সৃষ্টি জগত নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে মুসলমান হলেন কানাডার কুরাত

0
15
সৃষ্টি জগত, মুসলমান, কানাডা

ইলিয়াসঃ ইসলামের রয়েছে এমন অনেক দিক বা বৈশিষ্ট্য যার যে কোনো একটি দিক মানুষের মধ্যে সত্য সম্পর্কে গবেষণার জন্য জোরালো উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে সক্ষম। যেমন, সৃষ্টি জগতের নানা দিক নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করতে গিয়ে এক আল্লাহর অস্তিত্বকে বুঝতে সক্ষম হন কানাডার নাগরিক কুরাত। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘অপূর্ব অবারিত আকাশ, সুবিশাল ভূমি, বিস্ময়-জাগানো জ্বলজ্বলে তারকারাজি-এইসব মনোহর সৃষ্টি মানুষকে স্রস্টা সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। আর তাই আমি সব সময়ই ভাবতাম এই বিশ্বজগতের কোনো স্রস্টা না থেকে পারে না। প্রকৃতির রহস্যময় নানা বিষয়কে সহজেই এড়িয়ে যেতে পারিনি। তাই সব সময়ই ধর্মগুলোর বাস্তবতা সম্পর্কে গবেষণার কথা ভাবতাম যাতে বিস্ময়কর এই বিশ্বজগতের বাস্তবতাগুলো বুঝতে সক্ষম হই।’

কানাডার নাগরিক কুরাত আরো জানিয়েছেন,

তিনি খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন বলে স্রস্টা বা খোদা সম্পর্কে খ্রিস্টানদের বিশ্বাসকে অন্ধের মত মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না। খ্রিস্ট ধর্মের লক্ষ্য ও ভিত্তিও তার কাছে স্পষ্ট বলে মনে হয়নি। বাপদাদার এই ধর্মে তিন জন খোদার যে কথা বলা হয়েছে তা কুরাতের কাছে অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। তার মতে, একাধিক খোদা বিশ্ব-পরিচালনা করলে তাতে গোলযোগ দেখা দিত। এইসব বিষয়ে খ্রিস্ট ধর্মের পুরোহিতদের সঙ্গে আলোচনা কুরাতের সন্দেহগুলো নিরসন করতে পারেনি, বরং সন্দেহগুলো আরো গভীর হয়েছে। ফলে মানসিক প্রশান্তি অর্জনের জন্য তিনি খ্রিস্ট ধর্মের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং ইহুদি ধর্ম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন।

ইসলাম কোনো বিশেষ জাতির ধর্ম নয়। এ ধর্ম বিশ্বজনীন বা গোটা মানব জাতির ধর্ম। অন্যদিকে ইহুদি ধর্ম কেবল বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের ধর্ম। জন্মগতভাবে বা জাতিগতভাবে ইহুদি নয় এমন কেউ ইহুদি হতে পারে না।

যাই হোক, কানাডার নাগরিক কুরাত খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কে গবেষণার পর ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে গবেষণা করেন। গবেষণার ফল সম্পর্কে তিনি বলেছেন:

আরও পড়ুনঃ   খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন আমিনা এসিলমির! তার কিছু অজানা কথা

‘ইহুদি ধর্মেও আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে কিছু চমক দেখা যায়। কিন্তু তৃষ্ণার্ত ব্যক্তিদের হৃদয়গুলোকে তৃপ্ত করার জন্য সেসব যথেষ্ট নয়। ইহুদি ধর্ম সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশুনার পর বুঝতে পারলাম যে, তারা জাতি হিসেবে নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ ও আল্লাহর মনোনীত জাতি বলে মনে করে। তাদের দৃষ্টিতে অ-ইহুদি জাতিগুলোকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ইহুদিদের সেবার জন্যই। ইহুদিদের দৃষ্টিতে খোদা বা স্রস্টা একমাত্র তাদেরই সম্পদ, পুরো মানবজাতির জন্য নয়। সুস্থ-বিবেক কখনও এ ধরনের দাবি মেনে নিতে পারে না। এভাবে আমি যেসব বাস্তবতা বা সত্যের সন্ধান করছিলাম তার কোনো চিহ্নই খুঁজে পেলাম না ইহুদি ধর্মে।’

খ্রিস্ট ও ইহুদি ধর্ম নিয়ে ব্যাপক গবেষণার পর তাতে পরিতৃপ্ত না হয়ে কানাডার নাগরিক কুরাত ইসলাম সম্পর্কেও গবেষণার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলো ইসলাম সম্পর্কে ব্যাপক কুৎসা রটনা করে রাখায় এ ব্যাপারে অগ্রসর হওয়াটা তার জন্য ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু ইসলামী জ্ঞানের বৃহত্তম উৎস হিসেবে পবিত্র কুরআন পড়ার পর কুরাত যেন এ গ্রন্থের মধ্যে নিজের হারানো সত্তাসহ যা কিছু খুঁজছিলেন বহু বছর ধরে তার সবই খুঁজে পান। তার ভাষায়: ‘কুরআনের প্রতিটি আয়াত আমার বিক্ষুব্ধ মনে যোগাতো প্রশান্তি’।

