মগের মুলুকে মানবতার অবমাননা

0
12
মানবতার অবমাননা

পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত সংখ্যালঘু জাতির নাম রোহিঙ্গা। তাদের কোনো দেশ নেই, ভূমি নেই ও বন্ধু নেই। ঠিকানার খোঁজে গন্তব্যহীন পথে অবিরত হাঁটছে তারা। কোথাও ঠাঁই মেলে না।

মগের মুলুক
ছবি : হিন্দুস্তান টাইমস

ইসলাম ও আরাকান

রোহিঙ্গা ইতিহাসবিদদের মতে, আরবি শব্দ ‘রহম’ (দয়া করা) থেকে রোহিঙ্গা শব্দের উদ্ভব। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতাব্দীতে আরবের বাণিজ্য জাহাজ রামব্রি দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় মুসলমানরা ভাসতে ভাসতে কূলে ভিড়লে ‘রহম’ ‘রহম’ ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে।   একজন ইসরায়েলি লেখক Moshe Yegar তাঁর ‘Between Integration and Secession : The Muslim Communities of the Southern Philippines, Southern Thailand and Western Burma/Myanmar’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসলমানরা বার্মায় তাদের বসতি স্থাপনের প্রথম থেকেই রাজকীয় উপদেষ্টা, প্রশাসক, বন্দর কর্তৃপক্ষ, মেয়র, স্থানীয় চিকিৎসকসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছে।

আরাকানের মুসলিম ঐতিহ্যের রয়েছে এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। সর্বপ্রথম হজরত আবু ওয়াক্কাস ইবনে ওয়াইব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় (৬১৭-৬২৭ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে) আরাকান অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে আসেন। ওমর ইবনে আবদুল আজিজের (রহ.) শাসনামলে আরাকানের শাসকদের সঙ্গে আরবীয় মুসলমানদের যোগাযোগের বিষয়টিও প্রমাণিত। তবে দশম ও একাদশ শতাব্দীতে আরব বণিক ও সুফি-সাধকদের ব্যাপক আগমনের ফলে আরাকান অঞ্চলে দ্রুত ইসলামের প্রচার হতে থাকে। তাই বলা যায়, মিয়ানমারে মুসলমানদের ইতিহাস প্রায় ১২০০ বছরের পুরনো। গত সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে আরাকানের বৌদ্ধ রাজা বিদ্রোহীদের দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হলে তাঁর অনুরোধে গৌড়ের সুলতান কয়েক দফায় সেখানে সেনাবাহিনী প্রেরণ করেন।

১৪৩২ সালে গৌড়ের সেনাপতি সিন্দি খান আরাকানের প্রাচীন রাজধানী ম্রোহংয়ে মসজিদ নির্মাণ করেন। ওই সময় থেকেই বৃহত্তর চট্টগ্রাম ও স্বাধীন আরাকান রাজ্যের জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে আরাকানে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং রাজসভায় বাংলা ভাষা বিশেষ স্থান লাভ করে। মহাকবি আলাওল, শাহ মুহম্মদ সগির ও মাগন ঠাকুরের মতো মধ্যযুগের বিখ্যাত কবিরা আরাকান রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন।

