রোগীর সেবা করাও ইবাদত

0
28
রোগীর সেবা করা ইবাদত

মুফতি মুহাম্মাদ শোয়াইব:  পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের মধ্যে কেউ যদি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাকে দেখতে যাওয়া ও তার অবস্থা জিজ্ঞেস করা মুস্তাহাব। যদি রুগ্ণ ব্যক্তির দেখাশোনা করার মতো তার কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকে, তাহলে সর্বসাধারণের মধ্যে তার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের ওপর তার সেবাশুশ্রুষা করা ফরজেকেফায়া।

রাসূলুল্লাহ সা: ইরশাদ করেন, এক মুসলমানের ওপর অপর মুসলমানের হক পাঁচটি- সালামের জবাব দেয়া, রোগীকে দেখতে যাওয়া, জানাজায় শরিক হওয়া, দাওয়াত কবুল করা, হাঁচির জবাব দেয়া। (বুখারি, মুসলিম ও মিশকাত শরিফ : হাদিস নম্বর ১৫২৪)। হজরত বারা ইবনে আজিব রা: বলেন, রাসূলুল্লাহ সা: আমাদের সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন- প্রথম, রোগীর শুশ্রুষা করা; দ্বিতীয়, জানাজার পশ্চাতে চলা। তৃতীয়, হাঁচিদাতার জবাবে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা; চতুর্থ, দুর্বল মানুষের সাহায্য করা। পঞ্চম, নিপীড়িত ব্যক্তিদের সাহায্য করা; ষষ্ঠ, সালামের প্রচার-প্রসার ঘটানো; সপ্তম, কসমকারীর কসমকে পুরা করতে সাহায্য করা (বুখারি শরিফ ৭/১১৩ : হাদিস নম্বর ৫৬৩৫)।

সর্বপ্রথম রাসূল সা: যা বলেছেন তা হচ্ছে, রোগীর সেবাযত্ন করা। অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতার কথা জিজ্ঞেস করা। রাসূলুল্লাহ সা: নিজেও রোগীর সেবাশুশ্রুষা করতেন। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: এক অসুস্থ ইহুদি গোলামকে দেখতে গিয়ে তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন।

এই আমলটি সাধারণত আমরা সবাই করি। তবে বর্তমানে রোগীর সেবাশুশ্রুষা শুধু একটি প্রচলন হয়ে গেছে। আমরা অসুস্থ ব্যক্তির শুশ্রুষা করতে যাই লোকলজ্জার ভয়ে। লোকলজ্জার মানসিক চাপ নিয়ে রোগীর শুশ্রুষা করলে আখেরাতের নেক সাওয়াবের আশা করা যায় না। সাওয়াব লাভ করার জন্য ইখলাস বা আন্তরিকতা ও আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা থাকা জরুরি। এক হাদিসে কুদসিতে বিষয়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভাষায় উল্লেখিত হয়েছে। হাদিসটি এই- ‘কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আমার বান্দা! আমি তোমার প্রভু। আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসনি। বান্দা বলবে, হে প্রভু! আপনি বিশ্বজাহানের প্রতিপালক, আমি কিভাবে আপনাকে দেখতে যেতে পারি? আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল? যদি তুমি তাকে দেখতে যেতে তাহলে তুমি সেখানে আমাকে পেতে। আল্লাহ তায়ালা আবার বলবেন, হে আমার বান্দা! আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে খাবার দাওনি। বান্দা বলবে, ইয়া রব! আমি আপনাকে কিভাবে খাবার দিতে পারি? আপনি হলেন সারা জাহানের পালনকর্তা। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল, কিন্তু তুমি তাকে খাবার দাওনি। যদি তুমি তাকে খাবার দিতে তাহলে আজ আমাকে কাছে পেতে। পুনরায় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম, তুমি আমাকে পানি দাওনি। বান্দা আগের মতোই উত্তর দেবে। আল্লাহ তায়ালা বলবেন, তোমার কি স্মরণ আছে, আমার এক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল; কিন্তু তুমি তাকে পানি দাওনি? তুমি কি জানো, তুমি যদি সেদিন তাকে পানি দিতে তাহলে তার প্রতিদানে আজ আমাকে কাছে পেতে।’ (বুখারি শরিফ : রোগীর সেবা করার ফজিলত, রিয়াদুস সালেহিন)। অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, ক্ষুধার্তকে খাবার খাওয়ানো, পিপাসার্তকে পানি পান করানো- এগুলো হলো মানুষের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশের মাধ্যম। সহানুভূতি এমন এক মহৎ গুণ, যার কারণে মানুষ আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে পারে।

