ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডপিছু যদি কুড়িটি দরিদ্র পরিবারে গর্ভবর্তী মাকে বেছে নেওয়া হয় এবং ন্যূনতম টাঃ ২০০০/- সহযোগিতা দেওয়া যায় তাহলে বছরে প্রয়োজন হবে মোট ২০ কোটি ১০ লক্ষ টাকা।

মুসাফিরদের সাহায্য: নিঃস্ব মুসাফিরের জন্যেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে আমাদের। কারণ এ হলো খোদায়ী বিধান। দেশের শহরগুলোর মসজিদে তো বটেই, থানা পর্যায়ের মসজিদেও প্রায়ই নামায শেষে দেখা যায় দু-একজন মুসাফির দাঁড়িয়ে যায় যার সব সম্বল শেষ। চিকিৎসা করতে এসে বাড়ী ফেরার মত অর্থ নেই, কাজের খোঁজে এসে কাজ না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে কর্পদকশূন্য অবস্থায়, অথবা দুর্বৃত্তের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব খুইয়েছে। এদের বাড়ীতে ফিরে যাবার ব্যবস্থা করা আমাদের শরয়ী দায়িত্ব। এজসেন্য মসজিদের ইমাম সাহেবদের সাহায্য নিলে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যাব্ েএই উদ্দেশ্যে তাদের হাতে মাসে গড়ে টাঃ ২,০০০/- তুলে দিলে এধরনের মুসাফিরদের নিজ এলাকায় ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করা সহজ হবে। দেশের ৬৪টি জেলা শহরে গড়ে পাঁচটি ও প্রতি থানা সদরে একটি করেম ‍মসজিদ বাছাই করা হলে মোট মসজিদের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩২০+৪৬০=৭৮০। এসব মসজিদে মুসাফিরদের জন্যে মাগে গড়ে টাঃ ২,০০০/- ব্যয় করলে বছরে খরচ হবে ১ কোটি ৮৭ লক্ষ টাকা। এর ফলে যে বিপুল সামাজিক উপকার হবে তা বলে শেষ করার নয়।

ইয়াতীমদের প্রতিপালন: বাংলাদেশে প্রায় প্রতিটি জেলা সদরে সরকারী শিশুসদন রয়েছে। কিন্তু দেশের অগণিত ইয়াতীম শিশু-কিশোরদের স্থান সংকুলান এসব শিশুসদনে হওয়ার কথা নয়। উপরন্তু এখানে কিশোর নির্যাতন এবং তাদের আহার ও পোষাকের যে দুঃখবহ চিত্র মাঝে-মধ্যেই ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে আসে তা হৃদয় বিদারক। তাছাড়া ভয়াবহ বন্যায় কত যে শিশু-কিশোর ও নিঃস্ব হয় তার সটিক চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়। এদের অন্ন ব স্ত্র বাসস্থান ও শিক্ষার জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করার খুবই উপযুক্ত পদক্ষেপ হতে পারে। এজন্যে ইয়াতীমখানা তৈরী ও ইয়াতীমদের ভরণ-পোষণ ও সার্বিক তত্ত্বাবধান এবং সাধারণ শিক্ষাসহ বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যদি ১০০ জন ইয়াতীমের একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য বার্ষিক ন্যূনতম সার্বিক ব্যয় বারো লক্ষ টাকা ধরা হয় তবে এরকম পঞ্চাশটি ইয়াতীমখানার জন্যে বছরে ব্য হবে ছয় কোটি টাকা।

১০ ইউনিয়ন মেডিক্যাল সেন্টার: এদেশের পল্লী েএলাকায় চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা যে কত অপ্রতুল ও অবহেলিত তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। এদেশের গ্রামীন জনগণ সুচিকিৎসার সুযোগের অভাবে তাবিজ-তুমার, ঝাড়-ফুঁক ইত্যাদির উপর বিশ্বাস করে অথবা হাতুড়ে;রে হাতে জীবন সঁপে দিয়ে ধুঁকে ধুঁকে অকাল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। দেশের এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই দরিদ্র। এদেরকে সুস্থভাবে বাঁচার সুযোগ দিহে হলে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পল্লী এলাকায় পেওঁছে দিতে হবে। এজন্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন মেডিক্যাল সেন্টর গড়ে তোলা প্রয়োজন। এদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনার ব্যাপক প্রসারের উদ্দেশ্যে সরকার ‘স্যাটেলাইট ক্লিনিক’ নামে ইউনিয়নভিত্তিক কর্মসূচী চালু করেছেন আজ হতে দুই দশক আগে। সে ধাঁচেই প্রস্তাবিত ইউনিয়নকেন্দ্রিক এই সেন্টার গড়ে উঠতে পারে। এটি হবে মূলতঃ ভ্রাম্যমান বা মোবাইল। এখানে থাকবে একজন এমবিবিএস ডাক্তার, একজন করে পুরুষ মেডিক্যাল এসিট্যান্ট ও মহিলা স্বাস্থ্য কর্মী এবং পল্লী এলাকায় সব ঋতুতে ব্যবহার ও চলাচল উপযোগী বিশেষভাবে তৈরী ভ্যান।

এই ভ্যানেই থাকবে প্রয়োজনীয ঔষধপত্র ও চিকিৎসার অপরিহার্য সামগ্রী বা সরঞ্জাম। ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত গ্রামগুলোতে পালা করে নির্দিষ্ট দিনে হাজির হবে এই ভ্রাম্যমান মেডিক্যাল সেন্টার। জনসংখ্যা ও দূরত্বের বিচারে কোথাও এই সেন্টার একই দিনে দুই গ্রাম আবার কোথাও বা দুই দিন একই গ্রামে যাবে। বিনামূল্যে চিকিৎসা সুবিধা এবং স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে পরামর্শ পাবে গ্রামীন দরিদ্র জনগণ। এখানে রেফারাল সুবিধার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এর ফলে পরবর্তী পর্যায়ে একই উদ্দেশ্যে জেলা সদরে প্রতিষ্ঠিত উন্নতমানের হাসপাতালগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে রোগীর দ্রুত ও উপযুক্ত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে। ইউনিয়নপিছু কেন্দ্রের গড় মাসিক ব্যয় (ডাক্তার, স্বাস্থ্যকর্মী, ভ্যানচালকের বেতন ও ঔষধসহ) ন্যূনতম কুড়ি হাজার টাকা ধরলে দেশের ৪,৪৫১টি ইউনিয়নের জন্যে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াবে ১০৬ কোটি ৮২ লক্ষ টাকা।