মগের মুলুকের সেকাল-একাল

‘মগের মুলুক’ বাংলাদেশে একটি সুপরিচিত বাগধারা। বাংলা একাডেমি এর অর্থ লিখেছে—১. ব্রহ্মদেশ বা আরাকান রাজ্য। ২. অরাজক রাষ্ট্র, যে রাজ্যে আইনের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, যেখানে যথেচ্ছাচার হয়। বার্মিজরা ঐতিহাসিকভাবেই বর্বর, নিষ্ঠুর। মানুষের গলায় দড়ি বাঁধা, হত্যা, ধর্ষণ, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া রাখাইনদের পুরনো অভ্যাস। ‘ইস্ট ইন্ডিয়া ক্রোনিকলস’-এর বর্ণনায় জানা যায়, ১৭১৮ সালে বার্মার রাখাইন রাজা দক্ষিণবঙ্গ তছনছ করে অন্তত এক হাজার ৮০০ জন সাধারণ অধিবাসীকে ধরে নিয়ে যান। বন্দিদের রাজার সামনে হাজির করা হলে রাখাইন রাজা সেখান থেকে বেছে বেছে এক দলকে তাঁর নিজের দাস বানান, আর অবশিষ্টদের গলায় দড়ি বেঁধে ক্রীতদাস হিসেবে বাজারে বিক্রি করে দেন। মগের মুলুক বলতে জোর যার মুলুক তার। এ বাগধারা মিয়ানমারের মগদের বর্বরতা ও দস্যুপনা থেকেই এসেছে।

সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথমাংশে তখনকার বাংলা বা বঙ্গদেশ খুব সমৃদ্ধ ছিল। ওই সময় দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ‘মগ’ জাতির দস্যুরা বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে খুব লুটপাট ও ডাকাতি করত। বর্তমানে যারা রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর আক্রমণ করছে, তাদের বলা হচ্ছে রাখাইন উপজাতি। এ রাখাইন উপজাতির আগের নাম মগ। সেই মগরাই ৪০০ বছর আগেও অত্যাচার ও লুটপাট চালাত। তখনকার আমলের মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী দিল্লি থেকে নিযুক্ত, তৎকালীন বাংলা-প্রদেশের রাজধানী ঢাকায় অবস্থানকারী শাসনকর্তা বা সুবেদার, পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। মগরা যা ইচ্ছা তাই করেছিল। অর্থাৎ তখন সরকার ছিল না, মোগলদের পরিবর্তে দেশের মালিক হয়ে গিয়েছিল মগ দস্যুরা। মুলুক শব্দটির অর্থ দেশ বা এলাকা ইত্যাদি।   পর্তুগিজ নৌ-দস্যুদের সঙ্গে যখন আরাকানি বৌদ্ধরা হাত মিলিয়ে বাংলার উপকূলীয় এলাকায় সম্ভ্রমহরণ-লুণ্ঠন-হত্যার মতো জঘন্য কর্মে লিপ্ত হয় তখন থেকেই ‘মগ’ ও ‘মগের মুলুক’ জাতি ও দেশবাচক শব্দ দুটি অরাজকতার নামান্তররূপে ব্যবহৃত হতে থাকে। (তথ্যসূত্র : বঙ্গে মগ-ফিরিঙ্গি ও বর্গির অত্যাচার, মুহম্মদ আবদুল জলিল, বাংলা একাডেমি, পৃষ্ঠা ২৫)

বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগদের সাম্প্রতিক হত্যাযজ্ঞ তাদের পুরনো ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে।

মুসলিম নির্যাতনের ইতিহাস

রোহিঙ্গারা সর্বপ্রথম জুলুমের শিকার হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। বার্মার খ্রিস্টান রাজা সে সময় আরাকান দখল করে নেন। এরপর রোহিঙ্গারা বড় ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ১৯৪২ সালে, যখন জাপান বার্মা দখল করে নেয়। এসব নির্যাতনের সব মাত্রা ছাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৬২ সালে, সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের পর থেকে। নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করে ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের ফলে। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর বাতিল হয়ে যায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। তখন থেকে মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারও অচল হয়ে পড়ে।

