পবিত্র লাইলাতুল কদরের ফযিলত ও আমল

0
37
কদরের ফযিলত

॥ মুহাম্মদ হাবিবুল্লাহ্ ॥ সকল প্রশংসা একমাত্র ঐ মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য, যিনি রমজানকে শ্রেষ্ঠ মাস বানিয়েছেন। এবং সে সময়ে ভালো কাজের প্রতিদান বাড়িয়ে দিয়েছেন। ছালাত ও ছালাম তার প্রিয় বন্ধু ও রাসুল হযরত মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওপর। যার ওপরে মানব জাতীর  সকল সমস্যার সমাধান, সৎকাজের দিক নির্দেশক মহাগ্রন্থ আল-কুরআন অবতির্ন হয়েছে। আর এই মহাগ্রন্থে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ
لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ
تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِم مِّن كُلِّ أَمْرٍ
سَلَامٌ هِيَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ
নিশ্চয়ই আমি এটিকে (আল-কুরআন) কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি। হে রাসুল! আপনি কি জানেন কদরের রাতটি কি? কদরের রাত হলো হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। ফেরেশতারা ও রূহ (হজরত জিবরাঈল আঃ) এই রাতে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সব সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতীর্ণ হয়; সেই রাতটি পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার ভোর হওয়া পর্যন্ত। -(সূরা আল-কদর)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবী রাদিয়াল্লাহু আনহুম এই মহিমান্বিত রাতকে উপলক্ষ করে বিশেষভাবে ইবাদাত-বন্দেগীর উদ্দেশ্যে ব্যাপক আয়োজন ও প্রস্তুতি নিয়েছেন। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ এ রাতের সন্ধানে তাঁরা পরিবারের সবাইকে নিয়ে মাহে রমজানের শেষ দশদিনে দুনিয়াবী সকল কাজ-কর্ম থেকে বিরতি নিয়ে বিভিন্ন ইবাদাতে মশগুল থাকতেন।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন। যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় রমজানে সিয়াম পালন করলো, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। আর যে কেউ ঈমানের সাথে এবং সওয়াবের আশায় কদরের রাতে (ইবাদাতে) দাঁড়ালো, তার পূর্বেকার সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। -(সহীহ আল-বুখারী)
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন। তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমজানের শেষ দশদিনের বেজোড় রাতে তালাশ করো। -(সহীহ আল-বুখারী)
হযরত আয়েশা (রাঃ) আরও বর্ণনা করেছেন, যখন (রমজানের) শেষ দশদিন এসে যেতো, তখন নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর পরনের কাপড় শক্ত করে বেঁধে নিতেন (অর্থাৎ দৃঢ়তার সাথে প্রস্তুতি নিতেন) রাত জাগতেন এবং পরিবারের লোকদেরকেও জাগিয়ে দিতেন। -(সহীহ আল-বুখারী)
হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে আরও বর্ণিত আছে, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) রমজানের শেষ দশ দিনে ইতেকাফে বসতেন যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁকে উঠিয়ে নিলেন। তারপর তাঁর স্ত্রীরাও (শেষ দশনে) ইতেকাফ করতেন। -(সহীহ আল-বুখারী)
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) প্রতি রমজানে দশদিন ইতেকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তাঁর ইনেÍকাল হলো, সে বছর তিনি বিশ দিন ইতেকাফ করেছিলেন। -(সহীহ আল-বুখারী)
লাইলাতুল কদরের সন্ধানে রমজানের শেষ দশ দিনে আমাদেও করণীয়ঃ
১. রমজানের শেষ দশ দিনে আল্লাহর উদ্দেশ্যে পার্থিব কাজকর্ম থেকে অবকাশ/ছুটি নেয়া। দশ দিন সম্ভব না হলে যতদিন পারা যায়।
২. ইবাদাতের পরিকল্পনা, পস্তুতি ও তা বাস্তবে রূপ দেয়া।
৩. পরিবারের সবাইকে নিয়ে এর গুরুত্ব আলোচনা করা ও তাদেরকেও এই বিশেষ ইবাদাতের অনুভূতি ও কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা।
৪. যে ক’দিন বা সময়ের জন্যই সম্ভব হয় পুরুষদের নিজ এলাকার মসজিদে এবং মহিলাদের নিজেদের ঘরে ইতেকাফ করার চেষ্টা করা।
নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে এক দিনের ইতেকাফের জন্য আল্লাহ তায়ালা ইতেকাফকারী এবং জাহান্নামের আগুনের মাঝখানে এমন তিনটি খাদকে সম্প্রসারিত করেন, যাদের প্রত্যেকটির বিস্তৃতি আসমান ও যমীনের দূরত্বের চেয়েও প্রশস্ত। -(মুসনাদে আহমাদ)
৫. বেশী-বেশী কুরআন তিলাওয়াত করা। বিশেষ করে সালাতে আমরা যেসব সূরা বা আয়াত পড়ে থাকি সেগুলোর অর্থসহ মর্মার্থ জানার চেষ্টা করা। এটি সালাতে মনোযোগী হতে সাহায্য করে।
৬. বেশী করে সালাত আদায় করা। মসজিদে জামাআতে নিয়মিত ফরয ও তারাবীহ আদায়ের পাশাপাশি বেশী করে নফল সালাত আদায় করা। এক্ষেত্রে তাহিয়াতুল ওয়াজু, দুখুলুল মাসজিদ, তাহাজ্জুদ ও সালাতুত তাসবিহ আদায়ের জোর চেষ্টা করা।
৭. যিকির, তওবা ও ইস্তেগ্ফার করা। এলক্ষ্যে সঠিক পদ্ধতিতে আল্লাহকে বেশী করে স্মরণ করা, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর প্রতি দরুদ শরীফ পাঠ এবং আমাদেও কৃত অপরাধগুলোর জন্য আল্লাহর কাছে তওবা করা।
৮. বেশী করে দু’আ করা। নিজের এবং উম্মাহর যত অভাব, যত সংকট রয়েছে সব কিছুর জন্য এবং আখিরাতে মুক্তির জন্য বিশেষ করে কুরআনে বর্ণিত দু’আ গুলো করার চেষ্টা করা। রমজান দু’আ কবুলের সময়।
হযরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তাহলে আমি কি দু’আ করবো? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জবাব দিলেন, ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফু’ঊন তুহিব্বুল আফ্ওয়া ফা’আফু আন্না’ (হে আল্লাহ! তুমিই অপরাধ ক্ষমা করো, আর ক্ষমা করাকে তুমি খুবই পছন্দ করো, কাজেই তুমি আমাকে মাফ করে দাও)। -(মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, আল-জামে আত-তিরমিযী)
৯. আল্লাহর কাছ থেকে পাওয়ার জন্য নিজের প্রয়োজনীয় সাহায্যে চাওয়ার তালিকা তৈরি করা। আত্ম-সমালোচনা ও বিশ্লেষণ করে নিজেকে জিজ্ঞেস করা, সত্যিই আমি আল্লাহর কাছে কি চাই। তা ছোট-বড় যাই হোক, দুনিয়া ও আখিরাতের যে কোনো ব্যাপারেই সংশ্লিষ্ট হোক। মহান আল্লাহ তায়ালা আমাদের পক্ষ থেকে তাঁর কাছে চাওয়াকে খুবই পছন্দ করেন। তালিকা তৈরি হয়ে গেলে সেগুলো সালাত আদায়ের সময় সিজদাহরত অবস্থায় বিনয় ও কাকুতি-মিনতির সাথে তাঁর কাছে বারবার চাওয়া।