আরও পড়ুনঃ   একামতে দ্বীনের কাজ করা সবার জন্য ফরজ

আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তির সেবাশুশ্রুষা করলে, যতটুকু সময় ধরে সেবা করে ততটুকু সময় সে ধারাবাহিকভাবে জান্নাতের বাগিচায় বিচরণ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত সে প্রত্যাবর্তন না করে।’ (সহি মুসলিম, কিতাবুল বির ওয়াস সেলাহ)

অন্য হাদিসে ইরশাদ হয়েছে, ‘কোনো মুসলমান ব্যক্তি অপর মুসলমান ব্যক্তিকে সকালে সেবাশুশ্রুষা করলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য দোয়া করতে থাকে। সন্ধ্যায় সেবাশুশ্রুষা করলে সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত ৭০ হাজার ফেরেশতা তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে তার জন্য একটি বাগান নির্দিষ্ট করেন।’

এটা কোনো সাধারণ প্রতিদান নয়। মাত্র একটু মেহনতের দ্বারা মেহেরবান আল্লাহ আমাদের কী পরিমাণ সাওয়াব দান করছেন! তার পরও কি আমরা এই চিন্তা করব যে, অমুকে তো আমি অসুস্থ হওয়ার পর আমাকে দেখতে আসেনি। আমি কেন তাকে দেখতে যাবো? এজাতীয় চিন্তা দ্বারা যে আমার নিজের আখেরাত ধ্বংস হচ্ছে, আশা করি তা বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। অমুক যদি সাওয়াব অর্জন না করে, তার যদি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়ার দরকার না হয়, সে যদি জান্নাতের বাগিচা অর্জন করতে না চায় তাহলে আমিও কি তা অর্জন করব না? আমি কি অমুকের সাথে হিংসা করে আমার আখেরাত নষ্ট করব? আমি কি ৭০ হাজার ফেরেশতার দোয়া থেকে বঞ্চিত হব? আমার কি জান্নাতের বাগিচার দরকার নেই?

যদি রোগীর পক্ষ থেকে আমি কষ্ট পেয়ে থাকি অথবা তার সাথে আমার আন্তরিকতা না থাকে, তারপরও তার সেবাযত্নের জন্য আমার যাওয়া উচিত। এতে দ্বিগুণ সাওয়াবের অধিকারী হব ইনশাআল্লাহ। একটি হচ্ছে রোগীর সেবাশুশ্রুষা করার সাওয়াব। অপরটি হচ্ছে এ রকম মুসলমানের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার সাওয়াব, যার ব্যাপারে আমার অন্তরে সঙ্কোচ রয়েছে। এ সঙ্কোচ ও লজ্জা থাকা সত্ত্বেও তার সাথে বন্ধুত্বসুলভ সহমর্মিতার আচরণ করার ওপর পৃথক প্রতিদান পাবো ইনশাআল্লাহ। সুতরাং রোগীর সেবাশুশ্রুষা ও তার সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া কোনো মামুলি বিষয় নয়। তাই অত্যন্ত নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে শুধু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য রোগীর সেবাশুশ্রুষা করলে ইনশাআল্লাহ অগাধ প্রতিদান পাওয়া যাবে। লেখক : মাদরাসা শিক্ষক

আরও পড়ুনঃ   আল্লাহর কাছে দোয়া কবুলের জন্য যে দরূদটি পাঠ করা খুবই জরুরি? জেনে নিন এখনই

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

3 × three =