১৯৪২ সালে জাপান বার্মা দখল করার পর স্থানীয় মগরা জাপানি সৈন্যদের সহায়তা নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইতিহাসে এটি ১৯৪২ সালের গণহত্যা নামে খ্যাত। তখন লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয় স্বাধীনতা-উত্তর ১৯৪৭ সালের শাসনতান্ত্রিক নির্বাচনে ইংরেজদের দেওয়া ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ অভিধার কারণে মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। উ ন নামক শাসক আরাকান থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ সালে মগ সেনাদের নিয়ে Burma Territorial Force গঠন করে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বুদ্ধিজীবী, গ্রামপ্রধান, আলেম-ওলামা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, আর সেখানে মগদের জন্য বসতি নির্মাণ করা হয়। ১৯৬২ সালের ২ মার্চ উ নকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর নে উইন সংখ্যালঘুদের সব সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করে দেন। ১৯৬৪ সালে রোহিঙ্গাদের সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৬৫ সালের অক্টোবর থেকে Burma Broadcasting Service থেকে প্রচারিত রোহিঙ্গা ভাষার সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বার্মা সরকার ১৯৭৩ সালে উত্তর আরাকানে Major Aung Than operation ও ১৯৭৪ সালে Sabe operation নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান চালায়। ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবন রক্ষার্থে যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে এসে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ করে। সে সময় তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় অবস্থান ও চরমপত্রের কারণে বার্মা সরকার বিতাড়িতদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়। তারপর তিন বছর যেতে না যেতেই সামরিক জান্তা ‘কিং ড্রাগন অপারেশন’ নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে ভয়াবহ অভিযান শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৯০ এবং ২০১২ সালে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে বর্বরতম অভিযান পরিচালনা করে বার্মার সামরিক জান্তা। শতাব্দীকাল ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলা নির্মম নির্যাতনের বিষয়টি এখন গোটা বিশ্বের সামনে পরিষ্কার। এটাও স্পষ্ট যে শুধু মুসলমান হওয়ার কারণেই তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হচ্ছে।

আরও পড়ুনঃ   মুহাম্মাদ (সাঃ) আগমণের ভবিষ্যৎবাণীওয়ালা হাতে লেখা পুরাতন বাইবেল উদ্ধার!

জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সব মিয়ানমার সরকারই মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গাদের সার্বিক বিনাশের খেলায় মত্ত। রোহিঙ্গারা পৃথিবীর অন্যতম রাষ্ট্রবিহীন মানুষ। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরনের অপরাধকে বৈধতা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই সেখানে মানা হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী, কিন্তু এ ব্যাপারে তারা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি।

রোহিঙ্গা কারা?

রোহিঙ্গারা পশ্চিম মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটের উত্তরাংশে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী। এদের বেশির ভাগই মুসলমান। রাখাইন স্টেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হলো রোহিঙ্গা। সংখ্যায় প্রায় ২০ লাখ। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও উগ্র রাখাইনদের সাম্প্রদায়িক আক্রমণের শিকার হয়ে প্রায় ১০ লাখের মতো রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশ, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়। প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানিদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তী সময়ে চাটগাঁইয়া, রাখাইন, আরাকানি, বার্মিজ, বাঙালি, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষের মিশ্রণে এই জাতি ত্রয়োদশ-চতুর্দশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

রোহিঙ্গাদের বসবাসস্থল রাখাইন রাজ্য। এর আদি নাম আরাকান। এ নামকরণ প্রমাণ করে মুসলিম ঐতিহ্যের কথা। কারণ ইসলামের পাঁচটি মূল ভিত্তিকে একত্রে বলা হয় আরকান। আর এই আরকান থেকেই তার অনুসারী মুসলমানদের আবাস ভূমির নামকরণ করা হয়েছে আরাকান।

ধারণা করা হয়, রোহিঙ্গা নামটি এসেছে আরাকানের রাজধানীর নাম ম্রোহং থেকে : ম্রোহং>রোয়াং>রোয়াইঙ্গিয়া>রোহিঙ্গা। তবে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে আরাকানের উল্লেখ রয়েছে রোসাং নামে। (সূত্র : রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস, এন. এম. হাবিব উল্লাহ্)

নেপথ্যে গুরু আশিন উইরাথু ও ‘৯৬৯’

