মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরূদ পাঠের প্রয়োজনীয়তা

0
14
দরূদ পাঠ

এইচ. এম. মুশফিকুর রহমান:

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। আমরা তার কাছে সাহায্য চাই এবং তারই নিকট মা প্রার্থনা করি। আল্লাহ যাকে হিদায়েত দেন, তাকে গোমরাহ করার কেউ নেই। দরূদ ও সালাম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর। মুমিন হৃদয় আলোড়িত হয়, শিহরিত হয়, মনে আনন্দের বীনা বাজতে থাকে যখন প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম উচ্চারিত হয়, তাঁর জীবন-চরিত আলোচিত হয় কিংবা তাঁর মুখনিঃসৃত বাণী পাঠ করা হয়। সত্যের দীক্ষায় দীক্ষিত হৃদয় তাঁর আদর্শের  শ্রেষ্ঠতায় ও সৌন্দর্যে মোহিত হয়, উম্মতের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় ভালোবাসায় আপ্লুত হয়। তাঁর একনিষ্ঠ দিক নির্দেশনায় পথ খুঁজে পায় পথহারা বিভ্রান্ত মানব সন্তানেরা, আর দুর্বল চিত্তের লোকেরা ফিরে পায় মনোবল। মানবতার কল্যাণকামীরূপেই আল্লাহ তাঁকে  প্রেরণ করেছেন এ বিপর্যস্ত ধরাধামে। সত্যিই তিনি তাঁর যুগের যমীনকে মুক্ত করেছেন অশান্তির দাবানল হতে, উদ্ধার করেছেন অজ্ঞানতা ও মূর্খতার নিকষ অন্ধকার হতে। তাইতো জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই উচিত তাঁর  প্রতি দরূদ পেশ করা।
দরূদ অর্থ শুভকামনা বা কল্যাণ প্রার্থনা। আরবি সলাত শব্দের সমার্থক দরূদ। সালাতের মূল চারটি অর্থ। যেমন : শুভকামনা, গুণকীর্তন, দয়া-করুণা ও ক্ষমা প্রার্থনা।
দরূদ বলতে ‘সালাত আলান নবী’ অর্থাৎ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি পাঠ বা তাঁর জন্য শুভকামনা, গুণকীর্তন, তাঁর প্রতি আল্লাহর দয়া-করুণা ও প্রার্থনা  বোঝায়। দরূদ বিষয়টি অতীব মর্যাদা ও সম্মানের। আরবিতে ‘সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ’ বা ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ই হলো দরূদ।
আল্লাহর নবীর উপর দরূদ পড়ার নির্দেশ আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। নবীর উপর দরূদ পড়ার অর্থই হল আল্লাহর আদেশের বাস্তবায়ন ও হুকুম পালন করা। নবীর উপর দরূদ পেশের নির্দেশনা দিয়ে আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ নবীর প্রতি সালাত-দরূদ পেশ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর প্রতি সালাত পেশ করো এবং তাঁকে যথাযথভাবে সালাম জানাও।” [সূরা আহযাব : ৫৬]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পড়ার গুরুত্ব ও ফযীলত যে কত অপরিসীম তা আমরা চিন্তাই করতে পারি না। আমরা বিভিন্নভাবে আমাদের সময়কে অপচয় করে থাকি। যদি আমাদের সময়কে অপচয় না করে আল্লাহর নবীর উপর দরূদ পড়তে থাকি, তা আমাদের জন্যে একদিন কাজে লাগবে।
‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ‘আস রাদিআল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন, “যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরূদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার দরুন তার উপর দশবার দরূদ পাঠ করবেন।” [ মুসলিম : ৩৮৪, তিরমিযী : ৩৬১৪]
ইবনে মাসঊদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি সব লোকের চাইতে আমার বেশি নিকটবর্তী হবে, যে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আমার উপর দরূদ পড়বে।” [তিরমিযী : ৪৮৪]
