সিজদার গুরুত্ব ও ফজিলত

0
9
সিজদার গুরুত্ব

মাওলানা এম এ রহমান: 

সিজদার দ্বারা আল্লাহপাক পরম আনন্দ পান, খুশি হন। কেননা সিজদার মাধ্যমে আল্লাহপাকের কাছে নতিস্বীকার করার নম্রতা এবং বশ্যতা প্রকাশ পেয়ে থাকে। আর এ সিজদাকে অস্বীকার করার কারণেই আজাজিল ফেরেশতা অভিশপ্ত শয়তানে পরিণত হয়েছে। সব ইবাদতের মধ্যে সিজদার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। সিজদা হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত। সুতরাং এ সিজদা তথা ইবাদত কোনো মানুষের জন্য করা যাবে না, তা না-জায়েজ। প্রকারভেদে সিজদা দুই প্রকার। যেমন- ১. ইবাদতসূচক সিজদা, ২. সম্মানসূচক সিজদা। ইবাদত হিসেবে সিজদা করার অর্থ হচ্ছে কাউকে পালনকর্তা এবং মাবুদ মনে করে সিজদা করা। ইবাদতের উদ্দেশ্যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা যায় না এবং তা শিরক ও কুফর। এ রকম কুফরি সিজদা দেওয়া ইসলামী শরিয়তে জায়েজ নেই। তবে সম্মানসূচক সিজদা পূর্ববর্তী শরিয়তে জায়েজ থাকলেও পরবর্তী শরিয়তে মুহাম্মাদিতে তা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ইসলামী শরিয়তে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইবাদতসূচক সিজদা এবং সম্মানসূচক সিজদার অনুমতি নেই। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হচ্ছে, ‘তোমরা সূর্যকেও সিজদা করো না এবং চন্দ্রকেও নয়; একমাত্র আল্লাহকে সিজদা করো, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন। যদি তোমরা তাঁরই ইবাদত করো’ (৪১:৩৭)। সিজদা প্রদানের বাধ্যবাধকতা এবং সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে হাদিসে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করার জন্য যদি আমি অনুমতি দিতাম, তাহলে স্ত্রীদের আদেশ করতাম যেন তারা তাদের স্বামীদের সিজদা করে।’ (তিরমিজি)। চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্রের উদ্দেশে সিজদা করা যেমন না-জায়েজ; তেমনি কোনো পীর, ফকির, মাজার-দরগাহ- এসবের উদ্দেশেও সিজদা করা জায়েজ নেই। সিজদা সম্পর্কে হাদিসে আরো জানা যায়, রাসুল (সা.) কোনো শুভ সংবাদপ্রাপ্ত হলে অথবা কোনো মসিবত বা অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য শোকরানা বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপক সিজদা দিতেন। এ মর্মে হাদিসে বলা হয়েছে, ‘রাসুল (সা.)-এর কাছে যখনই কোনো সুসংবাদ পৌঁছাত অথবা তিনি সন্তুষ্ট হতেন; তখন তিনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সিজদায় পতিত হতেন।’ (আবু দাউদ)। আমরা মহান আল্লাহপাকের উদ্দেশে ইবাদতের মাধ্যমে সিজদা করি। যেমন- ফরজ, ওয়াজিব ও নফল নামাজের মাধ্যমে সিজদা করে থাকি। নামাজের কোনো অঙ্গ যথাস্থানে যথাসময়ে সম্পদিত না হলে কিংবা আদৌ সম্পাদন না করলে সে জন্য সহায়ক ঘাটতি বা ক্ষতিপূরণস্বরূপ নামাজের শেষ বৈঠকের তাশাহুদের পর দুটি সিজদা দেওয়ার বিধান রয়েছে এবং তাকে ‘সিজদায়ে সোহো’ বা ভুল সংশোধন সিজদা বলা হয়। এ সিজদা সম্পর্কে বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহর একাধিক হাদিসে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া পবিত্র কোরআনে মোট ১৪টি সিজদার আয়াত রয়েছে, এসব আয়াতের পাঠক ও শ্রোতা