বলার অপেক্ষা রাখে না যে মিয়ানমারে যা হচ্ছে, তা এককথায় জাতিগত বিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িক হামলা। এর নেপথ্যে এক ব্যক্তির নাম বারবার উঠে আসছে। তাঁর নাম আশিন উইরাথু। তিনি বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু। ১৯৬৮ সালে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। ১৪ বছর বয়সে স্কুল ত্যাগ করে পাদরিয়ানা জীবন গ্রহণ করেন। ২০০১ সালে তিনি জাতীয়তাবাদী ও মুসলিমবিদ্বেষী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। ২০০৩ সালে তাঁর ২৫ বছরের সাজা হয়। কিন্তু ২০১০ সালে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তাঁকেও ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার হন। বর্তমানে তাঁর ৪৫ হাজার ফলোয়ার আছে। ২০১৩ সালের ১ জুলাই সংখ্যায় টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে নিয়ে সচিত্র প্রতিবেদন ছেপেছে। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বৌদ্ধ সন্ত্রাসী বাহিনী। তিনি নিজেকে মিয়ানমারের ‘বিন লাদেন’ আখ্যায়িত করে থাকেন। নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে তাঁর সন্ত্রাসী বাহিনী মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চেয়ে কয়েক শ গুণ বেশি বর্বরতায় লিপ্ত। (সূত্র : বিবিসি হিন্দি)

তাদের মূলমন্ত্র ‘৯৬৯’। এই তিন সংখ্যা বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। বৌদ্ধ ধর্মে বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ—এ তিন রত্নের নাম হলো ত্রিরত্ন। অর্থাৎ বুদ্ধরত্ন, ধর্মরত্ন ও সংঘরত্ন। বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ বলতে এখানে গুণাবলির গুণকীর্তন করা হয়েছে। ত্রিপিটকে বুদ্ধের প্রধান ৯টি গুণ, ধর্মের ছয় গুণ ও সংঘের ৯ গুণের কথা বলা হয়েছে। এমন বিশ্বাস থেকে এসেছে ‘৯৬৯’।

‘অহিংসা পরম ধর্ম’, ‘জীব হত্যা মহাপাপ’—এসব নীতিকথা বলে গেছেন গৌতম বুদ্ধ। মানবতাবাদী হিসেবে জগত্সংসারে তিনি বেশ খ্যাতিও কুড়ান। প্রবর্তন করেন বৌদ্ধ ধর্ম। এ ধর্ম অনুসরণ করে মিয়ানমারের বেশির ভাগ মানুষ। কিন্তু বাস্তবে আমরা কী দেখছি মিয়ানমারে? তাহলে কি মিয়ানমারের বৌদ্ধদের দৃষ্টিতে মুসলমানরা ‘জীব’-এর সংজ্ঞায় পড়ে না?

সর্বশেষ গণহত্যার সূত্রপাত

গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যের রাথেটং শহরে নতুন করে ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ শুরু করে। ওই এলাকায় রাখাইন ও রোহিঙ্গা দুই সম্প্রদায়েরই বসবাস। ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের’ কারণে সেখানে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এর জের ধরে নিরাপত্তা বাহিনী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। এতে মিয়ানমার সরকারের দাবি অনুযায়ী ১০৬ জন নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ১২ জন সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। তবে মিয়ানমার সরকারের দাবির সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এই সহিংসতার জের ধরে মিয়ানমারে সেনা, বিজিবি ও রাখাইন বৌদ্ধ সন্ত্রাসীদের মধ্যে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা, গুম ও নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। এর ফলে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে অবস্থান নিয়েছে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা।

আরও পড়ুনঃ   সাবধান ! ফেসবুকে যেভাবে হারাচ্ছেন আপনার ঈমান আমল ও আকিদা

লন্ডনের সাপ্তাহিক অবজারভার রবিবার ৩ সেপ্টেম্বর জানিয়েছে, অন্যবারের তুলনায় এবার শরণার্থীদের মধ্যে পুরুষদের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে কম। নারী ও শিশুই বেশি। এর কারণ হিসেবে পত্রিকাটি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের উদ্ধৃত করে বলেছে, লড়াই করতে সক্ষম এমন বয়সী পুরুষদের বেছে বেছে নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে। এক সপ্তাহে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের দুই হাজার ৭০০-এর বেশি ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। (আলজাজিরা ও আল আরাবিয়া)