আওস ইবনে আওস রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের দিনগুলির মধ্যে সর্বোত্তম দিন হচ্ছে জুমুআর দিন। সুতরাং ঐ দিন তোমরা আমার উপর অধিকমাত্রায় দরূদ পড়। কেননা, তোমাদের দরূদ আমার কাছে পেশ করা হয়।” লোকেরা বলল, ‘ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি তো (মারা যাওয়ার পর) পচে-গলে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে আমাদের দরূদ কিভাবে আপনার কাছে পেশ করা হবে?’ তিনি বললেন, “আল্লাহ পয়গম্বরদের দেহসমূহকে খেয়ে ফেলা মাটির উপর হারাম করে দিয়েছেন।” (বিধায় তাঁদের শরীর আবহমান কাল ধরে অক্ষত থাকবে) [আবূ দাউদ : ১০৪৭]
ফাযালা ইবনে উবাইদ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি  লোককে সালাতে প্রার্থনা করতে শুনলেন। সে কিন্তু তাতে আল্লাহর প্রশংসা করেনি এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদও পড়েনি। এ দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “লোকটি তাড়াহুড়ো করল।” অতঃপর তিনি তাকে ডাকলেন ও তাকে অথবা অন্য কাউকে বললেন, “যখন কেউ দু‘আ করবে, তখন সে যেন তার পবিত্র প্রতিপালকের প্রশংসা বর্ণনা যোগে ও আমার প্রতি দরূদ ও সালাম পেশ করে দু‘আ আরম্ভ করে, তারপর যা ইচ্ছা (যথারীতি) প্রার্থনা করে।” [আবূ দাউদ : ১৪৮১, তিরমিযী : ৩৪৭৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা আমার কবরকে উৎসব কেন্দ্রে পরিণত করো না (যেমন কবর পূজারীরা উরস ইত্যাদির মেলা লাগিয়ে করে থাকে)। তোমরা আমার প্রতি দরূদ পেশ কর। কারণ, তোমরা যেখানেই থাক, তোমাদের পেশকৃত দরূদ আমার কাছে পৌঁছে যায়।”  [আবূ দাউদ : ২০৪২, আহমাদ : ৭৭৬২]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শোনার পর দরূদ না পড়লে তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদ-দু‘আ করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম শুনে যে ব্যক্তি দরূদ পড়ে না তার জন্য জিবরীল আলাইহিস সালাম বদ-দু‘আ করেছেন আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমীন বলেছেন।
আবূ হুরাইরা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই অভিশাপ দিলেন যে, “সেই ব্যক্তির নাক ধূলা-ধূসরিত হোক, যার কাছে আমার নাম উল্লেখ করা হল, অথচ সে (আমার নাম শুনেও) আমার প্রতি দরূদ পড়ল না।” (অর্থাৎ ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি অসাল্লাম’ বলল না) [তিরমিযী : ৩৫৪৫, আহমাদ : ৭৪০২]
আলী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রকৃত কৃপণ সেই ব্যক্তি, যার কাছে আমি উল্লিখিত হলাম (আমার নাম উচ্চারিত হল), অথচ সে আমার প্রতি দরূদ পাঠ করল না।” [তিরমিযী : ৩৫৪৬, আহমাদ : ১৭৩৮]
“কা‘ব ইবনু উজরাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা মিম্বরের কাছে একত্রিত হও। আমরা উপস্থিত হলাম। যখন তিনি মিম্বরের প্রথম স্তরে চড়লেন তখন বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। তারপর যখন দ্বিতীয় স্তরে চড়লেন তখনও বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। তারপর তৃতীয় স্তরে চড়ে আবারও বললেন, হে আল্লাহ কবুল করুন। খুতবা শেষে যখন মিম্বর  থেকে অবতরণ করলেন, তখন আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আজ আমরা আপনার থেকে এমন কিছু শুনলাম যা এর পূর্বে আর কখনও শুনিনি। তখন তিনি বললেন, আমার কাছে জিবরীল আলাইহিস সালাম এসে বলল, যে ব্যক্তি রমযান পেয়েও তাকে ক্ষমা করা হল না সে বঞ্চিত হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন। যখন দ্বিতীয় স্তরে চড়লাম তখন তিনি বললেন, যার কাছে আপনার নাম উল্লেখ করা হল কিন্তু সে আপনার উপর দরূদ পড়ল না, সেও বঞ্চিত হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন। যখন তৃতীয় স্তরে চড়লাম, তখন তিনি বললেন, যে পিতা-মাতাকে অথবা তাদের কোনো একজনকে বৃদ্ধাবস্থায় পেয়েও তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারল না সেও বঞ্চিত  হোক। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ কবুল করুন। [বাইহাকী : ১৪৬৮]
