শিশুর অধিকারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উত্তম আদর্শ

0
20
শিশুর অধিকার

ড. মুফতী আবদুল মুকীত আযহারী: আর আমরা দেখি আমাদের বর্তমান সমাজে শিশুদের উপর কেমন জুলুম-অত্যাচার করা হয়। একবার গাড়ি সারাতে গ্যারেজে গিয়েছিলাম। আমাদের দেশের গ্যারেজে অনেক শিশু কাজ করে। মূল মিস্ত্রিকে নানান জিনিস এগিয়ে দেয় এবং বিভিন্নভাবে সাহায্য করে। হেল্পার হিসেবে কাজ করে। তখন একটা শিশুকে বলা হলো, ঐটা নিয়ে আস। শিশুটি ঐ জিনিসটিই এনেছে। তারপরও শিশুকে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল, এত দেরি করলি কেন। আবার বলল, এই জিনিসটা ধর। শিশুটি সে জিনিসটা ঠিকভাবে ধরার পরেও থাপ্পড় দিয়ে বলে এরকম করে ধরলি কেন। শিশুটি ছোট-খাট ভুল বা বিনা ভুলে থাপ্পড়, লাথি খেয়েই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এই শিশুটির জন্মই হয়েছে শুধু মার খাওয়ার জন্য। টেম্পুতে হেল্পার হিসেবে কাজ করে অনেক শিশু। গাড়ির চালক শিশুটিকে এই বলে মারে যে, তুই আস্তে আস্তে কেন যাত্রীদেরকে ডাকছছ। বড় আওয়াজে কেন ডাকিস না। আবার যাত্রীরাও ধমক দেয়, মারে। এই তোর ভাংতি দিতে এত দেরী হল কেন? এই শিশুগুলো শুধু ধমক আর যন্ত্রণা পেয়েই যায়। কেউ একটু তাদেরকে আদর দেখায় না। এতিম
আমরা যখন ছোটবেলায় মসজিদে যেতাম, সেই সময়ের কথা। বাচ্চারা তো মসজিদে একটু দুষ্টামি করে। এমনিভাবে তো একটু দৌড়াদৌড়ি করে। তখন মসজিদের খাদেম সাহেবের কাছে একটা লাঠি থাকত। এ লাঠি শুধু শিশুদেরকে মারার জন্য। খাদেম সাহেব সেই লাঠি দ্বারা সবাইকে পিটাতে থাকত। কেউ হয়ত দুষ্টামি করছে আবার কেউ দুষ্টামি করছে না। কিন্তু সে গণহারে সবাইকে পিটাত। একবার চিন্তা করলাম শিশুদের সঙ্গে থাকব না, একটু সামনে যাব। এক শুক্রবার সবার আগে মসজিদে গিয়ে প্রথম কাতারের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি শিশু বলে একজন বলল, এই ছেলে, পিছনে যাও! তখন দ্বিতীয় কাতারের এক পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণ পর আবার আরেকজন এসে বলল, এই ছেলে, পিছনে যাও! এভাবে পিছনে যেতে যেতে আবার সেই শেষ কাতারে শিশুদের সঙ্গে দাঁড়াতে হল। আবার সেই খাদেম সাহেবের পিটুনি..এটা হল আমাদের দুনিয়ার সমাজ। শিশুদের সঙ্গে কঠোর ব্যবহার করা, দুর্ব্যবহার করা এটা আমাদের রীতিতে পরিণত হয়ে গেছে।
একবার রাসূল সা. হযরত আয়েশা রা.-এর বাসা থেকে বের হয়ে হযরত ফাতেমা রা.-এর বাসার সামনে দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। তখন হযরত হোসাইন রা. কাঁদছিলেন। তাই রাসূল সা. ছটফট করছিলেন আর তার কান্নাও থামছিল না। এভাবে আর সহ্য করতে না পেরে রাসূল সা. হযরত ফাতেমা রা. এর বাসায় গেলেন এবং দরজা ধাক্কা দিয়ে বলছেন, হে আমার মেয়ে! বাচ্চাটাকে একটু থামাও। তুমি কি জানো না, তার কান্না আমাকে অনেক কষ্ট দেয়।