মিয়ানমারকে অস্ত্র দিচ্ছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের সংবাদ মাধ্যম হারেত্জ লিখেছে, দেশটির সরকার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিরি এক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাখাইনে হত্যাযজ্ঞ চলছে এবং ইসরায়েল সরকার মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করছে।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সামরিক জান্তাদের প্রধান জেনারেল মিন অং লাইং ইসরায়েল সফর করেছেন। কেনাকাটার এই সফরে তিনি ইসরায়েলের সামরিক কারখানা পরিদর্শন করেন ও ইসরায়েলের সেনা প্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন।

২০১৬ সালের আগস্ট মাসে ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান আইডিয়াল কনসেপ্টসের ওয়েবসাইটে একটি ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবিটি ছিল ইসরায়েলের নির্মিত কর্নার শট রাইফেলস হাতে প্রশিক্ষণের। ছবির সঙ্গে ছিল এক বিবৃতি, যাতে উল্লেখ করা হয়েছে মিয়ানমার অভিযানে এসব অস্ত্রের ব্যবহার শুরু করেছে। (সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন : ৬-৯-২০১৭)

বাতাসে ষড়যন্ত্রের গন্ধ

হতে পারে, রোহিঙ্গাদের এ করুণ পরিণতির পেছনে কোনো গেইম আছে। এর সম্ভাব্য কয়েকটি দিক আছে। এক. স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি পেয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আরাকানের মুসলমানরা ইংরেজদের পক্ষাবলম্বন করেছিল; কিন্তু ব্রিটিশরা তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ব্রিটিশরা বার্মা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় এমন এক নীতি চাপিয়ে দিয়ে যায়, যার ফলে আরাকানের মুসলমানরা উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়।

দুই. রোহিঙ্গা সংকট যত দিন থাকবে তত দিন চীন, মিয়ানমার ও আসিয়ান দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের কানেকটিভিটি ব্যাহত হবে। এতে লাভবান হবে অন্য দেশ। তাই তারা বরং আগুনে ঘি ঢালতে চাইবে। তিন. আরেকটি সন্দেহের তীর যায় মিয়ানমার সেনাবাহিনীর  দিকে। তারা চায় মিয়ানমারে এক ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি বজায় রাখতে, যাতে নিরাপত্তার অজুহাতে রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীই ভরসা—এ কথা বোঝাতে পারে। তা ছাড়া বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে যত ইয়াবা কারখানা আছে, তার বেশির ভাগের মালিকানা রয়েছে সে দেশের সেনাবাহিনীর হাতে। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন হলে স্বাভাবিকভাবে ওই সব অবৈধ ইয়াবা ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। সংগত কারণেই ইয়াবা কারখানার মালিক সেনা কর্মকর্তারা সেটি চাইবেন না। চার. বৌদ্ধদের প্রয়োজন আরাকানকে মুসলিমশূন্য করা। আর পাশ্চাত্য শক্তির প্রয়োজন সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাববলয়ের জন্য চীন-ভারতের মতো শক্তিধর দেশের সংযোগস্থল এবং মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রভাবশালী মুসলিম দেশের সমুদ্রপথে মধ্যপ্রাচ্যের ইসরায়েলের মতো নতুন এক রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করে স্থায়ী আসন গেড়ে বসা। তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এ অঞ্চলকে ঘিরে তাদের মিশনারি চক্র, মিডিয়া চক্র ও কূটনৈতিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে।