আমাদের অজ্ঞতার কারণে সমাজে দরূদের নামে বিভিন্ন ধরনের কু-সংস্কার, বিদ‘আত, বানোয়াট ও উদ্ভট কথা-বার্তার প্রচলন রয়েছে। অনেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অতি ভক্তি প্রদর্শন করে এবং তাকে অধিক সম্মান দেখাতে গিয়ে তার সম্পর্কে এমন উদ্ভট কথা-বার্তা বলে থাকে, যা তার জন্য কখনোই প্রযোজ্য নয়। তিনি যে একজন আল্লাহর সৃষ্টি বা মাখলুক তাকে সে মর্যাদায় না রেখে অতি উৎসাহী কিছু লোক তাকে আল্লাহর মর্যাদায়  পৌঁছে দেন। ফলে দেখা যায়, দরূদের নামে রাসূল সম্পর্কে এমন কিছু কথা রাসূলের শানে বলা হয়ে থাকে যা যথারীতি শির্কের পর্যায়ে পৌঁছে যায়। বর্তমানে দ্বীনে ইসলামে বিদ‘আতের সংযোগ দৈনন্দিন জীবনের নিয়মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিশেষভাবে যিকির-আযকার ও দু‘আ অযীফার বেলায় মানুষের মনগড়া এবং সূন্নাহ বিরুদ্ধ অনেক বস্তু সংযোগ করে দেয়া হয়েছে। ফলে মাসনূন দু‘আ ও যিকির যেন ভুলে যাওয়া অধ্যায় হয়ে গেছে। অনেক মনগড়া ও গায়রে মাসনূন দরূদ-সালাম সমাজে প্রচলিত হয়ে পড়েছে।
শরীয়তে মনগড়া ও গায়রে মাসনূন কাজের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীসগুলো প্রত্যেক মুসলিমের দৃষ্টিতে থাকা উচিত, যেন এই সংক্ষিপ্ত ও অতি মূল্যবান জীবনে ব্যয়কৃত সময়, সম্পদ এবং অন্যান্য  যোগ্যতা কিয়ামতের দিন ধ্বংস না হয়ে যায়।
মনগড়া ও সুন্নাহ বিরূদ্ধ দরূদ ও সালামের জন্য সব রকমের মেহনত, প্রচেষ্টা অকেজো ও উপকারশূন্য। বরং খুব বেশি সম্ভব যে হয়ত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অসন্তুষ্টি এবং রাগের বড় কারণ হবে। মনে রাখা দরকার, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র মুখ  থেকে বের হওয়া একটি শব্দ পৃথিবীর সকল ওলী, বুজর্গ এবং সৎলোকদের বানানো কালাম অপেক্ষা অনেক অনেক মূল্যবান ও শ্রেষ্ঠ।
আমাদের দেশে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পড়ার বিভিন্ন শব্দ পাওয়া যায়, যার অধিকাংশই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত বা স্বীকৃত কোনো দরূদ নয়। এগুলো সবই মনগড়া, বানানো ও জাল হাদীসের ভিত্তিতে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। সুতরাং, এ সব মনগড়া, বানানো ও জাল দরূদ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং বিশুদ্ধ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দরূদের অনুসরণ করতে হবে। নিম্নে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত কয়েকটি  দরূদ উল্লেখ করা হল-
আবূ মুহাম্মদ কা‘ব ইবনে ‘উজরাহ রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (একদা) আমাদের নিকট এলে আমরা বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনার প্রতি কিভাবে সালাম পেশ করতে হয় তা জেনেছি, কিন্তু আপনার প্রতি দরূদ কিভাবে পাঠাব?’ তিনি বললেন, “তোমরা বল, ‘আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আ-লি মুহাম্মদ, কামা স্বাল্লাইতা আলা আ-লি ইবরা-হীম। ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ। আল্লা-হুম্মা বা-রিক আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আ-লি মুহাম্মদ, কামা বা-রাকতা আলা আ-লি ইবরা-হীম। ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।’
