রমাদান এবং এতে মুসলিম নারীদের করণীয়

0
17
রমাদান ,মুসলিম নারী

হোসনে আরা বেগম : রোজা ইসলামের স্তম্ভ তথা ভিত্তিসমূহের মধ্যে একটি অন্যতম ভিত্তি। হাদীসে কুদসীতে রাসূল (সা:) শুভ সংবাদ প্রদান করেছেন যে, আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন, প্রত্যেক নেক কার্যের ছওয়াব দশ থেকে সাতশ’ গুণ পর্যন্ত প্রদান করে থাকি। কিন্তু রোযা শুধু আমারই উদ্দেশ্যে রাখা হয় বলে এর প্রতিদান আমি স্বয়ং নিজেই দেব।
যে কোন সমাজের ন্যায় মুসলিম সমাজের অর্ধেক নারী। আর পবিত্র রমজানে মুসলিম নারীর করণীয় বিষয়ে লিখিত হয়েছে এ প্রবন্ধ। রাসূলে করীম (সা:) রজব মাস থেকে এ দোয়া পড়তেন ‘আল্লাহুম্মা বারিকলানা ফি রাজাবা শাবান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! রজব এবং শাবান আমাদের জন্য বরকত নাযিল কর এবং রমজান পর্যন্ত তা বর্ধিত কর। বলতে গেলে মধ্য শাবানে শবেবরাত থেকেই তাঁর প্রস্তুতি চূড়ান্ত রূপ নিত। আমরাও এইভাবে মানসিক, শারীরিক এবং আত্মিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারি। রোজার আসল উদ্দেশ্য হল তাকওয়া অর্জন করা। কুরআনে বর্ণিত আছে যে, হে ঈমানদারগণ, তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে। যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছিল। এখানে সম্ভব: তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারবে (আল-বাকারা: ১৮৩)। এখানে সম্ভবত শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এই শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। রোজা রাখলেই তাকওয়া অর্জন হয়ে যায় না। বহু রোজাদার রোজা রাত্রি জাগরণ এবং ক্ষুৎপিপাসার কষ্টছাড়া আর কিছুই নয়। তাকওয়া অর্থ হলো ভয় করা আভিধানিক অর্থ হলো আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সকল আদেশ পালন করা এবং এবং তাদের সকল নিষেধ পরিহার করা এবং যাবতীয় হারাম কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখা। তাকওয়া অর্জনের জন্য আত্মিক সাধনা প্রয়োজন। রোজা শুধু উপবাস নয় বরং তা হলো অন্তরের রোজা, পেটের রোজা, কানের রোজা, চোখের রোজা, জিহ্বার রোজা, হাতের রোজা, পায়ের রোজা, সোজা কথা পঞ্চইন্দ্রিয়ের রোজা। নিশ্চয় ঐসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একদিন আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করবে।
রোজা রাখলে সব অশ্লীল কাজ ও কথাবার্তা থেকে বিরত থাকতে হবে। এই রোজা প্রতি বছর ফিরে আসে আমাদের কাছে মেহমানের মত। সুতরাং আমরা এর সমাদর করব। যেমন আমাদের ঘরে কোন মেহমান এলে আমরা মেহমানের সম্মানে ঘর সাবাই, নিজে সাধ্যমত সেজেগুজে থাকি। বাসায় বাচ্চাদের বেশি ঝামেলা করতে দেই না এবং সাধ্যমত ভাল খাবার-দাবারের আয়োজন করে থাকি। তদ্রুপ রোজাও আমাদের কাছে মেহমানস্বরূপ। এই রোজার মাস হল ট্রেনিংয়ের মাস। এ মাসে আমরা দিনে রোজা রাখবো সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকবো এবং রাতের কিছু অংশ ইবাদত বন্দেগিতে কাটাবো। এই মাসে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি করে গুনাহ মাফের জন্য দোয়া করতে হবে এবং সাথে সাথে আমাদের ছেলেমেয়ে, স্বামী, বাবা-মা, ভাইবোনদেরকে এভাবে দোয়া করার তাগিদ দিতে হবে। এতে করে রোজা এবং তাকওয়ার প্রতি আমাদের উৎসাহ আরও বেড়ে যাবে। রমজান শুধু কুরআন খতমই যথেষ্ট নয়, অর্থ ও ব্যাখ্যাসহ বুঝে পড়া প্রয়োজন। প্রতিদিন কুরআনের কয়েকটি আয়াত ও ২/৩টি হাদিস এবং সাধ্যানুযায়ী ইসলামী বই পড়া উত্তম। বই পড়ার সময় ভাল বই নির্বাচন করতে হবে। যেমন হযরত মোহাম্মদ (সা.)এর জীবনী, সাহাবীদের জীবনী এবং মহিলা সাহাবাদের জীবনী ইত্যাদি।