আইন-আদালত মানে না ঘাতকরা

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা নাকি দেখতে রাখাইনদের মতো নয়, আর তারা নাকি বার্মিজ ভাষা জানে না। এ অভিযোগ সত্য হলেও তাদের উত্খাত করা মিয়ানমারের আইন পরিপন্থী। ১৯৫৯ সালে হাসান আলী ও মেহের আলী মামলায় নাগরিকত্ব বিষয়ে তৎকালীন বার্মার সুপ্রিম কোর্টের রায় রয়েছে। এ মামলায় হাসান আলী ও মেহের আলী দেখতে পাকিস্তানিদের মতো এবং তাঁরা বার্মিজ ভাষা শুদ্ধ করে বলতে ও বুঝতে পারেন না বিধায় তাঁদের বিদেশি হিসেবে বার্মা থেকে বহিষ্কারের উদ্যোগের বিরুদ্ধে মামলা হয়। বার্মিজ সুপ্রিম কোর্ট তাঁর রায়ে বলেন, ‘আজ বার্মার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস ও বংশগত উৎপত্তিগত কারণে অনেকের বার্মিজদের চেহারার সঙ্গে সাদৃশ্য নেই এবং ভাষার ক্ষেত্রেও বৈসাদৃশ্য রয়েছে। এতদসত্ত্বেও তারা আইন অনুযায়ী বার্মার নাগরিক। শুধু জাতি-গোষ্ঠী, চেহারা কিংবা ভাষাজ্ঞান নাগরিকত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। ’

১৯৭৭ সালে প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসে। তখনকার সামরিক সরকারের একটি বড় সফলতা ছিল চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘকে ঢাকা ও রোহিঙ্গাদের যৌক্তিক অবস্থান বোঝাতে পারা এবং বাংলাদেশের পাশে রাখতে পারা। ফলে জেনারেল নে উইনের দ্য সোশালিস্ট প্রগ্রাম পার্টির সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে ১৯৭৮ সালের ৯ জুলাই দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। ঢাকার পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব তবারক হোসেন ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। ওই চুক্তিপত্রের ঐতিহাসিক মূল্য হলো, এতে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বার্মা তার নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হয়েছিল এবং ১৯৭৮ সালের ১ আগস্ট থেকে পরবর্তী ছয় মাস ধরে সেসব শরণার্থী আরাকানে ফেরতও যায়।

এই শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্যই বার্মা সরকার সে সময় তার বিখ্যাত ‘হিন্থা প্রজেক্ট’ (Hintha Project) গ্রহণ করে। আর বাংলাদেশের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মো. শামসুল হক সেই পুনর্বাসন কার্যক্রম দেখতে ১৯৭৯ সালের ২৩ জানুয়ারি বর্মা সফর করেছিলেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, ১৯৯১ সালে এসে নে উইন পরবর্তী বার্মার নতুন সামরিক সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে আগের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা ও চুক্তি থেকে সরে আসে এবং আরাকানে আবারও পীড়ন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় আবার কক্সবাজার ও বান্দরবানে শরণার্থী আসা শুরু হয় এবং সেই ধারা অব্যাহত আছে আজও।

নিজ দেশে পরবাসী

রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বঞ্চিত করা হলো জাতি-গোষ্ঠী, চেহারা ও ভাষার দোহাই তুলে। অথচ উন্নত বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে এমন ‘ভিনদেশি’ বহু নাগরিক আছে, যারা স্থানীয়দের মতোই জীবনযাপন করছে। নাগরিকত্ব বঞ্চিত রোহিঙ্গারা এখন ভয়ংকর স্বেচ্ছাচারিতা ও বৈষম্যের শিকার পদে পদে। হত্যা, ধর্ষণ, যখন-তখন সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া, জবরদস্তি শ্রমে নিয়োগ, বৈষম্যমূলক করারোপ, চলাচলের স্বাধীনতা হরণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিদেশে যেতে যেমন ভিসা লাগে, তেমনি রোহিঙ্গাদের এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতে পাস (অনুমতিপত্র) লাগে। পাসে উল্লিখিত নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় গ্রামের বাইরে অবস্থান করলে মিয়ানমার প্রশাসন পরিবারের সদস্য তালিকা থেকে তার নাম কেটে দেয় এবং তাকে মিয়ানমার ত্যাগে বাধ্য করে। স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ না থাকায় শিক্ষা, চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি বাজারে গমনের স্বাধীনতাও রোহিঙ্গাদের নাগালের বাইরে। পাস ছাড়া এমনকি তারা স্কুল-কলেজেও যেতে পারে না। ফলে শিক্ষার্থীদের মূলত দূরশিক্ষণের ওপর নির্ভর করতে হয়।