যার অর্থ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ তথা মুহাম্মদের পরিবারবর্গের উপর দরূদ পাঠ করো; যেমন দরূদ পেশ করেছিলে ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের উপর। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও অতি সম্মানার্হ। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ ও তাঁর পরিজনবর্গের প্রতি বরকত নাযিল কর; যেমন বরকত নাযিল করেছ ইব্রাহীমের পরিজনবর্গের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও মহা সম্মানীয়।” [সহীহুল বুখারী  : ৩৩৭০, মুসলিম : ৪০৬]
আবূ মাসঊদ বদরী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা সায়াদ ইবনে উবাদা রাদিআল্লাহু আনহু-এর মাজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এলে বাশীর ইবনে সা‘আদ তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! মহান আল্লাহ আমাদেরকে আপনার প্রতি দরূদ পড়তে আদেশ করেছেন, কিন্তু কিভাবে আপনার উপর দরূদ পড়ব?’ আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরত্তর থাকলেন। পরিশেষে আমরা আশা করলাম, যদি (বাশীর) তাঁকে প্রশ্ন না করতেন (তো ভাল হত)। ক্ষণেক পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা বলো,‘আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আ-লি মুহাম্মদ, কামা স্বাল্লাইতা আলা আ-লি ইবরা-হীম। অবা-রিক আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আ-লি মুহাম্মদ, কামা বা-রাকতা আলা আ-লি ইবরা-হীম। ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।’
অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ তথা মুহাম্মদের পরিবারবর্গের উপর সালাত পেশ কর; যেমন সালাত পেশ করেছিলে ইব্রাহীমের পরিবারবর্গের উপর। আর তুমি মুহাম্মদ ও তাঁর পরিজনবর্গের প্রতি বরকত নাযিল কর; যেমন বরকত নাযিল করেছ ইব্রাহীমের পরিজনবর্গের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত ও মহা সম্মানীয়। আর সালাম কেমন, তা তো তোমরা জেনেছ।”[ মুসলিম : ৪০৫, তিরমিযী : ৩২২০]
আবূ হুমাইদ সায়েদী রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, লোকেরা বলল, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমরা কিভাবে আপনার প্রতি দরূদ পেশ করব?’ তিনি বললেন, “তোমরা বলো, “আল্লা-হুম্মা স্বাল্লি আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আযওয়া-জিহি অযুর্রিয়্যাতিহি কামা স্বাল্লাইতা আলা আ-লি ইবরা-হীম, অবা-রিক আলা মুহাম্মাদিঁউ অআলা আযওয়া-জিহি অযুর্রিয়্যাতিহি কামা বারাকতা আলা আ-লি ইবরা-হীম, ইন্নাকা হামীদুম মাজীদ।”
অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মদ, তাঁর পতœীগণ ও তাঁর বংশধরের উপর সালাত পেশ কর; যেমন তুমি ইব্রাহীমের বংশধরের উপর সালাত পেশ করেছ। আর তুমি মুহাম্মদ, তাঁর পতœীগণ ও তাঁর বংশধরের  উপর বরকত বর্ষণ কর যেমন তুমি ইবরাহীমের বংশধরের উপর বরকত বর্ষণ করেছ। নিশ্চয় তুমি প্রশংসিত গৌরবান্বিত। [ সহীহুল বুখারী : ২৩৬৯, ৬৩৬০, মুসলিম : ৪০৭]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর  সাহাবাদের দরূদ পাঠ :
উবাই ইবনে কা’ব রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! নিশ্চয়ই আমি আপনার উপর বেশি বেশি সালাত পাঠ করতে চাই, তাহলে আমি কী পরিমাণ সময় আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? (অর্থাৎ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আমি কত ঘণ্টা আপনার উপর সালাত মুবারক পাঠ করবো?) আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা। আমি বললাম, এক চতুর্থাংশ সময় (তথা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৬ ঘণ্টা) আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা, আপনি করুন। তবে যদি এর চেয়ে বেশি সময় করেন, তাহলে তা