১১ মরণোত্তর ঋণ পরিশোধ: সহীত হাদীসে উল্লেখ রয়েছে, ঋণ রেখে মারাগেলে আল্লাহ শহীদকেও ক্ষমা করবেন না। ঋণ বান্দার হক, এই ঋণ পরিশোধ না করার গুনাহ আল্লাহও ক্ষমা করবেন না যতক্ষণ না ঋণদাতা তা ক্ষমা না করে দেয়। সুতরাং, ঋণ গ্রহীতা ঋণ পরিশোধ না করে মারা গেলে এবং তার সন্তান-সন্ততি বা উত্তরাধিকারীরা সেই ঋণ পরিশোধে অক্ষম হলে আখিরাতে ঐ ব্যক্তির অনন্ত আযাবের আশংকা রয়েছে। তাই, ঋণগ্রস্ত দরিদ্র কৃষকের জমি অবমুক্ত করার জন্যে যে ধরনের সহযোগিতার প্রস্তাব ইতিপূর্বে করা হয়েছে অনুরূপ সাহায্য এক্ষেত্রেও দেওয়া যেতে পারে। বরং এর ক্ষেত্র অধিক বিস্তৃত। কৃষি কাজ ছাড়াও নানা কারণে লোকে ঋণ নেয় এবং অনেকে তা সাধ্যমতে চেষ্টা সত্ত্বেও শুধতে পারে না। এদের মরণোত্তর ঋণ পরিশোধে এগিয়ে এলে অসহায় সন্তান-সন্ততি ও বিধবা স্ত্র িপীড়ন ও অসম্মান হতে রেহাই পাবে। উপরন্তু ঋণ যদি জমি বন্ধক রাখার কারণে হয়ে থাকে তাহলে ঋণ পরিশোধের ফলে জমি ফিরে পাবে ওয়ারিশরা। এতেও বিরাট কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

১২ শরণার্থী সহায়তা উদ্ভাস্তু পুনর্বাসন: বর্তমান সময়ে বিশ্বজুড়ে মুসলমানরা সন্ত্রাসের শিকার। স্বদেশ ছেড়ে পার্শবর্তী দেশে আশ্রয় নিচ্ছে অসহায় হাজার হাজার নারী-পুরুষ শিশু-বৃদ্ধ। জীবন বাঁচাবার জন্যে নিরুপায় হয়ে অনেকেই শুধু পরনের কাপড়টুকু সম্বল করে অজানা গন্তব্যের দিকে যারা পাড়ি জমিয়েছিল তাদের বর্তমান বিভীষিকাময়, ভবিষ্যৎ অজানা ও অনিশ্চিত। চেচনিয়া বসনিয়া মায়ানমার মোসিডোনিয়া কাশ্মীর মিন্দানাও ইথিওপিয়া পূর্ব তিমুর নাইজেরিয়া এবং আফগানিস্তান এর জ্বাজ্বল্যমান উদাহরণ। জাতিসংঘের উদ্ভাস্তু হাইকমিশনের দেওয়া সাহায্য এবং মাঝে মাঝে মুসরিম বিশ্বের কোন কোন দেশের পাঠানো মানবিক সাহায্য বিপুল প্রয়োজনের সমুদ্রে গোষ্পদ মাত্র। লাখো লাখো বনি আদমের সাহায্যে মুসলিম মিল্লাতকেই এগিয়ে আসতে হবে। উম্মাহর এই দুর্দিনে রাষ্ট্রের পাশাপাশি ব্যক্তি মুসরমানকেও এগিয়ে আসতে হবে তার শক্তি সামর্থ নিয়ে। সেই সাথে যাকাতের অর্থও দিতে হবে অকাতরে এসব অভাবী ভাইবোনদের প্রয়োজন পূরণের জন্যে, তাদের পুনর্বাসনের জন্যে। ক্ষুধা-তৃষ্ণার খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের পাশাপাশি শীতের ঠান্ডা ও গ্রীষ্মের দাবদাহ হতে রক্ষার জন্যে চাই উপযুক্ত আশ্রয়স্থল। বাংলাদেশে এখনও মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান এবং আটকেপড়া পাকিস্তানীদের অনেকেই মানবেতর জীবন যাপনে বাধ্য হচ্ছে। এদের প্রয়োজন পূরণ ও প্রত্যাবাসনেও যাকাতের অর্থে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। শুধু প্রয়োজনীয় উদ্রোগ ও যথাযথ পরিকল্পনা।

১৩ স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার: দেশের পল্লী এলাকায় তো বটেই, শহরতলীতেও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের অভাব প্রকট। হাজার হাজার পরিবারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার বানাবার আর্থিক সামর্থ নেই। সেজন্যেই যেখানে সেখান প্রস্রাব ও পায়খানার কদর্য ও স্বাস্থ্যবিধি বহির্ভূত অভ্যাস আরও বেশী প্রসার লাভ করে চলেছে। ফলে সহজেই পানি দূষিত হচ্ছে, সংক্রামক ব্যাধি বিস্তার লাভ করছে, পুঁতিগন্ধময় পরিবেশের সৃষ্টি হচ্ছে। উপরন্তু গ্রামাঞ্জলে মহিলাদের পক্ষে ইজ্জত-আবরু বজায় রেখে প্রাকৃতিক এই প্রয়োজন পূরণ করা খুবই দুরূহ। দেশের উত্তরাঞ্চলে এই সমস্যা সবচেয়ে বেশী প্রকট। এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে দরিদ্র পরিবারসমূহের জন্যে স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা জরুরী। এজন্যে প্রয়োজন একটা প্যানসহ স্লাব ও সিমেন্টের ২ বা ৩টা রিং। এজন্যে সর্বোচ্চ খরচ পড়বে সাড়ে তিনশ টাকা। গ্রহীতারা নিজেরাই পাটখড়ি, শুকনা কলাপাতা বা পলিথিন দিয়ে এটা ঘিরে নিতে পারে। যদি প্রতি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে বছরে ৫০টি করে পরিবারকে এই সুবিধা দেওয়া যায় তাহলে প্রয়োজন হবে ৮ কোটি ৮১ লক্ষ টাকা। এভাবে ১০ বছরে ২৫,১৭,৫০০ পরিবার এই কর্মসূচীর আওতায় চলে আসবে। পর্দা, স্বাস্থ্যরক্ষা ও পরিবেশদূষন রোধে এর ফলাফল হবে সুদূরপ্রসারী।

