পাপ থেকে বেঁচে আল্লাহ পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম ‘ইতিকাফ’

0
26
ইতিকাফ

এম সাইফুল ইসলাম নেজামী:

এই নিবন্ধটি যখন লিখতে বসছি তখন নাজাতের একদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ব্যস্ততার দরুন ঠিক সময়ে লেখাটি উপহার দিতে না পেরে নিবন্ধের শুরুতেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। প্রিয় রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অমিয় বাণীর মাধ্যমে শুরু করা যাক। সৈয়দুল মুরসালিন রহমতুলল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (দ.) এরাশাদ করেন, “রমজান মাসের প্রথম দশদিন হলো রহমত (দয়া), মাঝের দশদিন হলো মাগফিরাত (ক্ষমা), শেষের দশদিন হলো নাজাত (মুক্তি)।”
আমরা যেহেতু নাজাতের দশকে অবস্থান করছি তাই আমাদের আলোচনাও নাজাত নিয়ে। চলুন নাজাতের ব্যাপারে বিস্তারিত ধারণা নিয়ে,
আভিধানিক দৃষ্টিকোণ হতে নাজাত শব্দের অর্থ হলো মুক্ত, মুক্তি দেওয়া, মুক্তি পাওয়া, মুক্ত হওয়া, ছাড়া পাওয়া, ইত্যাদি। নাজাত শব্দের শাব্দিক অর্থ মুক্তি হলেও রমজানের শেষ দশকের নাজাত মানে হচ্ছে: মানুষ পাপ পংকিলতা হতে মুক্ত হবে। জাহান্নামের ভয়ঙ্কর আজাব হতে নিজেকে সরিয়ে রাখবে। সব ধরণের পাপের সংস্পর্শ হতে নিজে দূরে থাকবে। অতীতের গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হয়ে মওলায়ে খায়েনাতের কাছে ক্ষমাপ্রার্থণা পূর্বক মুক্তির আরজি জানানোর নামই নাজাত। মোহমুক্তির অন্যতম উপায় হচ্ছে নিজেকে পাপ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। আর ইতিকাফ হচ্ছে পাপ পংকিলতা হতে দূরে রাখার চমৎকার মাধ্যম। এতে বান্দা দুনিয়ার সব মোহ-মায়া থেকে মুক্ত হয়ে একাগ্রচিত্তে মওলায়ে হাকিকির সান্নিধ্যে চলে যায়।
হাদিসের দৃষ্টিতে ইতিকাফ।
রাসূলে পাক (দ.) এরাশদ করেন- “ইতিকাফকারী গুনাহ্ থেকে বিরত থাকে এবং নেক আমল দ্বারা এত অধিক পরিমাণে সাওয়াব হাসিল করে যেন সে সকল নেক আমল সম্পন্ন করলো।” (ইবনে মাজাহ্)।
উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দিকা (র.) বলেন,
“রাসূলে পাক (দ.) মাহে রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করতেন।” (বুখারী ও মুসলিম)।
উপরোক্ত হাদিসের আলোকে এটাই দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, ইতিকাফ একটি উত্তম ইবাদত। এর বদৌলতে গুনাহ্ থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত থাকার সৌভাগ্য নসীব হয় এবং দুনিয়ায় থেকে দুনিয়াবিমুখ জীবন যাপনের একটি সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়।
চলুন ইতিকাফের সাথে পরিচিত হয়।
শাব্দিক অর্থে ইতিকাফ অর্থ হলো অবস্থান করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, মসজিদে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দ্যেশ্যে নিয়ত সহকারে অবস্থান করার নাম ইতিকাফ।
ইসলামী আইন প্রণেতাদের মতে ইতিকাফ তিন প্রকার।
ক. ওয়াজিব তথা মান্নতের ইতিকাফ।
খ. সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ তথা মাহে রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ আলাল কেফায়াহ।
গ. মুস্তাহাব তথা যেকোন সময় মসজিদে প্রবেশকালে ইতিকাফের নিয়ত করে ঢুকে অবস্থানকাল পর্যন্ত ইতিকাফ।
এই নিবন্ধে আমাদের আলোচনা সুন্নাত ইতিকাফ নিয়ে কারণ তা রমজানের সাথে সংশ্লিষ্ট। চলুন সবিস্তারে সুন্নাত ইতিকাফ সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।