আপনার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি অর্ধেক সময় (তথা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টা) আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা, আপনি করুন। তবে যদি এর চেয়ে বেশি সময় করেন, তাহলে তা আপনার জন্য উত্তম হবে। আমি বললাম, তাহলে আমি আমার তিন ভাগের দুই ভাগ সময় (তথা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টা) আপনার উপর সালাত পাঠ করবো ? আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : আপনার যতক্ষণ ইচ্ছা, আপনি করুন। তবে যদি এর চেয়ে বেশি সময় করেন, তাহলে তা আপনার জন্য উত্তম হবে। তখন আমি বললাম : তাহলে আমি আমার সম্পূর্ণ সময় (তথা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ২৪ ঘণ্টাই) আপনার উপর সালাত পাঠ করবো? তখন আখিরী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন : যদি আপনি এরূপ করতে পারেন, তাহলে আপনার সমস্ত নেক মাক্বছূদগুলো পূর্ণ করে  দেয়া হবে এবং আপনার সমস্ত গুনাহখতাগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে।” [তিরমিযী : ২৪৬০]
নবীর উপর দরূদ পড়ার বিধান-হুকুম সম্পর্কে আলেমদের একাধিক মত রয়েছে :
এক. কাযী আয়াদ্ব রহ. ও ইবনে আব্দুল বার রহ. বলেন, জীবনে একবার দরূদ পড়া ওয়াজিব। চাই তা সালাতের মধ্যে হোক অথবা সালাতের বাইরে হোক। যেমন-তাওহীদের কালিমা জীবনে একবার বলা ওয়াজিব।
দুই. বেশি বেশি করে দরূদ পড়া ওয়াজিব। যত বেশি পড়বে ততই সাওয়াব হবে। তাতে সংখ্যা নির্ধারণ করার কোনো প্রয়োজন নেই।
তিন. যখন আল্লাহর রাসূলের নাম উল্লেখ করা হয়, তখন তার উপর দরূদ পড়া ওয়াজিব।
চার. শুধুমাত্র সালাতের শেষ বৈঠকে দরূদ পড়া ওয়াজিব।
পাঁচ. দরূদ পড়া মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়। এ বিষয়ে উল্লিখিত মতামত ছাড়াও আরও বিভিন্ন মতামত রয়েছে।

আরও পড়ুনঃ   পাপ থেকে বেঁচে আল্লাহ পাওয়ার অন্যতম মাধ্যম 'ইতিকাফ'

শাইখ আব্দুল আযীয ইবন বায রহ. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করতে হয় সালাতের তাশাহুদের পর, খুতবার সময়, দু‘আ ইস্তিগফারের সময়, আজানের পর, মাসজিদে প্রবেশে ও বের হওয়ার সময়। অনুরূপভাবে কোনো কিতাব, প্রবন্ধ, রিসালা ও লেখনি লেখার সময়। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম লিখার সময় পুরো দরূদ লেখা সূন্নাত। দরূদটি পরিপূর্ণ লিখতে হবে, যাতে আল্লাহর আদেশের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হয় এবং একজন পাঠক যখন তা পাঠ করে সে বুঝতে পারে যে এখানে দরূদ পড়া হয়েছে। সংক্ষিপ্তাকারে যেমন- (সা.) বা (দ.) ইত্যাদি লেখা কোনোক্রমেই উচিত নয়। আমাদের উচিত, আমরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরূদ পড়ব তখন পুরো দরূদ পড়া এবং যখন তার নামের শেষে দরূদ লিখব তখনও দরূদ পুরোপুরি লিখা। কোনো প্রকার সংকেত বা কোনো অসমাপ্ত শব্দ ব্যবহার না করা।
সকল নবীদের উপর দরূদ পাঠ করা :  দরূদ শুধু নবীদের জন্য খাস। নবী ছাড়া আর কারো জন্য দরূদ পড়ার কোনো বিধান নেই। সুতরাং শুধু নবীদের জন্যই দরূদ পাঠকরা উচিত। নবী ছাড়া অন্য মুসলিমদের জন্য দু‘আ ইস্তেগফার করাই ইসলামী শরীয়াতের বিধান।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করা দরূদ পাঠকারীকে জান্নাতের দিকে পথ দেখায়, যে দরূদ পাঠ করে না তাকে জান্নাতের পথ হতে বিচ্যুত করে। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরূদ পাঠ করা দরূদ পাঠকারীর আমল, হায়াত ও যাবতীয় কর্মে বরকতের কারণ হয়। তাই আমাদের উচিৎ সব সময় রাসূলের উপর দরূদ পাঠ করা।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Comments

comments