একবার রাসূল সা. বসে ছিলেন। হঠাৎ হযরত হাসান বা হোসাইন রা.-এর কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলেন। রাসূল সা. সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং হাঁটা শুরু করলেন। কান্নার আওয়াজ বরদাশত করতে পারছিলেন না। তখন রাসূল সা. নিজেই বললেন, আমি ওদের কান্নার আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে হাঁটা শুরু করেছি আর আমি নিজেও বুঝি নাই কেন আমি হাঁটা শুরু করলাম।  শিশুদের প্রতি যে এত ভালোবাসা, এত মায়া, যেন এ ক্ষেত্রে রাসূল সা. এর নিজের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ নেই।
এ সম্পর্কে একটা হাদীস আছে। রাসূল সা. বলেন, যখন এতিম শিশু কাঁদে তখন আল্লাহর তাআলার আরশ কাঁপা শুরু করে। তখন আল্লাহ তাআলা ফেরেশতাদের বলেন, দেখ, শিশুটিকে কে কাঁদিয়েছে? আমি এ শিশুটির বাবার জীবন কবজ করেছি এবং তাকে মাটিতে আচ্ছাদিত করেছি। ফেরেশতাগণ বলেন, হে আমাদের পালনকর্তা! এ ব্যাপারে আমাদের জানা নেই। তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, তোমরা সাক্ষী থাক, যে ব্যক্তি এ শিশুটিকে খুশি করবে আমিও তাকে কেয়ামতের দিন খুশি করব।  রাসূল সা. বলেন, যে ব্যক্তি কোন এতিম শিশুকে সাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত খাবার ও পানীয় অর্থাৎ সকল প্রয়োজন পূরণের মাধ্যমে আপন করে রেখেছে তার জন্য অবশ্যই জান্নাত ওয়াজিব।  বর্তমান সময়ে আমরা দেখি কত শিশু আদরের জন্য কাঁদছে। ঘরে ঘরে শিশুরা, পরিবারের লোকজন কাঁদছে। হয়তো বা শিশুটির বাবার উপর জুলুম হয়েছে বা শিশুটির বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছে। কত শিশু ঘরে ঘরে কাঁদছে আর এই ঘরের কান্নার জন্য আল্লাহ তাআলার আরশ কাঁপছে। তাহলে কিভাবে আমরা আল্লাহ তাআলার রহমতের আশা করি?
হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, একবার রাসূল সা. এশার নামাজে ইমামতি করছিলেন। অবাক করা ঘটনা। হয়ত বা বলবেন, আমি এসব ঘটনা বানিয়ে বলছি। রাসূল সা. যখন নামাজের মধ্যে সেজদায় গেলেন তখন শিশু হাসান ও হুসাইন এসে রাসূল সা.-এর পিঠে চড়ে বসলেন। সাহাবাগণ তাদেরকে সরানোর চেষ্টা করলে রাসূল সা. তাদেরকে বাঁধা দিতে নিষেধ করেন। নামাজের পরে রাসূল সা. তাদেরকে (হাসান ও হুসাইন) কোলে বসালেন তারপর সাহাবাগণ রা.-কে উদ্দেশ্য করে বললেন, যারা আমাকে ভালবাসবে তারা অবশ্যই এ দু’জনকে ভালবাসবে।  রাসূল সা. বলেন, এই শিশু হাসান ও হুসাইন আমার পৃথিবীর সুগন্ধি (আমি এদের ঘ্রাণে আনন্দ অনুভব করি)।
হযরত আবু বকরাহ রা. বলেন, রাসূল সা. মিম্বারে বসা ছিলেন এবং তাঁর পাশে হযরত হাসান রা.। রাসূল সা. একবার লোকজনের দিকে তাকাচ্ছেন আরেকবার হযরত হাসান রা.-এর দিকে তাকাচ্ছেন। তখন রাসূল সা. বলেন, ‘আমাদের এ শিশু হাসান নেতা, আল্লাহ তাআলা তার মাধ্যমে আমার উম্মতের মধ্যে বিভক্ত দু-দলের মাঝে ঐক্য তৈরি করবেন।’  