১৪ নওমুসলিম পুনর্বাসন: দেশে প্রতি বছরই বিভিন্ন জেলায় কিছু কিছু ব্যক্তি বা পরিবার ইসলাম গ্রহণ করছে। ইসলাম গ্রহণের সাথে সাথেই এরা পারিবারিক সম্পদ ও সহযোগিতা হতে বঞ্চিত হয়। এদের সন্তান-সন্ততিরাও লেখা-পড়ার সুযোগ পায়না। এদের সম্মানজনক পুনর্বাসনের জন্যে সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া আমাদের দ্বীনি দায়িত্ব। তবে ধর্মান্তরিত খৃষ্টানদের মতো এদের জন্যে পৃথক কোন অঞ্চল গড়ে তোলার চেষ্টা না করে বরং সমাজের মূল স্রোতধারার সাথে মিশে যেতে সাহায্য করাই শ্রেয়। যদি গোটা দেশে প্রতি বছর অন্ততঃ পঞ্চাশটি নওমুসলিম পরিবারকে এ উদ্দেশ্যে ন্যূনতম ;মাসিক টাঃ ৫,০০০/- হারে একবছর ভাতা প্রদান ও কর্মসংস্থানের জন্যে এককালীন দশ হাজার টাকা সাহায্য করা যায় তাহলে বছরে ব্যয় হবে ৩০ লক্ষ টাকা।

শিক্ষা প্রশিক্ষণমূলক কর্মসূচী

দ্বীনি শিক্ষা অর্জনে সহযোগিতা: ইসলামী শিক্ষা অর্জন ব্যতিরেকে প্রকৃত মুমিন হওয়া অসম্ভব। কিন্তু এদেশে ক্রমেই সেই সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে। দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে মাদরাসাগুলো কোনোক্রমে টিকে রয়েছে। সরকারী পরিসংখ্যান হতে দেখা যায় এদেশে ১৯৯১-৯২ সালে দাখিল মাদরাসার সংখ্যা ছিল ৪,৪৬৬। এ সংখ্যা ১৯৯৪-৯৫ সালে ৪,১২১ এ এসে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তিন বছরে মাদরাসার সংখ্যা কমেছে ৩৪৫টি। সরকার প্রাথমিক শিক্ষা সম্প্রসারণের জন্যে প্রাইমারী স্কুল ও হাইস্কুলের প্রাইমারী অংশের ছাত্র-ছাত্রীদের পাঠ্যবই বিনামূল্যে সরবরাহ করে থাকে। উপরন্তু শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য (শিবিখা) কর্মসূচীও চালূ রয়েছে। কিন্তু মাদরাসাগুলো এসব সুযোগ হতে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। মাদরাসাগুলোতে ছাত্র-ছাত্রী ধরে রাখতে হলে তাদের জন্যেও অনুরূপ সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। বিনামূল্যে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বই প্রদানের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পোষাক যোগান দিতে হবে। এজন্যে যদি দাখিল মাদরাসাগুলোসহ আলিম ও ফাযিল মাদরাসার পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের বেভে নেওয়া হয় তাহলে এদের সংখ্যা দাঁড়াবে ১০ লাখের মতো। এদের বই সরবরাহ করতে গড়ে মাথাপিছু টাঃ ১৫০/- হিসাবে দরকার হবে ১৫ কোটি টাকা। এক সেট পোশাক সরবরাহ করলে খরচ পড়বে গড়ে মাথাপিছু টাঃ ২০০/- হারে ২০ কোটি টাকা। এছাড়া স্বাস্থ্যরক্ষার জন্যে ভিটামিন ও আয়রন ট্যাবলেট সরবরাহ করলে প্রয়োজন হবে আরও ১০ কোটি টাকার। সর্বসাকুল্যে এই ৪৫কোটি টাকার বিনিময়ে মানব সম্পদ উন্নয়নের যে স্থায়ী ভিত রচিত হবে তার ভবিষ্যৎ মূল্য অপরিসীম। এসবের পাশাপাশি মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংগুলোতেও খাদ্যমান বাড়াবার জন্যে যাকাতের অর্থ ব্যবহার অপরিহার্য।

ইসলামী সাহিত্য প্রকাশ: মনে রাখা দরকার, ইসলামের প্রচার ও প্রসার এবং ইসলামী জীবনব্যবস্থা কায়েমের জন্যে দ্বীনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ও সেসবের বিকাশের কোন বিকল্প নেই। যেকোন আন্দোলন বা জীবন ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠা ও সাফল্য নির্ভর করে তার Institution building ক্ষমতার উপরে। সে জন্যেই মাদরাসাসহ অন্যান্য যেসব প্রতিষ্ঠান দ্বীনের কাজে সক্রিয়ভাবে লিপ্ত তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসতে হবে। একই সাথে ইসলামী চিন্তা ও বিশ্বাসের ধারক বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা প্রকাশের কাজে বিশেষস মনোনিবেশ করতে হবে। সহজবোধ্য করে লেখা ইসলামী জীবন ব্যবস্থার বুনিয়াদী শিক্ষার পাশাপাশি জ্ঞানগর্ভ, যুক্তিপূর্ণ অথচ স্বল্প আয়তনের বইয়ের আজ বিশেষ প্রয়োজন। এসব বই পৌঁছে দিতে হবে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত ‍যুবক-যুবতীদের হাতে। এছাড়া পাশ্চাত্যের ভোগবাদী দুনিয়াসর্বস্ব জীবনদর্শনের মুকাবিলা করা আদৌ সম্ভব নয়। এ প্রসঙ্গে বর্তমান শতাব্দীর প্রখ্যাত মনীষী ও ইসলামী চিন্তাবিদ ডঃ ইউসুফ আল-কারযাবীর বক্তব্য এখানে তুলে ধরা যেতে পারে। তিনি বলেন-