পবিত্র কুরআন এমন এক মহাগ্রন্থ যা প্রতিদিন কেবল কোটি কোটি মুসলমানই পাঠ করেন তা নয়, বরং বহু মুসলমানের জন্যও গবেষণা-কর্মের এক অনন্য উৎস। ফরাসি চিন্তাবিদ জোয়েল লাবুমের মতে কুরআন এক চিরজীবন্ত গ্রন্থ। গবেষক ও জ্ঞানীরা তাদের বুদ্ধি ও অনুধাবন ক্ষমতার আলোকে এই মহাগ্রন্থ থেকে উপকৃত হচ্ছেন। কুরআনের সৌন্দর্য অভিভূত করে কানাডার নাগরিক কুরাতকে। তার মতে, কুরআন বিশ্বজগতের নিরঙ্কুশ বা একক পরিচালকের কথা তুলে ধরে। এর বাণী মানুষের বাণী নয়। এ পবিত্র ধর্মে মানুষ সরাসরি আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং এ জন্য পুরোহিতের দরকার হয় না। কুরআন হযরত ঈসা ও মুসা (আ.) প্রমুখ নবীদের কথা বলে এবং তাঁদেরকে আল্লাহর এমন রাসূল হিসেবে বর্ণনা করেছে যারা মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান জানাতেন। কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যেখানে সন্ত্রাস বা সহিংসতার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, অথচ পশ্চিমা প্রচার মাধ্যমগুলো মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী বলে প্রচার করছে। কুরাত বরং ইসলামকে শান্তি, মৈত্রী, ভ্রাতৃত্ব ও বন্ধুত্বের ধর্ম হিসেবে দেখতে পেয়েছেন এবং তিনি ব্যাপক গবেষণার পর এই ধর্মকেই সবচেয়ে পরিপূর্ণ ধর্ম হিসেবে সনাক্ত করতে পেরেছেন।

আরও পড়ুনঃ   নও মুসলিমের কাহিনীঃ ডঃ শিবশক্তি স্বরূপজীর একটি সাক্ষাৎকার

ইসলাম সম্পর্কে জানার পর কানাডার নাগরিক কুরাত মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাতের সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানান, মুসলমানদের সঙ্গে সাক্ষাতের পর বুঝতে পারেন যে এর আগে তিনি কখনও এমন ভদ্র, বিনম্র ও দয়ার্দ্র মানুষ দেখেননি। কুরাত বলেছেন: তারা হাসিমুখে আমাকে স্বাগত: জানান এবং গভীর ধৈর্য নিয়ে আমার সঙ্গে মত বিনিময় করেন।

এরপর কুরাত আরো অনেক মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি মুসলমানদের একটি মসজিদেও যান। মসজিদে ঢোকার সময় প্রথমে কিছুটা ভীত ছিলেন। কারণ, এর আগে তিনি কখনও মসজিদে যাননি। কিন্তু মুসলমানদের সহাস্য অভ্যর্থনায় তার সব ভয় দূর হয়ে যায়। ফলে মুসলমানদের সহিষ্ণুতা ও দয়া সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত হন। কুরাত এটাও লক্ষ্য করেন যে, মুসলমানরা পরস্পরকে ভাই বলে ডাকেন এবং সৎকর্মে একে অপরকে সাহায্য করেন ও মন্দ কাজ করেন না। কুরাত ইসলামের যেসব দোষ-ত্রুটি তুলে ধরার চেষ্টা করছিলেন মুসলমানদের কাছে সেসবের যৌক্তিক জবাব পেয়ে যান। ধীরে ধীরে কুরাত বুঝতে পারেন যে একমাত্র ইসলামই মানুষের জীবনের জন্য বয়ে আনতে পারে সৌভাগ্য। এরপর পবিত্র রমজান মাসে একটি মসজিদে গিয়ে তিনি কলেমায়ে শাহাদাতাইন পাঠ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের ঘোষণা দেন।

কানাডীয় নও-মুসলিম কুরাত সেই রমজান মাসেই নামাজ ও রোজা আদায় শুরু করেন। আর এটাকে তিনি তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বড় রহমত বলে মনে করেন। কারণ, তিনি মুসলমানদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে ইবাদতের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পান রমজান মাসে মুসলমান হওয়ার সুবাদেই। প্রথমে ইসলামী বিধি-বিধানগুলো মেনে চলা একটু কষ্টকর মনে হলেও পরে সেসব তার কাছে সহজ হয়ে যায়। ইসলামী বিধি-বিধান ও মুসলমানদের সমাজবদ্ধ জীবন তার জীবনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে বলে কুরাত উল্লেখ করেন।

নও-মুসলিম কুরাত মুসলমান হওয়ার পর মনে করেন যে, তার জীবনের রয়েছে লক্ষ্য। তিনি এখন মনে করেন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই সবচেয়ে আনন্দদায়ক বিষয়। ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর হওয়ার অভিজ্ঞতার আলোকে কুরাত মনে করেন কোনো বিষয়ে কিছু শোনার পর সে সম্পর্কে গবেষণা চালানোর পরই রায় দেয়া উচিত। তার মতে, সব সময়ই আল্লাহর কাছ থেকে পথ-নির্দেশনা চাওয়া উচিত এবং আল্লাহর সঙ্গেই হওয়া উচিত মানুষের মূল সম্পর্ক। আর তা হওয়া উচিত শক্তিশালী ও স্থায়ী। কানাডীয় নও-মুসলিম কুরাত বলেছেন:

আরও পড়ুনঃ   নও মুসলিম আবদুল করিম গার্মেনাস (হাঙ্গেরী)

‘আমি জানি না, আমি ইসলামকে খুঁজে পেয়েছি, না ইসলাম আমাকে খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু যারা স্রস্টার সত্যিকারের পরিচয় ও সত্য সম্পর্কে জানতে চায় আল্লাহ অবশ্যই তাদের পথ দেখান। তাই আল্লাহর ওপর ঈমান রাখবেন ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব ধরনের কষ্ট ও তিরস্কার বা নির্যাতন সহ্য করুন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে দয়া করবেন ও একদিন সবাইকেই ইসলামের সত্যতার সঙ্গে পরিচিত করবেন-এই মুনাজাত করছি।’

তথ্যসূত্রঃ
রেডিও তেহরান

Comments

comments

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

one × one =