ব্যবসা সর্বোত্তম ইবাদত

0
14
ব্যবসা সর্বোত্তম ইবাদত

আল্লাহ সোবহানাহু তায়ালা ব্যবসাকে হালাল করেছেন। রাসূল সা: বলেছেনÑ মানুষ নিজ হাতে হালাল ব্যবসায়ের মাধ্যমে যা উপার্জন করে তা-ই সবচেয়ে পবিত্র। রাসূল সা: আরো বলেছেনÑ ইবাদত কবুলের শর্ত হচ্ছে হালার রিজিক। আমরা এই হালাল রিজিক আর পবিত্র উপার্জনকে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির অভাবে হারাম বা অপবিত্র করে ফেলি।
বছর ঘুরে প্রতিবারই আসে মাহে রমজানের সিয়াম, আর হু হু করে বৃদ্ধি পায় নিত্যপণ্যের দাম! যা কিনা রমজান ও সিয়ামের উদ্দেশ্যের বিপরীত।
ব্যবসা হালাল : সূরা বাকারার ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আল-আমিন ঘোষণা করেছেন, আর আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন। সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, কেবল তোমাদের (ক্রেতা-বিক্রেতার) পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।
ব্যবসা হালাল হওয়ার শর্ত হচ্ছে, ক্রেতা ও বিক্রেতা পরস্পরের মধ্যে মুনাফার বা সেবার সমান বিনিময়। অর্থাৎ বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে অধিক মুনাফা গ্রহণ করবে না। কারণ বিক্রেতার কাছ থেকে একটি পণ্য কিনে ক্রেতা তা থেকে মুনাফা বা সেবা গ্রহণ করে। অন্য দিকে ক্রেতার জন্য ওই পণ্যটি জোগাড় করতে বিক্রেতা নিজের যে অর্থ, বুদ্ধি, শ্রম ও সময় ব্যয় করে তার মূল্য গ্রহণ করে। বিক্রেতা ক্রেতার কাছ থেকে পণ্যের মূল্য বাবদ ব্যয় করা অর্থ তার সাথে বুদ্ধি, শ্রম ও সময়ের একটা মূল্য গ্রহণ করতে পারে আর সেটা হতে হবে ইনসাফ ও ইহসানের ভিত্তিতে পরস্পরের সম্মতিক্রমে। এ ক্ষেত্রে ইনসাফ ও ইহসানের ব্যত্যয় হলে হালাল ব্যবসা আর হালাল থাকে না। ইনসাফ আর ইহসান অবশ্যই তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতির সাথে সম্পৃক্ত।
ব্যবসা হারাম : সূরা নিসার ২৯ নম্বর আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী, (হে ঈমানদারগণ তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করো না, কেবল তোমাদের (ক্রেতা-বিক্রেতার) পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তা বৈধ।) অন্যায় ও অবৈধভাবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করে ভোক্তার কাছ থেকে অধিক মূল্য গ্রহণ করারই হচ্ছে সে ভোক্তার সম্পদ অবৈধভাবে ভক্ষণ করা। এটা ব্যবসায়ের জন্য হারাম। সূরা মোতাফফিফিনের ১-৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘ধবংস তাদের জন্য যারা (অধিক মুনাফার জন্য) মাপে কম দেয়। তাদের অবস্থা এই যে, লোকদের থেকে নেয়ার সময় পুরোমাত্রায় নেয় এবং ওজন করে বা মেপে দেয়ার সময় কম দেয়।’
ব্যবসা সর্বোত্তম ইবাদত : সূরা নুরের ৩৭ আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘যারা ব্যবসায় ও বেচাকেনার ব্যস্ততার মধ্যেও আল্লাহর স্মরণ এবং সালাত কায়েম ও জাকাত আদায় করা থেকে গাফিল হয় না, তারা সেদিনকে ভয় করতে থাকে যেদিন হৃদয় বিপর্যস্ত ও দৃষ্টি পাথর হয়ে যাওয়ার উপক্রম হবে।’ সূরা জুম’আর ৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদাগণ, জুমা’র দিন যখন তোমাদের সালাতের জন্য ডাকা হয়, তখন আল্লাহর জিকিরের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা ছেড়ে দাও, এটাই তোমাদের জন্য বেশি ভালো যদি তোমরা বুঝো। তারপর যখন সালাত শেষ হয়ে যায় তখন ভূপৃষ্ঠে ছড়িয়ে পড়ো এবং আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ করো এবং অধিক মাত্রায় আল্লাহকে স্মরণ করতে থাকো, আশা করা যায় তোমরা সফলকাম হবে।’