আরও পড়ুনঃ   ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞা ও মূলনীতি

“যাকাত খাতের সমস্ত আয় সাংস্কৃতিক, প্রশিক্ষণমূলক ও প্রচারধর্মী কার্যাবলীতে ব্রয় করা িএ কালে উত্তম। …. সঠিক ইসলামী দাওয়াত প্রচারের কেন্দ্র স্থাপন এবং অমুসলিমদের মধ্যে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পালন এ কালে সব কয়টি মহাদেশেই একান্ত কর্তব্য। কেননা এ কালে বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদের মধ্যে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব ও সংঘর্ষ চ লছে। একাজও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ রূপে গণ্য হতে পারে। দেশের অভ্যন্তরে ইসলাম প্রচার কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং মুসলিম যুবসমাজকে একাজে নিয়োজিত ও প্রতিপালন করা একান্ত আবশ্যক। …. খালেস ইসলামী মতবাদ ও চিন্তাধারামূরক বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকা প্রচার করাও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তা প্রতিহত করবে বিধ্বংসী ও বিভ্রান্তিকর চিন্তা-বিশ্বাসের ধারক বই-পুস্তক ও পত্র-পত্রিকার যাবতীয কারসাজি। তার ফলেই আল্লাহর কালেমা প্রাধান্য লাভ করতে পারে এবং সত্য সটিক চিন্তা সর্বত্র প্রচারিত হতে পারে। এ কাজও আল্লাহর পথে জিহাদ। …. ঘুমন্ত মুসলিম জনগণকে জাগ্রত করা এবং খৃস্টান মিশনারী ও নাস্তিকতার প্রচারকদের মুকাবিলা করা নিশ্চযই ইসলামী জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ।” (ইউসুফ আল-যারযাবী-ইসলামে যাকাত বিধান, ২য় খণ্ড, অনুবাদ- মুহাম্মদ আব্দুর রহীম, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ১৯৮৩; পৃ. ১৭৫-১৭৬)

দাওয়াত তাবলীগের কাজ: স্বীকার করতে লজ্জা নেই, বাংলাদেশে ইসলামের প্রতি আহ্বান বা দাওয়াত এবং প্রচার বা তাবলীগের কাজ খুব অবহেলিত। ইসলামের শিক্ষা ও তার দাবী সম্বন্ধে অনবহিত হওয়ার কারণেই আজ যুব সমাজ বিপথগামী, ভিন্ন জীবন দর্শনের অনুরাগী। এই অবস্থার প্রতিবিধানের জন্যে দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে যথাযোগ্য গুরুত্ব আরোপ করার বিকল্প নেই। প্রত্যেক ব্যক্তিকে দায়ী ইলাল্লাহ হিসেবে গড়ে তুলবার উদ্দেশ্যে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, তাদের হাতে ইসলামী সাহিত্য পৌঁছে দেওয়া, খৃস্টান মিশনারী ও এনজিওদের অপতৎপরতার সম্বন্ধে ওয়াকিফহাল করা এবং ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে অপপ্রচার ও শ্বেতসন্ত্রাস চলছে সে সম্বন্ধে অবহিত করার আশু পদক্ষেপ গ্রহণ নিতান্তই জরুরী। এই উদ্দেশ্যে ইসলামী সাহিত্যের প্রচার ও পাঠাগার গড়ে তোলার পাশাপাশি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যোগ্য ব্যক্তির প্রয়োজনও অনস্বীকার্য। দেশের সর্বত্র এই কাজের যথাযোগ্য আনজাম দেবার জন্যে কমপক্ষে থানাভিত্তিক লোক নিয়োগ করতে হবে। এজন্যে মাসিক পাঁচ হাজার টাকা খরচ করলে সারা দেশে বছরে খরচ হবে মাত্র তিন কোটি টাকা। দেশের ভবিষ্যৎ স্বার্থ বিবেচনায় এই অর্থ একেবারেই নগণ্য।

উপরন্তু দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে যদি অন্ততঃ প্রথম পর্যায়ে পাঁচ ব ছরের জন্যেও ইসলামী সাহিত্য বিতরণ ও পাঠাগার স্থাপনের উদ্রোগ নেওয়া হয় এবং ইউনিয়ন/ওয়ার্ড পিছু ন্যূনতম পঞ্চাশ হাজার টাকা এই উদ্দেশ্যে ব্যয় করা হয় তাহলে বছরে খরচ হবে পঁচিশ কোটি টাকার কিছু বেশী। ইসলামবিরোধী শক্তির অগ্রাসন মুকাবিলার জন্যে এই অর্থ একেবারেই অকিঞ্চিৎকর। অথচ এই ব্যয় জাতির স্বার্থে অপরিহার্য। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এই পরিমাণ অর্থ সাধারণভাবে সংগ্রহ করা খুবই কঠিন। তাই যাকাতের অর্থ ব্রবহার করে হলেও যুব সমাজকে চিন্তা ও মননশীলতার দিক থেকে ধ্বংসের পথ হতে ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে তৎপরতা গ্রহণ একান্তই জরুরী।

৪। ছাত্রদের জন্যে বৃত্তি: দেশের মাদরাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব ছাত্র-ছাত্রী পড়াশুনা করছে তাদের বিরাট অংশ ক্ষুদে ও মাঝারি কৃষক পরিবারের সন্তান। তারা দারুণ আর্থিক সংকটের শিকার। এদের লেখাপড়ার ব্যয় নির্বাহের জন্যে মাতাপিতাকে শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু বিক্রী করতে হয় অথবা বন্ধক রাখতে হয়। অনেককে নিরুপায় হয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে দিতে হয়। এদের মধ্যে থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, সম্মান ও মার্টার্স শ্রেণী, মাদরাসার ক্ষেত্রে আলিম ফাজিল ও কামিল শ্রেণী, প্রকৌশল ও মেডিক্যাল কলেট এবং পলিটেকনিক ও ভকেশনাল ইনস্টিটিউটগুলোতে অধ্যয়নের ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্যে যদি প্রতি বছর পঞ্চাশ হাজার ছাত্র-ছাত্রীকে বাছাই করা হয় এবং মাসিক টাঃ স১,৫০০/- হারে বৃত্তি দেওয়া হয় তাহলে বার্ষিক ব্যয় হবে ৯০ কোটি টাকা। এভাবে দশ বছরে পাঁচ লক্ষ ছাত্র-ছাত্রীকে শিক্ষার একটা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।