নামাজের মধ্যে শিশুরা আমাদের পিঠে উঠে বসলে আমরা বকাঝকা করি, না হয় কমপক্ষে রাগ হই। আর রাসূল সা. বকা দেওয়া তো দূরের কথা বরং শিশুদের ঝামেলার প্রতি রাগও প্রকাশ করেননি। হযরত আলী রা.-এর শাহাদাতের পরে তাঁর অনুসারীরা হযরত হাসান রা.-কে খলিফা নিযুক্ত করেন। আর অন্য দিকে হযরত মোয়াবিয়া রা.-এর বিরাট এক অনুসারী ছিল। তাদের মধ্যে যুদ্ধও হয়। তখন হযরত হাসান রা. হযরত মোয়াবিয়া রা.-এর কাছে চিঠি পাঠান যে, আমি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে এরকম বিভক্তি চাই না। তাই আমি আপনার হাতে বাইয়াত করে আপনার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করছি। যাতে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে আর বিভক্তি না থাকে।
হযরত শাদ্দাদ বিন আউস রা. বলেন, একবার আসরের নামাজে রাসূল সা. এর সঙ্গে জামাতে নামাজে পড়লাম। হযরত হাসানকে নামাজে নিয়ে এসেছেন। তাকে পাশে বসিয়ে রাসূল সা. নামাজের ইমামতি করেছেন। আমি দেখলাম, রাসূল সা. সেজদায় গিয়ে সেজদা থেকে আর উঠছেন না। অনেক দেরী হওয়ায় আমি সেজদা থেকে মাথা উঁচু করে দেখলাম, কী ব্যাপার, কী হয়েছে? রাসূল সা. সেজদা থেকে মাথা ওঠাচ্ছেন না কেন? তখন দেখি, হযরত হাসান রাসূল সা.-এর পিঠে বসে আছে তাই তিনি সেজদা থেকে উঠছেন না। রাসূল সা. অনেক দেরী করে সেজদা থেকে উঠলেন। নামাজের পর সাহাবাগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আজ আপনাকে সেজদায় এত দেরি করতে দেখলাম যে এরকম আর কখনো দেখিনি। আমরা ধারণা করেছিলাম, হয়ত কোন কিছু ঘটেছে অথবা আপনার ওপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। রাসূল সা. বলেন, কোন কিছু ঘটেনি। আমার নাতি আমাকে বাহন (ঘোড়া) মনে করেছ তাই আমিও আমার নাতির মজায় ব্যাঘাত করতে চাইনি। আমি তার খেলা তাড়াতাড়ি শেষ করতে চাইনি। এজন্য সেজদায় দেরি করেছি।  এরকম যদি আপনাদের ইমাম বা খতিব সাহেব তার ছেলে নিয়ে নামাজ পড়তে আসে আর তার ছেলে নামাজের মধ্যে এভাবে পিঠে উঠে বসে থাকে আর খতিব সাহেবও শিশু ছেলের মজার জন্য এভাবে সেজদায় দেরি করে তবে আপনারা কী করবেন? আপনাদের আচরণ কেমন হবে?
হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, আমরা রাসূল সা. এর সঙ্গে এশার নামাজ পড়ছিলাম। রাসূল সা. যখন সেজদায় যাচ্ছেন তখন শিশু হযরত হাসান ও হুসাইন রা. রাসূল সা.-এর পিঠে লাফ দিয়ে চড়ছে। রাসূল সা. যখন সেজদা থেকে মাথা ওঠাচ্ছেন তখন খুব ধীরে ধীরে মাথা ওঠালেন। যাতে পিঠে শিশু হাসান রা.-এর কোন সমস্যা না হয় এবং তাদেরকে আলতো করে ধরে নামাচ্ছেন। আবার যখন সেজদায় গেলেন তখন আবার শিশু হাসান রাসূল সা.-এর পিঠে চড়লেন। রাসূল সা. এভাবে ধীরে ধীরে সেজদা থেকে উঠলেন। এভাবে তিনি নামাজ শেষ করে তাদেরকে কোলে বসালেন।  কেউ হয়ত প্রশ্ন করতে পারে যে, নামাজ পড়া আল্লাহর কাজ আর শিশুর প্রতিপালন বা শিশুদেরকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করা তো আমাদের কাজ বা দুনিয়ার কাজ। তবে কি আমরা আল্লাহর কাজের চেয়ে মানুষের বা দুনিয়ার কাজ অগ্রাধিকার দিব। রাসূল সা. কি নিজের প্রিয় নাতির আনন্দকে আল্লাহর কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন? নাউজুবিল্লাহ। রাসূল সা. আমাদের সামনে এ শিক্ষা রেখে গেছেন যে, শিশুদেরকে ভালবাসা, তাদেরকে আনন্দ দেয়াটাও আল্লাহর কাজ বা নামাজের সেজদায় ত্রুটি হওয়া থেকেও উত্তম।