তাকওয়াহ অর্জনের জন্য সিয়াম : সিয়াম ফরজ করার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সূরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করছেন, ‘হে ঈমানদাগণ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করে দেয়া হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীগণের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, এ থেকে আশা করা যায় যে, তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার বা আল্লাহভীতির গুণাবলি সৃষ্টি হবে।’
‘সিয়াম’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, বিরত থাকা, পরিত্যাগ করা বা অসৎ প্রবৃত্তিকে দমন করা। সিয়াম পালনের মাধ্যমে আল্লাহ সোবহানাহু ওয়া তায়ালা সাধারণত নিষিদ্ধ বস্তু, কাজ, কথা ও অসৎ প্রবৃত্তি থেকেই বিরত থাকতে নির্দেশ করছেন। সিয়ামের কাজ হচ্ছে মানুষের মধ্যে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা। সিয়াম পালনের মাধ্যমে আমরা যদি আল্লাহর ভয়ে নিষিদ্ধ বস্তু, কাজ, কথা ও অসৎ প্রবৃত্তি থেকেই বিরত থাকতে না পারি তাহলে বুঝতে হবে, রমজানের সিয়াম আমার কোনো কাজে আসেনি। অথচ জিবরাইল আ: রমজানের কোনো এক জুমা’য় দোয়া করছিলেন, হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি রমজান মাস পেল, কিন্তু তার গুনাহ থেকে ক্ষমা পেল না, সে ধ্বংস হোক। রাসূল সা: বলছিলেন, আমিন।’ এমন দোয়া তো ব্যর্থ হওয়ার কথা নয়। অতএব, রমজানের সিয়ামের ফজিলত হাসিল করতে হলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সব নিষিদ্ধ কাজ থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। আল্লাহর বান্দাদের কোনোভাবেই কষ্টে ফেলা যাবে না, ধোঁকা দেয়া যাবে না, প্রতারণা করা যাবে না, কোনোভাবেই ঠকানো যাবে না।
অধিক মুনাফার জন্য মূল্য বৃদ্ধি অনৈতিক : আমাদের দেশে সাধারণত প্রতি বছরই রমজান মাস এলে বা সিয়াম শুরু হলে বা তার আগ থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে হু হু করে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে। সিয়াম যেখানে অসৎ প্রবৃত্তিকে দমন করা কথা সেখানে রমজান মাসে (যে সময় জিন শয়তানকে বন্দী করে রাখা হয়) মানুষ শয়তানের কারণে আর অসৎ প্রবৃত্তির বসে অধিক মুনাফার উদ্দেশে বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করছি। এটা তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতির বিপরীত নয় কি?
সূরা নাহলের ১২৮ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘আল্লাহ তো তাদের সঙ্গে রয়েছেন যারা তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতির সাথে কাজ করে এবং মুহসিনিন বা ইহসানের পথ অবলম্বন করে।’ রমজান মাসে বিভিন্ন অজুহাতে অধিক মুনাফা করা যেমন তাকওয়ার পরিপন্থী, তেমনি মুহসিনিন বা ইহসানেরও সম্পূর্ণ বিপরীত কাজ। রমজান মাসে আমাদের অসৎ প্রবৃত্তির কারণে অধিক মুনাফার উদ্দেশে বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করছি, এটা সিয়াম পালনকারীদের প্রতি ইহসান করার পরিবর্তে কি জুুলুম করছি না? আল্লাহর তায়ালার পক্ষ থেকে সিয়াম পালনের মাধ্যমে ক্ষমা প্রাপ্তির পরিবর্তে রমজান মাস উপলক্ষে অসৎ প্রবৃত্তিকে কাজে লাগিয়ে অধিক মুনাফার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে সিয়ামপালনকারীদের প্রতি জুলুম করছি, পক্ষান্তরে নিজেদের ওপরই জুুলুম করছি। এ জুলুমের কারণে কি আমরা আল্লাহর আজাব বা শাস্তি পাওয়ার ব্যবস্থা করছি না?
অধিক মুনাফা তাকওয়াহ পরিপন্থী : সূরা শুরার ১২ নম্বর আয়াতের ঘোষণা অনুযায়ী, ‘সকলের রিজিক নির্ধারিত করা আছে’। অতএব, কেউ চাইলেই যেকোনোভাবে তার রিজিক বা অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি করতে পারবে না। অধিক মুনাফার আশায় অসৎ প্রবৃত্তির বশে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে অধিক অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করা অনৈতিক। সিয়ামের উদ্দেশ্য হচ্ছেÑ তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। রমজান মাসে অসৎ প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ না করে অধিক অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজের ও ভোক্তার প্রতি জুলুম করা হয়। ‘হজরত ইবনে মাসউদ রা: থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সা: বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত রিজিক (অর্থ-সম্পদ) পূর্ণমাত্রায় লাভ না করা পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিই মৃত্যুবরণ করবে না। সাবধান! আল্লাহকে ভয় করো, আর বৈধ পন্থায় আয় উপর্জনের চেষ্টা করো। রিজিক প্রাপ্তিতে বিলম্ব যেন তোমাদের অবৈধ পন্থা অবলম্বনে প্ররোচিত না করে। কেন না, আল্লাহর কাছে যা কিছু রয়েছে তা কেবল আল্লাহর আনুগত্যের মাধ্যমে লাভ করা যায়’ (ইবনে মা’জা)।
রিজিক বলতে অর্থ-সম্পদ বা ধন-দৌলত, টাকা-পয়সা, দ্রব্যসামগ্রী বা যার মাধ্যমে আমরা জীবনের সামগ্রীক চাহিদা মিটিয়ে থাকি। আসলে কোনো কিছুতেই মানুষের চাহিদা মিটে না। মানুষের যার যতো আছে তার আরো চাই। মানুষের চাহিদার শেষ নাই। এটাই মানুষের স্বভাব। আপনি ব্যবসা করছেন, অধিক মুনাফার জন্য ভাইকে ঠকাচ্ছেন! আপনি ভাইকে ঠকিয়ে সম্পদশালী হচ্ছেন আর আপনার ভাই নিঃস্ব হচ্ছে। আপনি কিভাবে মুসলিম হবেন? আগে তো ঈমানদার হতে হবে। ভাবেন তো আপনি কি ঈমানদার হতে পেরেছেন ?
ব্যবসায়ে আনন্দ উৎসবে মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে পার্থক্য : আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের বেশির ভাগ জনগণ হিন্দু। তাদের বিভিন্ন আনন্দ উৎসব বা পূজা পার্বণে বিশেষ করে, দুর্গাপূজা, রথযাত্রা বা দিপাবলি ইত্যাদিতে সে দেশের ব্যবসায়ীরা কখনোই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করে না বরং সব দ্রব্যসামগ্রীর ওপর ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেয়। সারা বিশে^ ২৫ ডিসেম্বর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বড়দিন বা ক্রিসমাস ডে উপলক্ষে আমেরিকা, ব্রিটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ উন্নত দেশগুলোর ব্যবসায়ীরা দ্রব্যমূল্যে ছাড় দেয় সে সব দেশের সরকার ও এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতাসহ আইনেও সিথিলতা প্রদর্শন করে, এমনকি তাদের আনন্দ উৎসবে যোগদানের জন্য বিদেশীদের ভিসা প্রদানেও সহজ করে থাকে। যে কাজটা মুসলমানরা সিয়াম ও ঈদ উপলক্ষে করার কথা সে কাজটা আজ অমুসলিমরা করছে, যা বলতেও লজ্জার ব্যাপার। তারপরও মুসলমান হিসেবে আমাদের কোনো বোধোদয় হচ্ছে না। আর এটা হচ্ছে তাকওয়াহ বা আল্লাহভীতির অভাবে।
৯৫ শতাংশ মুসলমানের দেশে ব্যবসায়ীদের অসৎ প্রবৃত্তির কারণে অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশে বিভিন্ন অজুহাতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে রমজানের সিয়াম শেষে ঈদ বা মুসলমানদের জীবনে সবচাইতে বড় আনন্দ উৎসবেও ভাটা পড়ে যায়। বিশেষ করে ঈদের মতো আনন্দ উৎসবে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীই বঞ্চিত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশের ব্যবসায়ীরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল আর সে সব দেশে আইনের শাসনও আছে, ফলে কখনোই কোনো উৎসব বা উপলক্ষে বিশেষ করে সিয়াম ও ঈদকে কেন্দ্র করে রাতারাতি হু হু করে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেতে দেখা যায় না। অর্থনীতির সংজ্ঞানুযায়ী চাহিদা আর সরবরাহ ঠিক থাকলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার কথা নয়। আমাদের দেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কৃত্রিম সরবরাহ সঙ্কট দেখিয়ে অনেক সময় মূল্য বৃদ্ধি করা হয়, যা সরকারের উচিত নিয়ন্ত্রণ করা।
লেখক : প্রবন্ধকার

আরও পড়ুনঃ   ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা

গাজী মুহাম্মদ শওকত আলী

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

2 × four =