উল্লেখ্য, যেহেতু দ্বিতীয বছরে নতুন ছাত্র-ছাত্রীরা এ প্রকল্পের আওতায় আসবে এবং পুরাতনরাও অধ্যয়নরত থাকবে সেহেতু তখন প্রয়োজন হবে ১৮০ কোটি টাকা। তৃতীয় বছরে এর পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ২৭০ কোটি টাকা। চতুর্থ বছর হতে প্রয়োজন হবে ৩৬০ কোটি টাকার। সম্ভাব্য বৃত্তিভোগীদের বাছাই করার সময়ে মেধার পাশাপাশি প্রকৃতই পারিবারিক আর্থিক অনটন রয়েছে এমন প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন হবে। এলাকার দুজন বিশিষ্ট ইসলামী ব্যক্তিত্ব সংশ্লিষ্ট ছাত্র-ছাত্রীর আমল-আখলাক ও তাকওয়া সম্বন্ধে গোপনে প্রত্যয়ন করবেন। উপরন্তু বৃত্তিভোগীরা কর্মজীবনে প্রবেশ করে প্রাপ্ত অর্থের অন্ততঃ ৫০% ওয়াকফ তহবিলে কিস্তিতে পরিশোধ করবে এরকম বিধান করাও সম্ভব।

মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: মহিলাদের ঘরে বসেই জীবিকা উপার্জনের পথ করে দেবার জন্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। বিভিন্ন ধরনের সেলাই, কাটিং-নিটিং, এমব্রয়ডারী, বুটিক, ফেব্রিকস প্রিন্ট, ফুল, চামড়া ও কাপড়ের সৌখিন সামগ্রী, উলের কাজ ইত্যাদি শেখানোর জন্যে জেলা ও থানাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। েএখানে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সকল মহিলাই কাজ শেখার সুযোগ পাবে। এজন্যে বড় বড় শহরে একাধিক এবং ছোট জেলা ও বড় থানাগুলোতে প্রাথমিক পর্যায়ে একটি করে মোট ১০০টি কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে। এসব কেন্দ্রে প্রশিক্ষকের বেতন, শিক্ষার উপকরণ সরবরাহ ও অন্যান্য আনুষাঙ্গিক ব্যয়সহ মাসিক ন্যূনতম গড় ব্যয় টাঃ ৮,০০০/= ধরলে ব্যয় হবে ৯৬ লক্ষ টাকা। বিনিময়ে হাজার হাজার মহিলা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে নিজেদের পায়ে দাঁড়াবার সুযোগ পাবে। তাদের আর্থিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে, পরিবারের বিপর্যয়ও রোধ হবে।

কম্পিউটার প্রশিক্ষণ: ব্যাপক কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে বর্তমান কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন অতীব গুরুত্বপূর্ন পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশে রয়েছে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার। যদি ডাটা এন্ট্রি অপরেটর হিসাবে এদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায় তাহলে এদের কর্মসংস্থানের সুযোগ খুলে যাবে। এ ব্যাপারে প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতিমধ্যেই অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সে দেশের সরকার উদ্যোগ নিয়ে V-sat চ্যানেলের সংযোগ নিয়েছে এবং শুধু ডাটা এন্ট্রি করেই প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করছে। আমাদেরও আগামী শতাব্দীর চাহিদা ও কর্মসংস্থানের প্রতি লক্ষ্য রেখে এখনই যুগপৎ প্রশিক্ষণ ও যোগাযোগ অবকাঠামো (Communication infrastructure) গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া উচিৎ। যদি প্রাথমিকভাবে দেশব্যাপী ১০০টি সঠিক মানের কম্পিউটার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় তাহলে বছরে ন্যূনতম ১২,০০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া যাবে। এজন্যে প্রথম বছরে ৫কোটি টাকার মতো ব্যয় হলেও শেষে এটা বছরে দুই কোটি টাকার নীচে নেমে আসবে।

কর্মসংস্থান পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচী

গরু/বলদ ক্রয়ে সাহায্য: গ্রাম বাংলায় কৃষি কাজের প্রধান অবলম্বন চাষের বলদ। একই সঙ্গে পুষ্টি ও উপার্জনের সহায়ক হলো দুধেল গাই। বহু কৃষকের জমি থাকলেও এক জোড়া বলদ নেই। কেনার সামর্থ্যও নেই। এদের হালের বলদ বা দুধেল গাই কিনে দিয়ে সাহায্য করা যেতে পারে। প্রতিটি গরু বা বলদের দাম যদি গড়ে টা: ৭,৫০০/- ধরা যায় িএবং প্রতি ইউনিয়নে গড়ে কুড়ি জনকেও এ ধরনের সাহায্য করা যায় তাহলে প্রতি বছর ব্যয় হবে ৬৬ কোটি ৭৬.৫ লক্ষ টাকা। এ কর্মসূচী দশবছর চালু থাকলে চাষাবাদ ও দুধের মাধ্যমে উপার্জন ও পুষ্টির ক্ষেত্রে বিপুল ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হবে। গতিবেগে সঞ্চারিত হবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।

বিভিন্ন পেশাগত কর্মসংস্থান: শহরতলীসহ বাংলাদেশের গ্রামীন এলাকায় নিদারুণ বেকারত্ব বিদ্যমান। দেশে কর্মরত এনজিগুলো এসব বেকারদের, বিশেষতঃ মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্যে নানা ধরনের উপকরণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঋণ দিচ্ছে। দুঃখের বিষয়, এ ঋণ নিয়ে তারা স্বনির্ভর হতে পেরেছে, না সুকৌশলে তাদের শুষে নিয়ে এনজিওগুলো নিজেরাই ফুলে ফেঁপে বড় হচ্ছে সেই বিচার আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে যাকাতের অর্থ দিয়ে যদি নীচের খাতগুলোতে উপকরণ/সরঞ্জাম কিনে সাহায্য করা যেত তাহলে কি পরিমাণ উপকার হতে পারতো তার একটা সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো।

গ্রামবাংলার ইউনিয়নসমূহ ও শহরতলীর এরাকাগুলোতে যেসব পেশায় অধিক সংখ্যক লোকের কাজের সুযোগ রয়েছে সেগুলো হলো:

ক) ক্ষুদ্র আকারে উৎপাদন: চাল/চিড়া/মুড়ি/খই তৈরী, পাটি তৈরী, চাটনী/আচার/মোরব্বা তৈরী, মিঠাই তৈরী, লুঙ্গি/তোয়ালা/গামছা বোনা, বাঁশ-বেতের কাজ, নকশী কাঁথা তৈরী, খেলনা তৈরী, হাঁস-মুরগী পালন, মাছের চাষ, সব্জী চাষ ইত্যাদি।

খ) পেশাগত সরঞ্জাম ক্রয়, সংযোজন ও মেরাতম: রিক্সা ও রিক্সাভ্যান তৈরী ও মেরামত, জাল তৈরী, গরু ও ঘোড়ার গাড়ীর চাকা তৈরী ও মেরামত, চাষাবাদের সরঞ্জাম তৈরী ও মেরামত, ইলেকট্রিক সামগ্রী মেরামত, স্যালো মেশিন মেরামত ইত্যাদি।

গ) ক্ষুদ্র আকারে ব্যবসা, মুদী দোকান, মনিহারী দোকান এ্যালুমিনিয়াম/মাটির তৈজসপত্রের দোকান, চায়ের দোকান, দর্জিন দোকান, মাছের ব্যবসা, সব্জীর ব্যবসা, মৌসুমী ফলের ব্যবসা, ফুলের দোকান, ফেরীওয়ালা ইত্যাদি।

উপরে উল্লেখিত চল্লিশ ধরনের কাজের মধ্যে যদি প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে যেকোন দশটি পেশায় প্রতি বছর গড়ে দশ জন হিসাবে একশত জন বেকার অথচ উদ্যোক্তা পুরুষ ও নারীকে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার উপকরণ দিয়ে সহযোগিতা করা যায় তাহলে বছরে প্রয়োজন হবে সর্বমোট ২৫১ কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা। এ সুযোগ একজন লোক মাত্র একবারই পাবে। ফলে প্রতি বছর কর্মসংস্থান হবে ৫,০৩,৫০০ জনের। ‍উল্লেখ্য, ডিসেম্বর ১৯৯৭ পর্যন্ত গ্রামীন ব্যাংক বাদে উল্লেখযোগ্য এনজিওগুলোর প্রদত্ত ঋণের ক্রমপুঞ্জীভূত পরিমাণ ছিল ৪,৩৯৮ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা। পক্ষান্তরে শুধুমাত্র ১৯৯৭ সালে প্রদত্ত ঋণে পরিমাণ ছিল ১,৫০৯ কোটি ৯ লক্ষ টাকা। এবছরে ঋণগ্রহীতাদের গৃহীত মাথাপিচু ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র টা: ২,২৩৮/-। (তথ্যসূত্র: CDF Statics, Vol.56, December 1997, Credit and Development Forum, Dhaka, p. 6.)। এই ঋণ সবটাই শুধতে হয়েছে সুদসহ যার হার খুবই চড়া। গ্রামীন ব্যাংকের ক্ষেত্রেই এ হার ১২২% হতে ১৭৩%, এমনকি ক্ষেত্রেবিশেষে ২১৯% পর্যন্ত (ইনকিলাব, ৯ ও ১৬ নভেম্বর, ১৯৯৭)। এরই বিপরীত যাকাতের মাধ্যমে উপকরণ গ্রহীতাকে সাহায্য করা হচ্ছে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে এবং প্রদত্ত অর্থও (যার পরিমাণ এনজিওগুলো প্রদত্ত গড় অর্থের দ্বিগুণেরও বেশ) তার কাছে রয়ে যাচ্ছে মূলধন আকারেই।

গৃহায়ন কর্মসূচী: বাংলাদেশে গ্রামাঞ্জলে প্রতি তিন জনের একজনেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। প্রতি বছর অগ্নিকাণ্ড, বন্যা ও নদী ভাঙনের ফলে ক্রমেই এই সংখ্যা বাড়ছে। শহর রক্ষাকারী বাঁধ, রেল লাইনের দুপাশ, নদীর উঁচু পাড়, বেড়ী বাধঁ প্রভৃতি জায়গায় কোন রকমে খুঁটির মাথায় পলিথিন, চট, সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে আচ্ছাদন তৈরী করে বাস করছে দুর্গত বনি আদমরা। সেখানে না আছে আলো-বাতাস, না আছে পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা। লেখাপড়া বা চিত্ত বিনোদনের কথা নাই বলা হলো। এছাড়া অফিস-আদালত ও স্কুল-কলেজের বারান্দায়, রেল স্টেশন ও বাস টার্মিনালে বিপুল সংখ্যক ছিন্নমূল নারী-পুরুষ রাত কাটায়। এদের মাথা গোঁচার ঠাঁই করতে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারী খাস জমি বা জেগে ওঠা নতুন চরে এাদের বহুজনেরই বাসস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব। প্রয়োজন ন্যূনতম তিন বান টিন, গোটা দশেক বাঁশ ও অন্যান্য সরঞ্জাম। এছাড়া বেড়াও দিতে হবে। বিশুদ্ধ পানির জন্যে প্রয়োজন টিউওয়েলের। হাজার বিশেক টাকার মধ্যে এসব প্রয়োজন পূরণ সম্ভব। দেশের ৫,০৩৫টি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রতিবছর যদি অন্ততঃ পাঁচটি করে পরিবারকে ঘর বেঁধে দেওয়া যায় তাহলে উপকৃত হবে ২৫,১৭৫টি পরিবার, ব্যয় হবে ৫০ কোটি ৩৫ লক্ষ টাকা।

