যারা জ্বিন এবং মানুষ — আন-নাস

0
13
সূরা নাস বাংলা

সূরা নাসঅনুবাদঃ বলো, আমি আশ্রয় নেই মানুষের প্রতিপালক, মানুষের মালিক, মানুষের উপাস্যের কাছে। আত্মগোপনকারি প্ররোচকের প্ররোচনার অনিষ্ট থেকে। যে মানুষের ভেতরে প্রতিনিয়ত প্ররোচনা দেয়। যারা জ্বিন এবং মানুষ। [আন-নাস]

বলো, আমি আশ্রয় নেই মানুষের প্রতিপালক, মানুষের মালিক, মানুষের প্রভুর কাছে।

কেন বার বার ‘মানুষের’ বলা হলো?

এলাকার চেয়ারম্যান দাঁড়িয়ে যখন ভাষণ দেন, “ভাইসব, আমি আপনাদের শুভাকাঙ্ক্ষী। আমি আপনাদেরই প্রতিনিধি। আমি আপনাদেরই মনোনীত নেতা। …” —এই কাজটা তিনি করেন এলাকাবাসীকে বোঝানোর জন্য যে, এলাকাবাসীর প্রতি তার বিশেষ টান রয়েছে। তিনি সত্যিই চান এলাকার মানুষের জন্য ভালো কিছু করতে।

আল্লাহ تعالى যেন বার বার আমাদেরকে জানাচ্ছেন যে, মানুষের অবস্থার প্রতি তিনি উদ্বিগ্ন। তিনি تعالى মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য সবসময় রয়েছেন। তিনি تعالىমানুষকে সযত্নে পালন করেন, কারণ তিনি মানুষের রব। তাঁর ক্ষমতা দিয়ে প্রতিরক্ষা দেন, কারণ তিনি মানুষের মালিক। তিনি আমাদেরকে কোনোদিন ফিরিয়ে দেবেন না, কারণ তিনি تعالى যে আমাদের ইলাহ, আমাদের উপাস্য, আমাদের প্রভু, যাকে আমরা সবচেয়ে বেশি চাই।[১]

কেন আল্লাহ تعالى রব, মালিক, ইলাহ এই শব্দগুলো ব্যবহার করলেন? কেন তিনি শুধুই বললেন না, “বলো, আমি আশ্রয় চাই আল্লাহর কাছে।” এক ‘আল্লাহ’ শব্দ দিয়েই কি সব বুঝিয়ে দেওয়া যেত না?

ধরুন, আপনার এক জটিল অসুখ হয়েছে। আপনি আপনার বন্ধুর উপদেশ মতো একজন ডাক্তারের কাছে দেখা করতে গেছেন। কিন্তু আপনি ঠিক ভরসা পাচ্ছেন না যে, ডাক্তারটা সত্যিই পারবে কিনা আপনার সঠিক চিকিৎসা করতে। ক্লিনিকে ঢোকার মুখে সাইনবোর্ডে দেখলেন লেখা আছে —  “সিনিয়র সার্জন – সরকারি হৃদরোগ হাসপাতাল, পিএইচডি – জনহপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, এম.সি.এম, এম.মেড.এসসি, এম.সার্জারি, ডি.এম.এসসি, ডি.ক্লিনি.সার্জ, এম.ডি.”। এতগুলো যোগ্যতা দেখে মুহূর্তের মধ্যে আপনার সব সন্দেহ উবে যাবে। তার উপর গভীর ভরসা চলে আসবে। আপনি নিশ্চিত হবেন যে, আপনি একজন যোগ্য মানুষের কাছে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুনঃ   ইসলাম প্রচারের গুরুত্ব বিস্তারিতভাবে জেনে নিন

মানুষ যখন শয়তানের ওয়াসওয়াসা’য় জর্জরিত হয়ে আশ্রয় চাইবে, তখন সে দুহাত তুলে আকুল হয়ে মানুষের রব-এর কাছে সাহায্য চাইবে, মানুষের মালিকের কাছে নিরাপত্তা চাইবে, মানুষের ইলাহের কাছে মাথা নত করবে। আল্লাহ تعالى যে আমাদের রব, মালিক, ইলাহ — তা আমরা নিজেদেরকে মনে করিয়ে দিলে আমাদেরই আল্লাহর تعالى উপর ভরসা বেড়ে যায়।  আমাদের মনে যখন সংশয় আসবে, “আল্লাহ কি আসলেই আমাকে সাহায্য করবেন? তিনি কি এইসব ব্যাপারে মানুষকে সাহায্য করেন?” —উত্তর পেয়ে যাবেন এই আয়াতগুলোতে। রব, মালিক এবং ইলাহ  —এই তিনটি শব্দের অর্থ ঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারলেই আমাদের যাবতীয় সংশয় দূর হয়ে যাবে। মনে সংশয় চেপে রেখে চেয়ে লাভ নেই। আগে সংশয় দূর করে, আল্লাহর تعالى প্রতি আস্থাশীল হয়ে, তারপরে তাঁর تعالى কাছে চাইতে হবে। দু’আ করার একটি শর্ত হলো, আল্লাহ تعالى যে দু’আ মনজুর করতে সক্ষম, তা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করা।[৩৯৩]