এর চেয়ে আরো আশ্চর্যজনক ঘটনা। হযরত উমামা রাসূল সা.-এর মেয়ে হযরত জায়নাব রা. এর শিশুকন্যা। রাসূল সা.-এর এ মেয়ের স্বামী আবুল আস ইবনুর রাবী তখনো অমুসলিম ছিলেন। হযরত আবু কাতাদা রা. বলেন, রাসূল সা. শিশু উমামাকে নিয়ে মসজিদে আসেন। উমামা অনেক ছোট ছিল। রাসূল সা. সে নাতনিকে কোলে নিয়ে নামাজ পড়ান। যখন রুকু বা সেজদায় যেতেন তখন তাকে মাটিতে রাখতেন। আর যখন দাঁড়াতেন তখন সে শিশু উমামাকে কোলে তুলে নিতেন। এভাবে শিশু উমামাকে কোলে নিয়ে নামাজ শেষ করেন।  যদি এ যুগে কোন ইমাম সাহেব বা কোন খতিব সাহেব এমন করে তবে সকল মুসল্লিরা নামাজ ছেড়ে তার পিছনে নামাজ পড়তে হয়তবা অস্বীকৃতি জানাবেন।
হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, একবার রাসূল সা. বাসা থেকে বের হয়েছেন। আমিও রাসূল সা.-এর সঙ্গে বের হলাম। আমি মনে করলাম, তিনি হয়ত জরুরী কোন কাজে যাচ্ছেন। তিনি কাইনুকা বাজারে গেলেন। ওই বাজারের কাছে হযরত ফাতেমা রা.-এর বাসা ছিল। তিনি হযরত ফাতেমা রা.-এর বাসার সামনে গিয়ে বসেছেন। তিনি তখন বলছিলেন, দুষ্টটা কোথায়? দুষ্টটা কোথায়? হযরত আবু হুরাইরা রা. বলেন, হযরত ফাতেমা রা. তার শিশুদেরকে সাজিয়ে দিচ্ছিলেন যার কারণে তাদের আসতে দেরি করছিল। তাদেরকে ভাল জামা পরানো ও সাজানোর পরে তারা আসে। শিশু হাসান ও হুসাইন নানাকে দেখে দূর থেকে দৌড়ে এসে তাঁর কোলে উঠে বসলেন। তিনি এক হাতে হুসাইনের পা ও অন্য হাতে তার মাথা ধরে তার গালে ও ঠোঁটে চুমু খেলেন। বাজারের মধ্যে মানুষের সামনে এভাবে আদর করেছেন। বাজারের সবাই দেখে অবাক হচ্ছিল যে, রাসূল সা. এত বড় ব্যক্তি, অথচ তিনি বাজারের মধ্যে এভাবে শিশুদেরকে আদর করছেন। তিনি তখন বললেন, হে আল্লাহ, আমি এ শিশুদেরকে ভালবাসি। আপনিও তাদেরকে ভালবাসেন। আর যারা এ শিশুদেরকে ভালবাসবে আপনি তাদেরকেও ভালবাসেন।  রাসূল সা. শিশুদেরকে এতটা আদর করতেন। এতটা মায়া-মমতা করতেন।
আমরা অনেকে শিশুদেরকে ভালবাসি। তবে তাদের বিরক্তি করার কারণে আমরা অনেক সময় বেশি বিরক্ত হয়ে যাই। শিশুদের বিভিন্ন রকম ঝামেলার কারণে তাদের প্রতি রাগান্বিত হয়ে যাই এবং রাগ প্রকাশও করি। অনেক সময়ে মসজিদে নিয়ে আসতে চাই কিন্তু তাদেরকে নিয়ে আসলে তারা মসজিদে অনেক ধরনের ঝামেলা করে। যার কারণে অনেক আদর করতে চাইলেও বা তাদের অনেক আবদার পূরণ করতে চাইলেও এ সকল ঝামেলার কারণে আর আদর করা হয় না। অনেককে দেখেছি যে তারা শিশুদেরকে কোলেই নেয় না। কেন? কারণ কোলে শিশু পেশাব করে দেয় বা চশমা ধরে খুলে ফেলে। আর রাসূল সা. কখনো শিশুদের দ্বারা বিরক্ত হতেন না। হযরত উম্মে কাইস রা. বলেন, একবার এক শিশুকে আল্লাহর রাসূল সা.