রোজার মধ্যে নামাজ রোজার তাৎপর্যের উপর লিখিত বইগুলো বেশি বেশি পড়তে হবে। এসব বই পড়ার ফলে আমরা মুসলমানদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে জানতে পারব। আসলে আমাদেরকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে এবং আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য কি? এসব বিষয়ে পড়াশোনা করা সারারাত ইবাদতের চেয়েও উত্তম। রাসূল (সাঃ) আরো বলেছেন, জ্ঞানীর কলমের এক ফোঁটা কালি শহীদের রক্তের চেয়েও দামী। নামাজ এবং সকল প্রকার ইবাদতের সাওয়াব আল্লাহতায়ালা এই মাসে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দিয়েছেন। অন্য মাসে একটা ফরয ইবাদত করলে একটা সওয়াব পাওয়া যায় এবং এই রমজান মাসে একটা ফরজ ইবাদত করলে ৭০টি ফরজের সওয়াব পাওয়া যায়। তদ্রুপ রমজানে একটা নফল আদায় করলে একটা ফরযের সমতুল্য সওয়াব পাওয়া যায়। আমরা এই বিষয় জানলেই মানতে পারব এবং অন্যদেরওক বলতে পারব। যদি আমরা না জানি তাহলে কি করে মানব? আর এই মাসে এক বিরাট সুযোগ এই যে, অন্য সময় আমরা ভোর রাতে উঠতে পারি না কিন্তু এই মাসে সেহ্রী খাওয়ার জন্য আমাদেরকে নিয়মিত উঠতে হয়। তাই আমরা চেষ্টা করলে এই সময় কয়েক রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতে পারি। মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহ্র পেয়ারা বান্দা হতে হলে তাহাজ্জুদ নামায এবং জিকির ছাড়া সম্ভব নয়। আল্লাহ্ এই নামাজের ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। আল্লাহ্ বলেছেন, রোজার শেষ দশ দিনের মাঝে ‘শবেকদর তালাশ করার জন্য। কারণ এই শবে কদরে সারা রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই দশ দিন এতেকাফ করার চেয়ে উত্তম আর কি হতে পারে?
জিকর: জিকর অর্থ স্মরণ করা। সব সময় আল্লাহ্র হুকুম আহকামগুলো স্মরণ করা মূলত জিকর। আল্লাহ্ বলেন, তোমরা আমাকে স্মরণ কর আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো (সূরা: বাকারা-১৫২)। এছাড়া অন্তরের জিকর দ্বারা প্রশান্তি লাভ করা যায়। ‘আল্লাহ্র জিকর দ্বারা মোমিনের রূহ বা অন্তর সান্ত¦না লাভ করে’ (সূরা রাদ-২৮)। জিকর এমন কিছু দোয়া যা আমরা ইচ্ছা করলেই করতে পারি। যেমন: আমরা সব সময় আমাদের সাংসারিক কাজে এবং চাকরি করলে অফিসিয়াল কাজ কর্মে ব্যস্ত থাকি কিন্তু আমাদের মুখ সব সময় ব্যস্ত থাকে না। আমরা হাতে কাজ করবো এবং মুখে আল্লাহ্কে স্মরণ করবো এবং আল্লাহ্র জিকর করবো। এতে করে আমাদের মনটাকে একটা কাজ দেয়া হয়। তা না হলে আমাদের মন ক্ষণিকে অনভিপ্রেত কাজে চলে যায়। নানারকম কুচিন্তা করে। কাজেই জিকর মনটাকে আটকিয়ে রাখার একটা ভাল মাধ্যম। এছাড়া মনে ও মুখে যেন কোন বাজে চিন্তা ও কথা না আসে।
অনর্থক কথা বার্তা মুখে না আসার জন্য মনে মনে এসব জিকর ও দোয়া পড়া যায়।
ক) লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ
খ) ছুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী ছুবহানাল্লাহির আ’জিম
গ) ছুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার
ঘ) লা হাওলা ওয়ালাকুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহ
ঙ) পাঁচ কালেমা পড়া
চ) আল্লাহুম্মা আজিরনা মিনান্নার
ছ) ছুবহানাল্লাহি, ওয়াল হামদুলিল্লাহি,
আল্লাহু আকবার দোয়া বললে অনেক সহজ কিন্তু ফজিলত অনেক বেশি। এক কথায় বলা যায়। বলা খুব সহজ কিন্তু মিজানের পাল্লায় অনেক ভারী। আমরা যদি জেনে থাকি তাহলে বাসার কাজ কর্ম করার সময়ও এসব দোয়া পাঠ করতে পারি। রোজার সময় তাড়াতাড়ি কাজ শেষ করে ইফতারের ৫/১০ মিনিট আগে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসে কিছু দোয়া পাঠ করা বা কিছু হাদিস পড়া।