এই তিনটি শব্দের পেছনে অনেক উপলব্ধি করার মতো ব্যাপার রয়েছে। অনেক সময় আমরা মনে করি যে, আমি আমার পরিবার, নিজের প্রতিপালন করছি। আমি টাকা না দিলে সংসার চলবে কীভাবে? আবার অনেক সময় মনে করি যে, আমি আমার সম্পত্তির মালিক। আমার সম্পত্তি আমি যখন খুশি উপভোগ করতে পারবো। কেউ নাক গলাতে পারবে না। একসময় আমরা এমন পর্যায়ে চলে যাই যে, আমরা মনে করা শুরু করি: আমি নিজেই আমার প্রভু—আমার কাছে যা ভালো লাগবে আমি তা করবো, যা লাগবে না, তা করবো না। কোনো ধর্মটর্ম মানার দরকার নেই। ধর্ম হচ্ছে অল্প-শিক্ষিত মানুষদের জন্য। আমার জন্য না। —এভাবে আমরা পরোক্ষভাবে নিজেদেরকে রব, মালিক এবং ইলাহ বানিয়ে ফেলি।

সুরা আন-নাস আমাদেরকে দিয়ে বলায় যে, “বলো, আমি আশ্রয় নেই মানুষের রব , মালিক এবং ইলাহ-এর কাছে।” আমাদের ইগো অনেক সময় মুখ দিয়ে এই কথা বের হতে দেয় না। তাই সূরাহ শুরু হয়েছে ‘বলো’ দিয়ে। মুখে বলো। নিজের ইগোকে গিলে খেয়ে মাথা নত করে ঘোষণা দাও যে, তুমি কারও প্রতিপালন করো না, কোনো কিছুর মালিক নও তুমি এবং তুমি নিজের প্রভু নও। ঘোষণা দাও: আল্লাহ হচ্ছেন তোমার রব, তোমার মালিক, তোমার প্রভু। তারপরে আসো আল্লাহর تعالىকাছে সাহায্য চাইতে।

আরও পড়ুনঃ   আল কুর’আনে তাওহীদের বিষয়ে ৯ জন নবীর ভাষণ

আত্মগোপনকারি প্ররোচকের প্ররোচনার অনিষ্ট থেকে

ওয়াসওয়াসা হচ্ছে বার বার প্ররোচনা দেওয়া। খন্নাস হচ্ছে যে লুকিয়ে থাকে, তারপর বেরিয়ে এসে তার কাজ করে আবার লুকিয়ে পড়ে।[১৭][৪] শয়তান লুকিয়ে থেকে মানুষের অন্তরে প্ররোচনা দেয়। তারপর মানুষ যখন আল্লাহর تعالى কাছে আশ্রয় চায়, বলে, “আ’উযুবিল্লাহি মিনাশ শাইত্বনির রজীম” অর্থাৎ “আমি বিতাড়িত শয়তানের কাছ থেকে আশ্রয় চাই” — তখন সে পালিয়ে যায়। তারপর মানুষ যখন আবার দুর্বল হয়ে যায়, তখন সে আবার আসে। আবার ওয়াসওয়াসা দেয়। এভাবে সে তার কাজ চালিয়ে যেতেই থাকে, যতক্ষণ না সে মানুষকে পরাজিত করতে পারে।[১৭][৪]

শয়তানের সাথে মানবজাতি প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে যাচ্ছে। যে কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে শত্রু পক্ষ সম্পর্কে ভালো করে জানা। শত্রুর দুর্বলতা কোথায়, তার শক্তি কোথায়, সে কীভাবে কাজ করে, কীভাবে তাকে পরাজিত করা যায় —তা নিয়ে গবেষণা করা। তাহলেই শত্রুর সাথে যুদ্ধে যেতা সম্ভব। একারণে আমাদের ভালো করে জানা দরকার শয়তান কীভাবে কাজ করে।

সূত্রঃ কুরআনের কথা

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

nine + nineteen =