-এর কাছে আনা হয়েছে। রাসূল সা. সে শিশুকে কোলে বসিয়েছেন। তখন সে শিশুটি রাসূল সা.-এর কোলে পেশাব করে দেয়। আমাদের কোলে কোন শিশু পেশাব করলে আমরা কি করি? দুষ্ট কোথাকার? সব নাপাক করে দিল, কিভাবে এখন নামাজ পড়ব? আরো কত বিরক্তি প্রকাশ! আর রাসূল সা. তখন বিরক্তও হননি, বিরক্তি প্রকাশও করেননি। বরং যে ব্যক্তি শিশুটিকে নিয়ে এসেছিল সে বিরক্ত হচ্ছিল যে, হায় শিশুটি কী করে দিল? রাসূল সা. বলতে থাকলেন, না, কিছু হয়নি। কোন সমস্যা নেই। তিনি একটু পানি নিয়ে ধুয়ে ফেলেছেন। শিশুটিকে আবার আদর করে ফেরত দিয়েছেন।  হযরত আয়েশা রা. বলেন, একবার শিশু হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রা.-কে রাসূল সা.-এর কাছে আনা হয়। তখন সে রাসূল সা. এর কোলে পেশাব করে দেয়। আমি তাকে শক্তভাবে বকা দিলাম। রাসূল সা. শান্তভাবে বললেন, সে খায় না ও তার পেশাবও কোন ক্ষতি করবে না।
হযরত আব্দদুল্লাহ বিন জুবাইর রা. হযরত আবু বকর রা.-এর মেয়ে হযরত আসমা রা.-এর ছেলে। হিজরতের সময় হযরত আসমা রা. গর্ভবতী ছিলেন। মুসলমানগণ মদিনায় হিজরত করার পর ইহুদীরা একটি গুজব ছড়িয়ে দেয় যে, ইহুদীরা তাবীজ করেছে যার কারণে মুসলমানগণের কোন সন্তান জন্মগ্রহণ করবে না। ফলে কারো কারো মধ্যে একটি চাপা আতঙ্ক ছিল, সত্যিই কি মুসলমানগণের কোন সন্তান হবে না? হিজরতের পরে মুহাজির মুসলমানগণের মধ্যে সর্বপ্রথম হযরত আসমা রা.-এর সন্তান হয়। হযরত আব্দুল্লাহ বিন জুবাইর রা.-এর জন্ম হয়। সাধারণ মুসলমানগণ তাই অনেক খুশি হয়। শিশু  আব্দুল্লাহকে রাসূল সা.-এর কাছে আনা হয়। রাসূল সা. তাকে আদর করেন, কোলে বসান এবং মুখে খেজুর চিবিয়ে তার মুখে দেন। এভাবে সকল নবজাতক শিশুকে রাসূল সা.-এর কাছে বরকতের জন্য আনা হত এবং তিনি খেজুর চিবিয়ে শিশুর মুখে দিতেন। এটাকে তাহনীক বলা হয়।  অন্যকোন সহাবা এরকম করেননি তাই এটাকে শুধু রাসূল সা.-এর খাস সুন্নত বলা হয়।
হযরত উম্মুল ফজল রাসূল সা. এর কাছে এলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি একটি স্বপ্ন দেখেছি। আপনার শরীরের একটি অংশ আমার ঘরে আসছে। রাসূল সা. সাধারণত স্বপ্নের তা’বীর করতেন। প্রতিদিন ফজর নামাজের পরে বসতেন আর জিজ্ঞাসা করতেন, তোমাদের কেউ কোন স্বপ্ন দেখেছ?  হযরত আবু বকর ও হযরত ওমর রা.-সহ অন্যরা স্বপ্নের তা’বীর করতেন। রাসূল সা. সবার তা’বীর শুদ্ধ করে দিতেন যে, হা তোমার তাবীরের এ অংশ সঠিক হয়েছে আর অন্য অংশটির ব্যাখ্যা এমন হবে। তিনি উম্মুল ফজলের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করছেন এভাবে, আমার অংশ হযরত ফাতিমা রা.-এর পেটে একটা সন্তান হবে। সে সন্তান তোমার বাসায় তোমার সন্তান কুসামের সঙ্গে দুধ পান করবে। ঠিকই কিছুদিন পর হযরত ফাতেমার এক সন্তান হয় আর হযরত আলী ও ফাতেমা রা. সে সন্তানকে হযরত উম্মুল ফজলের কাছে দুধ পান করানোর জন্য প্রদান করেন।  