এভাবে কর্মসংস্থান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদী বৃহৎ বিনিয়োগ কর্মসূচী গ্রহণ করে স্থায়ী কর্মসংস্থানের যেমন সুযোগ সৃষ্টি করা যায় তেমনি এসব বিনিয়োগ হতে নিয়মিত ও স্থায়ী উপার্জনেরও সুযোগ হয়। এর ফলে পুরাতন ত্রাণ ও পুনর্বাসনমূলক কর্মসূচীগুলো অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে। উদাহরণতঃ পরিবহন শিল্পের কথা ধরা যেতে পারে। দেশে সড়ক যোগাযোগের যে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে তার প্রেক্ষিতে আন্তঃজেলা ও রাজধানীর সাথে সড়ক পথে যাতায়াতের পরিমাণ বহুগুণ বেড়েছে, অদুর ভবিষ্যতে আড়ও বাড়বে। এই সুযোগ গ্রহণ করে যদি আধুনিক ২০০ বাস (এয়ার কন্ডিশন নয়) রাস্তায় নামানো যায় তাহলে সর্বসাকুল্যে ব্যয় হবে ১০০ কোটি টাকা। এথেকে যে আয় হবে তা যেমন পুনরায় বিনিয়োগ করা যাবে তেমনি বিপুল সংখ্যক লোকেরও কর্মসংস্থান হবে। ড্রাইভার কন্ডাকটর হেলপার ওয়েলম্যান মেকানিক ওয়ার্কশপ ইত্যাদি মিলে বিরাট সংখ্যক লোক কর্মব্যস্ত থাকার সুযোগ পাবে।

. সমস্যা

যাকাতের মাধ্যমে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিপুল উন্নয়নের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও জাতি তা থেকে বঞ্চিত। কারণ যাকাত ব্যবস্থা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রয়েছে বিষম বাধা। এসব সমস্যা বা প্রতিবন্ধকতা সম্বন্ধে আলোকপাত করা অপরিহার্য। নীচে সংক্ষেপে এসব প্রসঙ্গ তুলে ধরা হলো।

প্রথমতঃ বাংলাদেশে ইসলামের মৌলিক যেসব প্রসঙ্গ নিয়ে জোরদার আলোচনা কম হয়েছে যাকাত সে সবের অন্যতম। যাকাত সম্বন্ধে পত্র-পত্রিকায় যদিও কিছু কিছু আলোচনা হয় ওয়াজ মাহফিল বা তাফসীরুল কুরআন মাহফিলে আলোচনা হয় তার চেয়ে অনেক কম। দেশে যতলোক পত্র-পত্রিকা পড়েন তার চেয়ে অনেকগুণ বেশী লোক ওয়াজ মাহফিলে জমায়েত হয় এবং ওলামায়ে কেরামের বক্তৃতা হতে শিক্ষা লাভ করে অনুপ্রাণিত হয়। ওলামা মাশয়েখগণ যদি জনগণকে যাকাতের হাকীকত ও ফযীলত এবং জনগণের আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনে এর সুদূরপ্রসারী ভূমিকা সম্বন্ধে যথাযথ বক্তব্য রাখতেন তাহলে এতদিনে যাকাতের উপযুক্ত ব্যবহার ও উসুল সম্পর্কে আরও বেশী সচেতনতা লক্ষ্য করা যেতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় ও ব্যবহার হলে যে কল্যাণ ও দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া যেতো সে বিষয়েও জনগণের প্রায় কোন ধারণাই নেই।

দ্বিতীয়তঃ সাহেবে নিসাব ব্যক্তিদের কাছ থেকে যাকাত আদায়ের জন্যে েএদেশে কোন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠেনি। প্রয়োজনীয় আইন বা রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গৃহীত না হওয়াই এজন্যে প্রধানতঃ দায়ী। যারা যাকাত দিয়ে থাকেন তাদের কেউ কেউ অবশ্য সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে বিভিন্ন দ্বীনি প্রতিষ্ঠান ও ইয়াতীমখানায় তাদের যাকাত পৌঁছে দেন। কখনও বা এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হতে লোক নিয়োগ করে যাকাত সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক যাকাত প্রদানকারী পুরুষ ও মহলিা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে নিজেদের মার্জিমাফিক তাদের প্রদেয় যাকাতের অর্থ বিলি-বন্টন করে থাকেন। এই অবস্থার আশু পরিবর্তন খুব সহজসাধ্য নয়।

তৃতীযতঃ সরকার যদি যাকাত আদায় ও তার ব্যবহার সম্পর্কে আইন প্রণয়ন করেও তবু জনগণের পক্ষ হতে কাংখিত সাড়া বা সহযোগিতা লাভ খুব সহজ হবে না। কারণ এদেশের সরকারের আর্থিক লেনদেন ও অর্থব্যয়ের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাদের আচরণ ব্যক্তিজীবন ও ইসলামের প্রতি তাদের কমিটমেন্টের প্রতি সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে, পর্যবেক্ষণ করবে। বলাই বাহুল্য, সেই মাপকাঠিতে অনেক ঘাটতি, অনেক অপূর্ণতা ধরা পড়বে। দ্বীনদার মুসলমানরা চাইবে তাদের এই আর্থিক ইবাদাত আল্লাহর কাছে কবুল হোক, প্রকৃত হকদারদের হাতেই এই অর্থ পৌঁছুক। অর্থাৎ আত্মসাৎ বা দুর্নীতি দূরে থাক, এক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটি বা অপূর্ণতাও তারা মেনে নেবে না। সুতরাং, এই উদ্দেশ্যে সঠিক জনশক্তি নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো নির্মাণের কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু এ কাজ যেমন সহজসাধ্য নয়, তেমনি স্বল্প সময়ে সম্পন্ন করারও নয়। এজন্যে যথাযথ আইন প্রণয়ন ও পরিকল্পনা গ্রহণের পূর্ব প্রয়েঅজন হবে একটা পাইলট স্কীম তৈরী করে তার বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন। এই পাইলট স্কীম সফল হলে সেই আলোকেই প্রয়োজনীয পরিমার্জনা সাপেক্ষে এর সার্বজনীন রূপ দেওয়া যেতে পারে, আইন তৈরী হতে পারে এবং দেশব্যাপী তার প্রয়োগ হতে পারে। এজন্যে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে উপযুক্ত কর্মকৌশল নির্ধারণের কাজ এখনি শুরু হতে পারে।

. সম্ভাবনা

উপরের আলোচনা হতে এ সত্য দিবালোকের মতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরই আল্লাহর দেওয়া বিপুল সম্পদ রয়েছে। এর সঠিক ব্যবহার করতে পারলে দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের জন্যে কোন আলাউদ্দিনের চেরাগের দরকারনেই। দরকার নেই বিদেশী সাহায্যের। যা দরকার তা হলো ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও দাবী সম্বন্ধে জনগণের ওয়াকিবহাল হওয়া, যাকাত আদায় ও বিলি-বন্টন সম্পর্কে সাংগঠনিক প্রক্রিয়া ও সরকারী নতি-নির্দেশনা এবং একটি সুদূরপ্রসারী কার্যকর পরিকল্পনা। তাহলে এনজিওদের কবলমুক্ত এবং সুদের অভিশাপমুক্ত হয়ে সুখী ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