সবশেষে ছোট একটা মুনাজাত করা। ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। আমরা মহিলারা চাইলে আসলে অনেক কিছু করতে পারে। যেমন আমি প্রথমে আমার ছেলেমেয়েদের এইভাবে গড়ে তুলব। তারা এভাবে ওয়াক্তমত নামাজ পড়বে এবং পর্দা করবে এবং আল্লাহর হুকুম আহকাম মেনে চলবে। তারপর মেয়ে তার সার্কেলে চেষ্টা করবে। তার বান্ধবীদের এভাবে ঠিক করার জন্য এবং ছেলে চেষ্টা করবে তার বন্ধুদের এবং স্বামী চেষ্টা করবে তার সহকর্মী বন্ধুবান্ধবদেরকে সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য। এছাড়া আমাদের বাসায় কোন মেহমান বা আত্মীয়স্বজন আসলে দ্বীনের দাওয়াত দিতে পারি। এভাবে আমাদের ইচ্ছা থাকলে এবং আল্লাহ্ সাহায্য করলে আমরা পরিবার, তথা সমাজ এবং আস্তে আস্তে রাষ্ট্রীয়ভাবেও এ কাজে অগ্রসর হতে পারব ইনশাআল্লাহ। এজন্যই নেপোলিয়ন বলেছেন, ‘আমাকে একটা শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদেরকে একটি শিক্ষিত জাতি উপহার দেব’।
এসব কিছু করতে হলে আমাদের আচার ব্যবহার এমন হতে হবে যাতে করে আমাদের ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে এই পথে আকৃষ্ট হয়। আমাদের মনে থাকে আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন। আমাদের আচার ব্যবহারে রাসূল (সা.)কে অনুসরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ্ বলেছেন, ‘তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চরিত্রে রয়েছে উত্তম আদর্শ’ (সূরা আহযাব ২১)। আল্লাহ্ ভীতি, ভদ্রতা, ন¤্রতা, লজ্জাশীলতা, মহানুভবতা, উদারতা, ক্ষমা, ভালবাসা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, পরোপকার, কল্যাণ কামনা, দান, অন্যের বিপদে সাহায্য করা মুসলমানদের অন্যতম। এ বৈশিষ্ট্যগুলো নিজেদের মধ্যে পুনর্জাগরণের চেষ্টা করা। সব শেষে নিজেদের জমা টাকা এবং অলংকার থাকলে এগুলো যাকাত হিসেব করে প্রথমে নিজের আত্মীয় স্বজন থাকলে তাদেরকে দিতে হবে এবং ধাপে ধাপে আরও কিছু প্রয়োজনীয় কাজে যেমন কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাকে দিতে হবে এবং কেউ অসুস্থ থাকলে তার সাহায্যের জন্য কিছু দিতে হবে। তবে সবচেয়ে উত্তম হলো ইসলামের বিধান অনুযায়ী যেমন একবার এক ব্যক্তিকে যাকাতের টাকা দিয়ে তার একটা ইনকামের ব্যবস্থা করে দিতে পারলে ভাল হয়। যেন ঐ ব্যক্তি এ টাকা দিয়ে বেঁচে থাকতে পারে এবং তার আর পরবর্তী বছর যাকাতের দরকার না হয়। এছাড়া যাকাত ছাড়াও আমরা নিজেদের খরচের টাকা থেকে কিছু দান খয়রাত করতে পারি। এতে করে আমরাই লাভবান হব। সব সময় মনে রাখতে হবে যে আল্লাহর সন্তুষ্টি। আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারলে আমরা দু’জাহানে লাভবান হব ইনশাআল্লাহ। রমজান হল জিহাদের মাস। আর সবচেয়ে বড় জিহাদ হলো নফসের বিরুদ্ধে জেহাদ। এ জন্য সব সময় আল্লাহকে স্মরণ করা, কবরের কথা ভাবা। আমাদের আত্মীয়স্বজন যারা এ দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছেন তারা কিভাবে আছেন। আমরাও তো এভাবে চলে যাব। নেক কাজ যদি কিছু করে যেতে পারি তাহলে এটাই আমার কাজে লাগবে। এখন না করে পরে করব বলে ফেলে রাখলে হবে না। কারণ কারো মৃত্যু বলে কহে আসে না। আমি যে পরে সময় পাব এমন কি নিশ্চয়তা আছে। সব মানুষ তো বৃদ্ধ হয়ে মরে না। অনেক সময় যুবক যুবতী অবস্থায় মারা যায়। তাই ভবিষ্যতের আশা না করে এখন থেকে শুরু করে দিই। অতীতের গুনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নেই। আল্লাহ্ খুবই দয়ালু এবং রাহমানুর রাহীম। তবে মনে মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিতে হবে যে, অতীতে যে মাপ করেছে তা আর ভবিষ্যতে করব না। এই বলে ক্ষমা চাইতে হবে। মিথ্যা কথা বলা, অন্যকে ঠকানো, অন্যের হক নষ্ট করা, গীবত করা, সকল নাফরমানী থেকে বিরত থাকা। এসব থেকে বিরত থাকলে আল্লাহ্ আমাদেরকে ক্ষমা করবেন।

আরও পড়ুনঃ   ইসলামে নারীর অধিকার

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × one =