হযরত উম্মুল ফজল রা. শিশু হাসানকে নিয়ে রাসূল সা.-এর কাছে আসেন। রাসূল শিশু হাসানকে কোলে নেন। কোলে নিয়ে তাকে আদর করছেন, দুষ্টামি করছেন। এর মধ্যে শিশু হাসান রা. রাসূল সা.-এর কোলে পেশাব করে দেন। তখন দুধ মা হযরত উম্মুল ফজল শিশু হাসান রা.-এর কাঁধে আলতো করে একটি থাপ্পড় মারেন। তুমি এটা কী করলা! রাসূল সা. তখন রাগ করে বললেন, তুমি আমার নাতিকে ব্যথা দিয়েছ।
রাসূল সা. কোন দিন কোন শিশুকে মারেননি। এমনকি কেউ কোন শিশুকে মারবে এটাও তিনি কখনো পছন্দ করতেন না। রাসূল সা.-এর কোলে পেশাব করেছে তাতেও তিনি বিরক্ত হননি, বিরক্তি প্রকাশ করেননি। এমনকি শিশু হাসানের দুধ মা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন বলে তিনি এটাকেও অপছন্দ করছেন। রাসূল সা. শিশুদের প্রতি এতটা দয়াবান ছিলেন।
হাবাশায় যে সাহাবাগণ হিজরত করেছিলেন তাদের মধ্যে হযরত খালেদ বিন সাইদ রা.-এর সঙ্গে তার মেয়েশিশু হযরত উম্মে খালেদ রা. ছিলেন। হযরত খালেদ রা. তার মেয়েকে নিয়ে রাসূল সা.-এর কাছে আসেন। তিনি তাকে আদর করেন, কোলে নেন। তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে সাহাবাগণের সঙ্গে কথা বলতে থাকেন। শিশু উম্মে খালেদ আগে শুনেছে যে রাসূল সা.-এর পিঠে নবুওয়াতের মহর আছে। পূর্ববর্তী নবীগণ রাসূল সা.-এর ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন এবং শেষ নবীর সত্যতার আলামতস্বরূপ তাঁর পিঠে নবুওয়াতের মহর থাকবে। রাসূল সা. যেরকম ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, শেষ যুগে দাজ্জাল আসবে, হযরত ঈসা আ. আসবেন, ইয়াজুজ মাজুজ আসবে। এমনিভাবে রাসূল সা.-এর নবুওয়াতের ব্যাপারে সকল নবী ভবিষ্যদ্বাণী করে যেতেন। তাই সে শিশু উম্মে খালেদ রাসূল সা.-এর পিছনে যান এবং কাপড় সরিয়ে নবুওয়াতের মহর দেখতে থাকেন। উম্মে খালেদের বাবা ও অন্য সহাবাগণ তাকে বকা দিতে শুরু করেন এবং রসূল সা.-এর কাপড় সরিয়ে নবুওয়াতের মহর দেখতে নিষেধ করতে থাকেন। তখন রাসূল সা. বললেন, তাকে ছাড়। তাকে দেখতে দাও, তাকে এটা নিয়ে একটু খেলতে দাও।
হযরত সায়েব বিন ইয়াজিদ রা. বলেন, আমি একবার আমার খালার সঙ্গে রাসূল সা.-এর কাছে গেলাম। আমি রাসূল সা.-এর পিছনে গিয়ে নবুওয়াতের মহর দেখি। তিনি মহরে নবুওয়াতের বিবরণ এভাবে দেন যে, সেটা দেখতে পাখির ডিমের মত।  এভাবে হযরত আব্দুল্লাহ বিন জারজাস ও হযরত জাবির ইবনে সামুরাসহ অনেক শিশু রাসূল সা.-এর নবুওয়াতের মহর দেখেছেন এবং তার বিবরণ দিয়েছেন। সেটা একটা বাড়তি গোশতের টুকরা। দেখতে কবুতরের ডিমের মত ফর্সা, গোল ও উঁচু। তার চারপাশে কিছু পশম আছে। দেখতে অনেক সুন্দর ও অনেক আকর্ষণীয়। তারা এভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে খেলেছেন তবুও রাসূল সা. বিরক্তি প্রকাশ করেননি বা বাধা দেননি।

আরও পড়ুনঃ   সদ্য ভূমিষ্ঠ সন্তানের ক্ষেত্রে করণীয়

Comments

comments