দ্বিতীযতঃ ইতিপূর্বে বলা হয়েছে বাংলঅদেশের সাহেবে নিসাব ব্যক্তিরা যাকাত উসূর করে থাকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে এবং তা বিলি-বন্টনও করে থাকে সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে।। বহু ব্যক্তি প্রতিবছর লক্ষাধিক টাকা যাকাত আদায় করে থাকেন।কিন্তু তাদের কোন পূর্ব পরিকল্পনা না থাকায় ব্যয়িত এই অর্থ হতে দীর্ঘ মেয়াদী কল্যাণ বা দারিদ্র্য দূরকরণের কোনটাই হয় না। অথব এসব ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধ করে এদেরই দেয় যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করে ক্ষুদ্র আকারে বা স্থানীয়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা কঠিন বা অসম্ভব কাজ নয়। প্রয়োজন এদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করা এবং সুফল প্রত্যক্ষ করার সুযোগ দেওয়া। আশার কথা, ইতিমধ্যেই দেশের কোন কোন অঞ্চলে সাংগঠনিকভাবে এই উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে এবং তার উপকারও চাক্ষুষ করা যাচ্ছে।

তৃতীযতঃ যাকাত আদায় ও তা বিলিবন্টনের জন্যে সরকার বা কোন সংস্থার বাড়তি অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন নেই। যাকাত আদায়কারীরাই যেহেতু আল-কুরআনের নির্দেশ অনুসারে যাকাতের অর্থ পেতে পারে (সূরা আত্‌-তাওবা: ৬০ আয়াত) সেহেতু আদায়কৃত যাকাত হতেই আদায়কারীকে এর একটা অংশ সম্মানী বা বেতন হিসেবে দেওয়া যেতে পারে। কোন প্রতিষ্ঠান একাজে এগিয়ে এলে তাকেও এ অর্থ দেওয়া সম্ভব। এর ফলে বেশ কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে। উপরন্তু দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যাকাত সংগ্রহ ও অর্থ-সামগ্রী বিতরণ করার কাজটিও সহজ হবে।

চতুর্থতঃ এ ব্যাপারে দেশের ওলামা-মাশায়েখদের ঐক্যবদ্ধ, সক্রিয় ও বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণের প্রয়োজন। তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে সঠিক পদ্ধতিতে যাকাত ও উশর আদায় এবং তার সর্বোচ্চ কল্যঅণমুখী ব্যবহারের জন্যে জনগণকে আহ্বান জানাতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারকেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গঠনের জন্যে বলতে পারেন। অনুরূপভাবে দেশের বিভিন্ন দ্বীনি সংগঠন ও ইসলামপ্রিয় শিক্ষিত জনগণের সংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ তৎপরতা গ্রহণের প্রয়োজনও অনস্বীকার্য। তবে মনে রাখা দরকার, যাকাতই দেশের দারিদ্র্য বিমোচন তথা সমাজ কল্যাণের একমাত্র হাতিয়ার নয়, অন্যতম হাতিয়ার মাত্র। শরয়ী এই ইবাদাতের পাশাপাশি সচেতন দেশবাসী ও রাষ্ট্রকে েএই উদ্দেশ্যে অন্যান্য উৎস ও পদ্ধতির যথাযথ ব্যবহারে আন্তরিক ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখাও অপরিহার্য।

পঞ্চমতঃ অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে ঐক্যজোটের সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন তারা ইসলামী মূল্যবোধ ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের বিশ্বাসী। কোটি কোটি তৌহিদী জনতার আশা-আকাঙ্খা পূরণ তারা তৎপর হবেন এই প্রত্যাশা দেশবাসীর। এই সরকার একটু উদ্যোগ নিলেই রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব। বিশেষতঃ এই খাত হতে প্রাপ্ত অর্থ দারিদ্র্য বিমোচন ও মানব সম্পদ উন্নয়ন তথা বৃহত্তর সমাজকল্যাণের কাজেই যেহেতু ব্যয়িত হবে সেহেতু এই কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিয়ে সরকারের সাথে আলোচনা করতে পারে। তৈরী করতে পারে একটা প্রকল্পপত্র এবং সেটি সরকারের অনুমোদনের জন্যে উপস্থাপিত হতে পারে।

তবে এ ব্যাপার বাধা আসবে ইসলামবিরোধীদের চাইতে তথাকথিত ইসলাম দরদীদের কাছ থেকে। এসব বাধা জয় করার দৃঢ় মানসকিতা থাকতে হবে। সুদান, পাকিস্তান প্রভৃতি বৃটিশশাসিত দেশের মুসলিম বুদ্ধিজীবিরাই সেসব দেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায় ও তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বৈরী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু জেনারেল জিয়াউল হকের মতো নেতারা তাদের কাছে মাথা নোয়ান নি। তাই ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী জনগণ সঙ্গতঃভাবেই আশা করতে পারে সরকার এ ব্যাপারে যথযোগ্য ভূমিকা রাখবেন এবং মুমিন মুসলিমের বহুদিনের অন্তরলালিত বাসনা পূরণে সমর্থ হবেন।

সরকারের যথোচিত উদ্যোগ, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন এবং কার্যকর ভূমিকা ও ‍সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বারো কোটি তৌহিদী জনতা অধ্যুষিত এই দেশে যারা সাহেবে নিসাব তারা সকলেই যদি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে নিয়মিত যাকাতের অর্থ পরিকল্পিতভাবে আল-কুরআনে উল্লেখিত খাতগুলো ব্যয়ের জন্যে উদ্যোগী হন তাহলে দেশে গরীব জনগণের ভাগ্যের চাকা যেমন ঘুরবে তেমনি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের পরিধি হবে আরও বিস্তৃত। এজন্যে প্রয়োজন আজ সদিচ্ছার, সুষ্ঠু পরিকল্পনার এবং দরিদ্র জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে প্রকৃতই দৃঢ় অভিলাষের।

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

4 × 4 =