উভয়কেই তাৎক্ষণিকভাবে সিজদা করা ওয়াজিব। কোরআন পাঠকালে সিজদার যে শর্ত নামাজের জন্যও সেই শর্ত। তবে কোরআন পাঠের সিজদা বিলম্বেও দেওয়া চলে; কিন্তু নামাজের মধ্যে বিলম্ব করা যায় না। নামাজের মধ্যে সিজদার আয়াত পাঠকালে সঙ্গে সঙ্গেই সিজদায় পতিত হতে হয়। নামাজ ও নামাজের বাইরে উভয় অবস্থায়ই সিজদায় কোরআন তিলাওয়াতের নিয়ম হলো, প্রথম তাকবির বলে সিজদা করবে, শেষে তাকবির বলে দাঁড়াবে এবং মাঝখানে তিনবার তাসবিহ পড়বে। নামাজের মধ্যে তিলাওয়াতে সিজদা সম্পর্কে তাহতাবী, আলমগিরি ও দোররুল মোকতারে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। প্রাচীন মিসরীয় ক্বারিদের মতে, সিজদার ১৪টি আয়াতের মধ্যে সাতটি ফরজ, তিনটি ওয়াজিব ও অন্য চারটি সুন্নত। তাঁরা শূন্য আয়াত, মিমের আয়াত, তোয়ের আয়াত, জিমের আয়াত, তেয়ের আয়াত- এই পাঁচটিকে স্বস্থানে সতর্কতা বজায় রাখতে আর জের আয়াত, ছোয়াদের আয়াত, কাফের আয়াত, লামের আয়াত- এই চারটিকে প্রয়োজন মতো ভঙ্গ করতে মত প্রকাশ করেছেন। নামাজের মধ্যে সিজদার তাসবিহ আদায় করা সম্পর্কে জানা যায়, পবিত্র কোরআনের সুরা আ’লার সর্বপ্রথম আয়াতে ‘সাব্বি হিস্মা রাব্বিয়া’ল আ’লা’ অবতীর্ণ হলে সিজদার তহবিহ পাঠ করা শুরু হয়। হজরত ওকবা ইবনে আমের জোহানি (রা.) বর্ণনা করেন, যখন সুরা আ’লা অবতীর্ণ হয় তখন রাসুল (সা.) বললেন, তোমরা ‘সুবহানা রাব্বিয়া’ল আ’লা’ কালেমাটি সিজদায় পাঠ করো।’ তা ছাড়া নামাজের বাইরে ‘সাব্বি হিসমা রাব্বিয়া’ল আ’লা’ পাঠ করলে’ সুবহানা রাব্বিয়া’ল আ’লা বলা মুস্তাহাব। সাহাবারা এই সুরা পাঠ শুরু করলে তা-ই বলতেন। (কুরতুবী)। এ ছাড়া হজরত আবু হোরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রয়েছে, ‘রাসুল (সা.) তাঁর সিজদায় পাঠ করতেন, ‘হে আল্লাহ! ছোট ও বড়, প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য আমার সব গোনাহ মাফ করে দাও।’ (মুসলিম)। হাদিসে আরো বলা হয়েছে, রাসুল (সা.) তাঁর দুই সিজদার মধ্যে পড়তেন, ‘হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করো, আমার প্রতি দয়া করো, আমাকে পথ দেখাও, আমাকে মাফ করে দাও এবং আমাকে জীবিকা দান করো।’ (মিশকাত)। সিজদার ফজিলত ও উপকারিতা সম্পর্কে হাদিসে আরো যা জানা যায় তা হলো, কোনো এক লোক হজরত সওবান (রা.)-এর কাছে নিবেদন করলেন, আমাকে এমন একটি আমল বলে দিন যাতে আমি বেহেশতে যেতে পারি। হজরত সওবান (রা.) নীরব থাকলেন, কিছুই বললেন না। লোকটি আবার নিবেদন করলেন, তখনো তিনি চুপ করে রইলেন। এভাবে তৃতীয়বার যখন বললেন, তখন তিনি বললেন, ‘আমি এ প্রশ্নটিই রাসুল (সা.)-এর দরবারে করেছিলাম। তিনি আমাকে ওসিয়ত বা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, অধিক পরিমাণে সিজদা করতে থাকো। কারণ তোমরা যখন একটি সিজদা করো তখন তার ফলে আল্লাহ তায়ালা তোমাদের মর্যাদা এক ডিগ্রি বৃদ্ধি করে দেন এবং একটি গুনাহ মাফ করে দেন। লোকটি বললেন, হজরত সওবান (রা.)-এর সঙ্গে আলাপ করার পর আমি হজরত আবুদ্দারদা (রা.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর কাছেও একই নিবেদন করলাম এবং তিনিও একই উত্তর দিলেন (মুসলিম)। লেখক : প্রাবন্ধিক।

আরও পড়ুনঃ   ‘বিশ্বনবী’ গ্রন্থের রচয়িতা কাজী নজরুল ইসলাম

Comments

comments