আরও পড়ুনঃ   চলতি শতাব্দীতে মুসলমানদের সংখ্যা খ্রিস্টানদের ছাড়িয়ে যাবে

অন্যদিকে রোহিঙ্গা জনসংখ্যা হ্রাস করার কৌশল হিসেবে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য বিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন চালু করেছে। কোনো রোহিঙ্গা বিয়ে করতে চাইলে শহর বা গ্রাম প্রশাসন, মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনী নাসাকার সংশ্লিষ্ট সেক্টর কমান্ডার ও সংশ্লিষ্ট সামরিক প্রশাসন থেকে অনুমতি নিতে হয়। এ ধরনের অনুমতির জন্য ফি সহকারে আবেদন করতে হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে দীর্ঘ কালক্ষেপণ করা হয়। অনুমতি ছাড়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড। Chris Lewa Zvi North Arakan : An Open Prison for the Rohingya in Burma. প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন বিবাহ নিয়ন্ত্রণ আইন নারীদের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। অনুমতি ছাড়া গোপনে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গর্ভবতী হয়ে পড়লে শাস্তির ভয়ে তাকে অবৈধ পন্থায় অনভিজ্ঞ বৈদ্যের কাছে গর্ভপাত করাতে হয়, যা নারীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলেছে। (অধ্যাপক মো. জাকির হোসেনের নিবন্ধ : ‘রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান হতে হবে’, দৈনিক কালের কণ্ঠ : ২০ নভেম্বর, ২০১৬)

বিভিন্ন দেশে রোহিঙ্গা

বিভিন্ন সময় সামরিক জান্তার নির্যাতনের কারণে দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়ে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৫০ হাজার, বাংলাদেশে পাঁচ লাখ; অবাক হওয়ার মতো তথ্য হলো, সৌদিতেও রয়েছে রোহিঙ্গারা। সৌদিতে রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য সংখ্যা পাঁচ লাখেরও বেশি। যুগের পর যুগ তারা এ দেশে বসবাস করছে। তাদের মধ্য থেকে প্রায় দুই লাখ লোককে সরকার সম্প্রতি ইকামা (রেসিডেন্সি-পারমিট) প্রদান করেছে। উদ্দেশ্য, শৃঙ্খলা, স্বাভাবিক জীবনযাপন ও সমাজের মূল স্রোতে মিশে যাওয়া। বিভিন্ন জটিলতা ও বিশৃঙ্খলার সঙ্গে তাদের অনেকে জড়িয়ে গেলেও আরবের মাটিতে এ জাতির ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে নিজস্ব প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছে অনেকেই। জ্ঞানের আলো ছড়িয়েছে। কাজ করে দেখিয়েছে। তাদের ভেতরে মসজিদে নববীর সাবেক ইমাম শাইখ কারি মুহাম্মদ আইউব (রহ.), কারি আব্দুল আলী আরাকানি, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. মুহিব্বুদ্দীন আব্দুস সুবহান, মুহাম্মদ ইউসুফ বার্মাভিসহ অনেকেই উল্লেখযোগ্য।