মাহে রমজানের শেষ দশ দিন মহল্লাবাসী থেকে যে কোন একজন ইবাদতের নিয়তে শবে ক্বদর তালাশের লক্ষ্যে রমজানের রোজাসহ মসজিদে অবস্থান করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ আলাল কেফায়া। মহল্লা হতে যদি কেউ ইতিকাফ পালন না করে, তবে সবাই গুনাহগার হবে। যে কোন একজন পালন করলে সবাই দায়মুক্ত হবে।
ইতিকাফকারী বিশ রমজানের সূর্যাস্তের পূর্বে মসজিদে প্রবেশ করে ত্রিশ রমজান সূর্যাস্তের পর বা ঊনত্রিশ রমজান চাঁদ উদয়ের সঠিক খবর নিশ্চিতের পর মসজিদ হতে বের হবে। কোন ব্যাক্তি বিশ রমজান সূর্যাস্তের আগে নিয়্যত করল কিন্তু মসজিদে প্রবেশ করলোনা অথবা কেউ ৩০ রমজান সূর্যাস্তের আগে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল তাদের সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ্ আদায় হবেনা।
মাহিলারা মসজিদে ইতিকাফ করা মাকরূহ। তাদের জন্যও রমজানের শেষ দশদিন ইতিকাফ পালন করা সুন্নাত। ইতিকাফ শুদ্ধ হওয়ার জন্য মুসলমান বিবেক সম্পন্ন এবং নারীর ক্ষেত্রে হায়েস ও নেফাস থেকে মুক্ত হওয়া বাঞ্চনীয়।
ইতিকাফের জন্য জুমা মসজিদ শর্ত নয়। যে কোন মসজিদে ইতিকাফ যায়েয। ইতিকাফ অবস্থায় বিনা অযুহাতে মসজিদ থেকে এবং মহিলাদের বেলায় নির্ধারিত কামরা থেকে বের হওয়া সম্পূর্ণ রূপে হারাম।
ইতিকাফকারি গোসল, পায়খানা, প্রস্রাব, অযু, জুমার নামাজের জন্য (যদি এটা জুমা মসজিদ না হয়) এবং আজানের জন্য বের হওয়ার অনুমতি রয়েছে।
অন্য কোন কারণে, যেমন পানাহারের জন্য, এমনকি জানাযার নামাজের জন্যও ইতিকাফকারী বের হওয়া যায়েজ নেই। ইতিকাফ অবস্থায় স্ত্রীকে স্পর্শ করাও নিষিদ্ধ। সহবাসের কারণে ইতিকাফ নষ্ট হয়ে যায়।
ইতিকাফকারী যেন একেবারে চুপচাপ না থাকে এবং দুনিয়াবী কথাবার্তাও না বলে, বরং ইতিকাফ অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, ধর্মীয় কিতাব, নবী ওলীর জীবনী পাঠ করা শ্রেয়।
ইতিকাফ ভঙ্গ করলে অথবা শরীয়ত সমর্থিত প্রয়োজন ছাড়া ইতিকাফকারী মসজিদ হতে বের হলে অথবা ভুলবশত মসজিদ হতে বের হলে মাহে রমজানের শেষে মসজিদে অন্য যে কোন মাসে রোজাসহ সেই দিনের ইতিকাফের ক্বাযা আদায় করবে। একইভাবে যতদিন রমজানের ইতিকাফ ভঙ্গ করবে বা হবে, ততদিন রমজানের পরে রোজাসহ ইতিকাফ ক্বাযা আদায় করবে। সম্পূর্ণ দশদিনের ক্বাযা ওয়াজিব নয় এবং পরের রমজানেও ক্বাযা করা জরুরী নয়। যে কোন মাসে ক্বাযা আদায় করা যায়।
পরিশেষে ইমাম আলী মক্বাম ইমাম হুসাইন (র.)’র বর্ণিত একটি হাদিসের মাধ্যমে এই নিবন্ধের ইতি টানছি। তিনি ফরমান, রাসূলে খোদা (দ.) এরশাদ করেন, “যে ব্যক্তি মাহে রমজান শরীফের দশদিন ইতিকাফ করবে সে দু’টি হজ্জ্ব ও দু’টি ওমরাহ পালনকারীর সমপরিমাণ সাওয়াব লাভ করবে।” ( বায়হাকী)
আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত আমাদেরকে রমজানের পরিপূর্ণ হাকিকত অনুধাবনের পাশাপাশি ইতিকাফকারী সৌভাগ্যবানদের কল্যাণে হাজারো মাসের চেয়েও দামী লাইলাতুল ক্বদর যেন আমাদের নসীব করেন। হে আল্লাহ আপনার প্রিয় হাবিবের (দ.) উসিলায় বার আউলিয়ার পুণ্যভূমি চাটিগাঁ শরীফকে আপনি সমস্ত আজাব, গজব, অকল্যাণ থেকে মুক্ত করুন। (আমিন)
.
রেফারেন্স :
বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ,বায়হাকী শরীফ,
ইবনে মাজাহ শরীফ, ফতোয়ায়ে আলমগীরী,
দুররে মুখতারান, গাউসিযা তরবিয়াতী নেসাব,
মাসিক তরজুমান।
.
লেখক
এম সাইফুল ইসলাম নেজামী
এম.এ (ইসলামিক স্টাডিজ)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুনঃ   খোদার রাহে সংযম-এম সাইফুল ইসলাম নেজামী

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

11 − 1 =