পবিত্র লাইলাতুল কদরের ফযিলত ও আমল

১০. দু’আ কবুলের শ্রেষ্ঠ সময় হলো শেষ রাত।
হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, যখন রাতের তিন ভাগের একভাগ বাকী থাকে তখন আল্লাহ সুবহানাহূ ওয়াতা’লা আসমান (তাঁর আরশ) থেকে পৃথিবীর প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, ‘কে আমার কাছে প্রার্থনা কওে; আমি তার প্রার্থনা কবুল করবো,  কে আমার কাছে সাহায্য চায়; আমি তাকে সাহায্য করবো, কে আমার কাছে ক্ষমা চায়; আমি তাকে মাফ করে দিবো’। -(সহীহ আল-বুখারী ও সহীহ মুসলিম)
১১. রাতে একটানা একইভাবে ইবাদাত না করে বিরতি নিয়ে বিভিন্ন রকমের ইবাদাতে সময় কাটানো যেতে পারে। এতে ইবাদাতে বেশী করে মনোযোগ ও তৃপ্তি লাভ করা যায়।
১২. বেশী-বেশী রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর ওপরে দরুদ ও ছালাতুছালাম পাঠ করা।
দয়াময় আল্লাহ আমাদেরকে এই রমজানে আমাদের সবার জীবনের সব গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিন, আমরা যেন নিষ্পাপের মতো ঈদের সালাতে সবাই এ অবস্থায় হাজিরা দিতে পারি যে, ‘তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট, আর আমরাও তার প্রতি’। আমীন! ছুম্মা আমিন!!

আরও পড়ুনঃ   বাক-সংযমে রোযার ভূমিকা

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × one =