বাংলাদেশের শঙ্কা

মানবিকতার দাবি হলো, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানো।   বাংলাদেশের সরকার ও জনগণ এ বিষয়ে যথেষ্ট উদারতা দেখিয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য স্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা বাংলাদেশের পক্ষে সুকঠিন। আগে থেকেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে জনসংখ্যার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে ইয়াবা, অস্ত্র ও মানবপাচারের মতো সংঘবদ্ধ আপরাধের পাশাপাশি বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলায় রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে খবর বেরিয়েছে। কোনো কোনো নিরাপত্তাবিশ্লেষকের ধারণা, বাংলাদেশের একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী মিয়ানমারের সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে কক্সবাজার ও দক্ষিণ চট্টগ্রাম নিয়ে একটি স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ করতে পারে। পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, স্বাধীন রোহিঙ্গা রাষ্ট্র গঠনের জন্য সামরিক প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বান্দরবান ও নাইক্ষ্যংছড়ির গভীর অরণ্যে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প তৈরি করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে প্রগতিশীল বিশেষজ্ঞরা অভিমত দিয়েছেন।

সীমান্তে সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর অপতৎপরতা

রোহিঙ্গা সংকটে নিরাপত্তাবিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, এতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এর আলামতও দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের কয়েকটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দেখুন : এক. ২৪ এপ্রিল, ২০১৭ তারিখে দৈনিক জনকণ্ঠ এক বিশেষ প্রতিবেদন ছেপেছে। এর শিরোনাম হলো, ‘পার্বত্য এলাকায় নতুন অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টায় ভাবনাকেন্দ্র’। দুই. ২৬ নভেম্বর, ২০১৬ দৈনিক আমাদের সময় লিখেছে, “সেনাবাহিনীর সহযোগী ‘৯৬৯’ সশস্ত্র গোষ্ঠী। ’’ তিন. ২৯ এপ্রিল, ২০১৭ দৈনিক ইত্তেফাক লিখেছে, “পাহাড়ে নতুন আতঙ্ক ‘৯৬৯’। ’’ চার.  ২৫ এপ্রিল, ২০১৭ দৈনিক মানবজমিনের প্রতিবেদনের শিরোনাম হলো, ‘পার্বত্য অঞ্চলে নতুন আতঙ্ক ৯৬৯। ’

এই ‘৯৬৯’ বৌদ্ধ ধর্মের প্রতীক। বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা এর অপব্যবহার করছে।

মানবজমিন লিখেছে, ‘ধর্মীয় উগ্রপন্থী হিসেবে ৯৬৯ জন পরিচিত হলেও তাদের রয়েছে সশস্ত্র গ্রুপ। সংগঠনটির ভাণ্ডারে রয়েছে হালকা থেকে ভারী অস্ত্রের বিশাল মজুদ। সন্ত্রাসী সন্ন্যাসী আশিন উইরাথু বর্তমানে এই সংগঠন পরিচালনা করেন। এদিকে তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে পাহাড়ের দুর্গম অঞ্চলে থাকা জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের সশস্ত্র গ্রুপের। বাংলাদেশে তৎপর ওই দুই সশস্ত্র গ্রুপকে নতুন করে স্বপ্ন দেখানো হচ্ছে জুম্ম ল্যান্ড গঠনের। স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে জুম্ম ল্যান্ড গঠন করার জন্য বিভিন্ন রূপরেখাও তৈরি করা হয়েছে। কী ধরনের সরকার হবে পাহাড়ে, তারও একটি ছক সাজানো হয়েছে। পাহাড়কে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে যে বাংলাদেশ সরকার থেকে পাহাড়কে বিচ্ছিন্ন করে নিজেরাই সরকার গঠন করে স্বাধীন জুম্ম ল্যান্ড গঠন করবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড সরকার প্রশ্রয় না দেওয়ায় পার্বত্য জেলাগুলোতে প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো কোনো না কোনো কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। ’

এ বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের সতর্ক হওয়ার বিকল্প নেই।

লিখেছেন: মাওলানা কাসেম শরীফ

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

two + twenty =